আমীরে শরীয়ত, রাহবারে তরীকত, মুজাহিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা হাফেজ মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) ‘একটি নাম, একটি ইতিহাস’। তাঁর জীবন ইতিহাস থেকে সামান্য আলোচনা পাঠক ভাইদের খেদমতে পেশ করা হচ্ছে। হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) শৈশবকাল থেকেই ছিলেন কুরআনের আশেক। তাঁর সমগ্র চৈতন্যজুড়ে, মন-মনন-মনিষায় ছিল কুরআন নিয়েই চিন্তা-ভাবনা ও তাঁর সারা দিনের ব্যস্ততা। তিনি সর্বদা এই ফিকিরে থাকতেন যে, কিভাবে দেশের প্রতিটি জনপদের ঘরে ঘরে, গ্রামে গ্রামে কুরআনের আলো পৌঁছে দেয়া যায়। কিভাবে শিশু-কিশোররা সহজে কুরআনের জ্ঞান লাভ করতে পারে। এজন্য তিনি ৬৮ হাজার গ্রামে ৬৮ হাজার মক্তব প্রতিষ্ঠা করার কথা বারবার বলতেন। তিনি তাঁর এ অমীয় স্বপ্ন বাস্তবায়নের সূচনা কামরাঙ্গীরচর আশরাফাবাদস্থ মাদরাসা-ই-নূরীয়া থেকে করেছিলেন। তিনি প্রথমে তাঁর ছাত্র নূরানী শিক্ষা পদ্ধতির প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা বেলায়েত হোসাইন সাহেবকে মাদরাসা-ই-নূরীয়াতে নিয়ে এসেছিলেন। নূরীয়ার মক্তব বিভাগকে তিনি একটি আদর্শ মক্তব বিভাগে পরিণত করেছিলেন। ছাত্রদেরকে পড়ানোর সাথে সাথে শিক্ষকদেরকেও আরবী বর্ণমালা থেকে শুরু করে সব কিছু সহজ সুন্দর ও শুদ্ধভাবে স্বল্প-সময়ে হাতে কলমে শিখিয়ে দেওয়া হতো। এভাবে বেশ কিছু দিন চলার পর হযরত মাওলানা বেলায়েত হোসাইন সাহেব হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর নিকট আবেদন করলেন, যেন তাকে একটি পৃথক স্থানে স্বাধীনভাবে কুরআনের এ খেদমত করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। আব্বাজান হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) তাঁর কথায় মুগ্ধ হয়ে ভক্ত এক হাজী সাহেবকে বলে মুহাম্মাদপুরে কিছু জায়গার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। হযরত মাওলানা বেলায়েত হোসাইন সাহেব মাদরাসা-ই-নূরীয়া থেকে চলে যাওয়ার পর নূরীয়ার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়নি, তা আপন গতিতে চলতে থাকে। তবে আব্বাজান হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) প্রতি বছর রমজান মাসে মাদরাসা-ই-নূরীয়াতে তাঁর ছাত্র নাদিয়াতুল কুরআনের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব সাহেব ও নূরানী শিক্ষা পদ্ধতির প্রতিষষ্ঠাতা মাওলানা বেলায়েত হোসাইন সাহেবের মাধ্যমে কুরআন শিখানোর প্রশিক্ষণ কোর্সের ব্যবস্থা করতেন। আব্বাজান (রহ.) তাঁদের দুজনকেই এই মর্মে উত্সাহ দিতেন যে, তাঁরা যেন তাঁদের অভিজ্ঞতার আলোকে কুরআন শিক্ষার পদ্ধতিকে আরো সহজ ও সুন্দর করার লক্ষ্যে উভয় পদ্ধতিকে সমন্বিত করে আরো সহজ কিছু করার চিন্তা-ফিকির করেন। বর্তমানে নূরানী ও নাদিয়া এ দু’পদ্ধতিতে শিশু-কিশোরদের কুরআন শিক্ষা দানের সু-ব্যবস্থা বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে ও সমাদৃত হয়েছে। এদিকে হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর অন্যতম জামাতা শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী (দা. বা.) উভয় পদ্ধতি রপ্ত করে মাদরাসা-ই-নূরীতে একটি সমন্বিত পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিও মক্তব শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। তিনি এ পদ্ধতিতে মক্তব শিক্ষাকে প্রসারিত করার লক্ষ্যে মানিকগঞ্জের শিংগাইরে এক বিশাল শিক্ষক প্রশিক্ষণ-কেন্দ্র কায়েম করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমানে সারা দেশে প্রচলিত মক্তব শিক্ষা ও কুরআন হেফজের বিশাল বিস্তৃত পরিধির পেছনে রয়েছে হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর বিশেষ অবদান। হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) আনুমানিক ১৯১৬ বা ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের বিখ্যাত হেফজখানা থেকে কুরআনে কারীমের হেফজ সম্পন্ন করেন এবং ইলমে ক্বেরাতের (ক্বেরাত শাস্ত্রের) গভীর জ্ঞান লাভ করেন। সে যুগে পুরো ভারতবর্ষে পানিপথের হেফজখানাটিই ছিল হেফজ ও ক্বেরাত শাস্ত্র শিক্ষার অদ্বিতীয় স্থান। এই বঙ্গভাগে পানিপথের হেফজখানাটির সেই অদ্বিতীয় পদ্ধতিটি চালু করার এক তীব্র আকাাঙ্কা লালন করছিলেন তাঁর মনের গহীনে। অতপর যখন রড়কাটারা মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন হযরত আব্বাজান (রহ.) পানিপথের পদ্ধতি অনুযায়ী একটি আবাসিক হেফজখানা প্রতিষ্ঠা করলেন। রাতের শেষ প্রহরে উঠে ছাত্ররা কুরআন তিলাওয়াত শুরু করত, ফযরের পর শিক্ষককে সবক মুখস্ত শুনাত, সাত সবক শুনাত, পূর্বাহ্নে ঘুমিয়ে বিশ্রাম নিয়ে নব উদ্যমে যোহরের আগে থেকেই আবার পড়া শুরু করত। আসরের পর বিনোদন ও খেলাধুলা করে মনকে প্রফুল্ল করে আবার মাগরিবের পর থেকে পড়া আরম্ভ হতো। রাত নয়টা বা দশটায় ছুটি হয়ে যেতো। তখনকার সময়ে ঢাকার বুকে এটাই ছিল প্রথম আবাসিক হেফজখানা, যার পরিচালনার শীর্ষে ছিলেন আব্বাজান হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)। বর্তমানে গোটা বাংলাদেশ জুড়েই আবাসিক হেফখানার এই ধারার প্রচলনই প্রায় সর্বত্র। এভাবে আল্লাহ তাআলার মদদে কুরআনের নূর বাংলার আনাচে-কানাচে পীেঁছাতে তিনি সক্ষম হন। আব্বাজান হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) ছিলেন অতি উঁচুস্তরের ওলী আল্লাহ। তিনি এদেশে কুরআনি খেদমতের ব্যাপক কাজ করে গিয়েছেন। তাঁর চেষ্টায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু মসজিদ, মাদরাসা ও মক্তব গড়ে উঠেছে। তাঁর দ্বীনি খেদমতের তুলনা অসামান্য ও বিরল। আমি বহুবার তাঁর মুবারক যবান থেকে শুনেছি, তিনি বলতেন, ‘আমি, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী ও পীরজি হুজুর যখন ঢাকায় এসে বড়কাটারা মাদরাসা আরম্ভ করলাম, তখন ঢাকার মসজিদগুলোতে সহি-শুদ্ধভাবে কুরআন পড়নেওয়ালা ইমামের সংখ্যা ছিল অতি নগন্য। এখন আলহামদুলিল্লাহ পানিপথের পদ্ধতিতে কুরআনের উপর ধারাবাহিক মেহনতের ফলে শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে সহি-শুদ্ধভাবে কুরআন পড়নেওয়ালাদের সংখ্যা কল্পনাতিত।’ এখন তো দুনিয়ার মানুষই দেখছে যে, বাংলাদেশের হাফেজ সাহেবানরা তিলাওয়াতুল কুরআনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভের গৌরব অর্জন করছে। আমি মনে করি এটা আমাদের আকাবেরের বিশেষকরে হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর মেহনতের-ই ফল। আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে পরকালে উত্তম প্রতিদান ও উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমার আব্বাজান হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) ছিলেন, চতুর্দশ শতাব্দির মহান সংস্কারক হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানবী (রহ.) এর খাস খুলাফাদের মধ্যে অন্যতম। যার ফলে তাঁর আধ্যাত্মিকতার পরিধি ছিল বিশাল। একবার কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সফরকালে আব্বাজানের বিশিষ্ট খলীফা হাফেজ মাওলানা আব্দুল হক সাহেব (দা. বা.) (বর্তমান পেশ ইমাম, বড় মসজিদ, মোমেনশাহী) আব্বাজান (রহ.) কে প্রশ্ন করলেন যে, হযরত! অনেকেই মনে করেন, আপনি কুতুবুল আলম (বর্তমান যুগের ওলী আল্লাহদের মুরুব্বী)। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী? উত্তরে তিনি নীরবতা অবলম্বন করলেন এবং প্রশ্নটি এড়িয়ে গেলেন। তাঁর আর এক খলীফা ফরিদপুরের মরহুম হাফেজ মাওলানা নেযামুদ্দীন সাহেব তার এক স্বপ্নের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, আমি স্বপ্নে দেখি হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (ছদর সাহেব) (রহ.) ও হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এক সমাবেশে উপস্থিত। (চলবে)
লেখক :হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর ছোট সাহেবজাদা,
ইমাম ও খতীব, আম্বরশাহ শাহী জামে মসজিদ, কাওরান বাজার, ঢাকা।
