সারা বছর রয়েছে সুন্নত ও নফল রোজা

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৭
আল’হামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার অশেষ রহমতে আমরা মহিমান্বিত মাস রামাদানের ফরজ সওম (রোযা) সম্পন্ন করেছি। মহান মালিকের অনুগত বান্দা হিসেবে রামাদান মাসের এই কঠোর কাজটি আশা করছি যথাযথভাবে সম্পন্ন করেছি, মহান মালিক নিশ্চয়ই আমাদের পুরুস্কার লিখে দিয়েছেন এবং পুরুস্কার পাওয়ার আনন্দ আমরা ভাগাভাগি করেছি আমাদের পরিবার, আত্বীয়-সজন, বন্ধু-বান্ধব ও গরীব-দূঃখীদের সাথে। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমাদের জন্য অবশ্যই আল্লাহর রসূলের মাঝে উত্তম আদর্শ রয়েছে এমন প্রতিটি ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহর সাক্ষাত পেতে আগ্রহী এবং যে পরকালের (মুক্তির) আশা করে” (সূরা আহযাবঃ ২১)। প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ এবং ইবাদত অনুসরণ করে আমরা সারা বছর নির্দিষ্ট দিনগুলোতে নফল সওম পালন করে সুশৃংখল জীবন যাপন করি। শাওয়াল মাসের সওমঃ আবু আইয়ুব আনসারী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রামাদান মাসের সওম পালন করল, অতপর শাওয়াল মাসে ছয়টি সওম আদায় করল, সে যেন সারা বছর সওম পালন করল’ (মুসলিমঃ ২৮১৫)। শাওয়াল মাসের সওম পালন পদ্ধতিঃ যদি কারো দায়িত্বে রামাদানের কাজা সওম থেকে থাকে, তবে তাকে প্রথমে কাজা সওম আদায় করে নিতে হবে, তারপর শাওয়ালের ছয়টি সওম পালন করতে হবে। শাওয়ালের ছয়টি সওম একাধারে আদায় করা যায়, আবার বিরতি দিয়ে মাসব্যপীও আদায় করা যায়। আরাফা দিবসের সওমঃ আবু কাতাদা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরাফা দিবসের সওম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে, তিনি বলেন, “আরাফা দিবসের সওম সম্পর্কে আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তা বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের পাপের কাফফারা হবে”। (মুসলিমঃ ২৮০৩, বুখারী ও তিরমীযি ছাড়া সবকটি সহীহ হাদীস গ্রন্থ) তবে হজ্জ পালন অবস্থায় হাজীরা এই সওম পালন করবে না। মহররম মাসের (আশুরা) সওম এর গুরুত্বঃ আবু হুরাইরা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “রামাদানের পর সর্বোত্তম সওম হল আল্লাহর প্রিয় মুহাররম মাসের সওম এবং ফরজ সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হল রাতের সালাত” (মুসলিমঃ ২৮১২)।আশুরার সওম পালনের নির্দেশঃ ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিতঃ রসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় এসে দেখলেন, ইহুদীরা আশুরার দিনে সওম পালন করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কোন দিন যে, তোমরা সওম পালন করছ? তারা বলল, এটা এমন এক মহান দিবস যেদিন মহান আল্লাহ মুসা (আ.) ও তার সমপ্রদায়কে নাজাত দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে তার দলবলসহ ডুবিয়ে মেরেছিলেন। মুসা (আলাইহিস সালাম) শুকরিয়া হিসেবে এ দিনে সওম পালন করেছেন। এ কারণে আমরাও সওম পালন করে থাকি। এ কথা শুনে রসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তোমাদের চেয়ে আমরা মুসা (আলাইহিস সালাম) এর অধিকতর ঘনিষ্ট ও নিকটবর্তী”। অতঃপর রসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম সওম পালন করলেন ও অন্যদেরকে সওম পালনের নির্দেশ দিলেন”। (বুখারীঃ ১৮৬৫)। আশুরার সওমের সংখ্যাঃ আশুরার সওম হবে দুটি। মুহাররম মাসের নবম ও দশম তারিখে অথবা দশম ও একাদশ তারিখে। ইন্তেকালের বছর রসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যদি আমি বেঁচে থাকি তাহলে অবশ্যই আগামী বছর মুহাররম মাসের নবম ও দশম তারিখে সওম পালন করব” (মুসলিমঃ ১১৩৪)। ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা আশুরা দিবসে রোযা পালন করো এবং এক্ষেত্রে ইহুদীদের বিরোধিতা করো। তোমরা আশুরার একদিন পূর্বে অথবা একদিন পরে রোযা পালন করবে” (আহমদঃ ২১৫৪)। আশুরার সওমের ফজিলতঃ আবু কাতাদাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিতঃ রসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশুরার সওম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হল, তিনি বলেন, “বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হিসেবে গৃহীত হয়” (মুসলিমঃ ২৮০৪, তিরমিজীঃ ২৮০৯)। আবু কাতাদাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিতঃ রসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আশুরার সওম সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, বিগত এক বছরের গুনাহ সমূহের কাফফারা হয়ে যাবে” (মুসলিমঃ ২৮০৩)। শা’বান মাসের সওমঃ আয়িশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, “রসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রামাদান ব্যতীত অন্য কোন মাসে পূর্ণ মাস সওম পালন করতে দেখিনি, শাবান মাস ব্যতীত অন্য মাসে অধিক পরিমাণে নফল সওম পালন করতে দেখিনি” (বুখারীঃ ১৯৬৯)। ‘আইয়্যামে বিয’ এর সওমঃ চন্দ্র মাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনের তারিখ, এই তিন দিনকে হাদিসের পরিভাষায় বলা হয় আইয়্যামুল বিয। ‘বিয’ শব্দের অর্থ আলোকিত। এই তিন দিনের রাতগুলো চাঁদের আলোতে আলোকিত থাকে। রাসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সওমগুলো গুরুত্ব সহকারে আদায় করতেন। আবু হুরাইরা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিতঃ রাসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বলেন, আমার বন্ধু আমাকে তিনটি বিষয়ের উপদেশ দিয়েছেনঃ প্রত্যেক মাসে তিন দিন সওম পালন করা, দ্বি-প্রহরের পূর্বে দু’রাকাত নামাজ আদায় করা ও নিদ্রার পূর্বে বিতিরের নামাজ আদায় করা’ (বুখারীঃ ১৯৮১)। আবু কাতাদাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিতঃ রাসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক মাসে তিনটি সওম ও এক রমজানের পর পরবর্তী রমজানে সওম পালন পূর্ণ বছর সওম পালনের সমান” (মুসলিমঃ ২৮০৪)। ‘আইয়্যামে বিয’ এর সওমের গুরুত্বঃ ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসাফির ও মুকিম কোন অবস্থাতেই ‘আইয়্যামে বিয’ এর সওম ত্যাগ করতেন না (নাসায়ীঃ ২৩৪৫)। সোমবারের সওমঃ আবু কাতাদাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সোমবারের সওম পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল। তিনি বললেন, “এ দিনে আমার জন্ম হয়েছে এবং এ দিনে আমাকে নবুওয়াত দেয়া হয়েছে বা আমার উপর কোরআন নাজিল শুরু হয়েছে” (মুসলিমঃ ২৮০৪)। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, এই দিনেই আমি ইন্তেকাল করবো।