একদিনের খেলায় টেস্ট মেজাজের পরীক্ষা

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৪, ২১:৫২
জন্মের পর থেকে ক্রিকেট খেলা যতবার আইন-কানুন বদলেছে, ফরম্যাট আবিষ্কার করেছে; তা অন্য কোনো খেলা কল্পনাও করতে পারে না। টেস্ট থেকে ৬০ ওভারের ওয়ানডে, সেখান থেকে ৫০ ওভার, সেখান থেকে ২০ ওভার। ফিল্ডিং ও বোলিংয়ে নিয়মের বদল। মানে, প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ধরনের ক্রিকেট এসে হাজির হয় চোখের সামনে। তবে গতকাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে যে ক্রিকেট দেখা গেল, তা এই বিশ্ব জগতে এর আগে নিশ্চিত করেই কখনো দেখা যায়নি—প্রতিপক্ষের রান টপকে যাওয়ার পরও সীমিত ওভারের ম্যাচে পরে ব্যাট করা দল ব্যাটিং চালিয়ে গেল; নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে গুনে গুনে ৭৬ রান বেশি করে তবে ক্ষান্ত হলো তারা! আসলে সেই অর্থে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচই ছিল না। বাংলাদেশ দলের ক্যাম্পে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের দল ও আশেপাশের খেলোয়াড়দের লাল ও সবুজ দলে ভাগ করে আয়োজন করা হয়েছিল এক অনুশীলন ম্যাচে। এমনিতে অনুশীলন ম্যাচ হলেও ফলাফল এলেই সাধারণত শেষ করে দেয়া হয় খেলা। কিন্তু ব্যাপারটার মুখ্য উদ্দেশ্য যেহেতু অনুশীলন, তাই দিনের আলো যতোক্ষণ অনুমোদন করলো, ততোক্ষণ খেলা চালানোর নির্দেশ দিলেন কোচ। আর এই নির্দেশের ফলেই আগে ব্যাট করা লাল দলের ৫৪ ওভারে ১৬৭ রানের জবাবে সবুজ দল করে ফেললো ৪৮ ওভারে ২৪৩ রান! উদ্দেশ্য-বিধেয় না জেনে এই ম্যাচ দেখতে গেলে ক্রিকেট চোখ মারাত্মক ধাক্কা খাওয়ারই কথা। সকাল বেলায় স্টেডিয়ামে গিয়ে শোনা গেল—৬০ ওভারের ম্যাচ। তার মানে সীমিত ওভারের মেজাজই থাকার কথা। কিন্তু প্রথম দর্শনেই ধাক্কা—খেলা হচ্ছে সাদা পোশাক ও লাল বলে। একটু পর ব্যাটিংয়ের মেজাজ ও ফিল্ডিং সজ্জা দেখে পরিষ্কার হয়ে গেল যে ওভারের হিসাবে খেলাটা সীমিত হলেও মেজাজ ও ধরন পুরোপুরি দীর্ঘ পরিসরের ম্যাচ। ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে বাংলাদেশ শুরুতে ওয়ানডে সিরিজ খেলবে; সেজন্য আগামীকাল একটা দিবা-রাত্রির একদিনের ম্যাচও খেলবে বাংলাদেশ। তার আগে টেস্টকে মাথায় রেখে এই মেজাজী অনুশীলন ম্যাচটা সেরে নিলেন কোচ। দিনশেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সবুজ দলের অধিনায়ক মাশরাফিও বলছিলেন, এই টেস্ট মেজাজ ও ম্যাচে খেলোয়াড়দের নিবিড়তাটা যাচাই করে দেখাই মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। আর সে উদ্দেশ্য মোটামুটি সফলই হয়েছে বলে তার ধারণা, ‘আজকের ম্যাচের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই ইনটেনসিটিটা বোঝা। একটা দিনে যখন ৯০ ওভার ফিল্ডিং করতে হয় বা ৯০ ওভার ব্যাটিং করতে হয়, তখন এই মেজাজটা ধরে রাখা, ইনটেনসিটি দেখানোটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, আজকের ম্যাচে সবাই এটাতেই ফোকাস করেছিল। দুই দলেরই ব্যাটসম্যানরা বেশিরভাগ তাড়াহুড়ো না করে অনেক সময় ধরে উইকেটে থাকার চেষ্টা করেছে, বড় জুটি করেছে। ফিল্ডিংয়ে যারা ছিল তারা খুব ভাল পরিশ্রম করেছে। প্রতিপক্ষে জুটি বড় হওয়ার পরও মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েনি কেউ। উইকেট কমবেশি ব্যাটসম্যানদের পক্ষে ছিল। তারপরও বোলাররা যে লড়াইটা চালিয়ে গেছে, সেটা খুব উল্লেখযোগ্য ব্যাপার।’ এই লড়াইয়ের কথা বললে সামসুর রহমান শুভ, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম, মার্শাল আইয়ুব, মিঠুন আলী, এমনকি নাসির হোসেনের কথাও বলতে হবে। তবে সবাইকে ছাপিয়ে যাচ্ছেন তামিম ইকবাল। ১০২ বলে তামিমের ৪৪ রানের ইনিংসটার স্কোর দেখলেই বোঝা যায় যে কতোটা স্বভাববিরুদ্ধ ব্যাটিং করেছেন এই ফর্মের জন্য ধুঁকতে থাকা ওপেনার। বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচে রান পেতে, উইকেটে থাকতে ঠিক যেভাবে বলের পেছনে যাওয়া দরকার, ফ্রন্ট ফুটে আরামদায়ক ডিফেন্স করা দরকার, প্রয়োজনের সময় বল ছাড়া দরকার; সেটা কাল যেন ব্যাকরণ বই থেকে তুলে তুলে দেখালেন তামিম। মাশরাফি একটু আলাদা করে তামিমের কথা উল্লেখ না করেই পারলেন না, ‘ও গত বেশ কিছুদিন ধরে একা একা অনেক পরিশ্রম করছে। আজকে খুব ভাল ব্যাটিং করেছে। যদিও আজ একেবারে অন্যরকম ভাবে ব্যাটিং করেছে। একটু সময় নিয়ে নিজে সেট হয়ে ব্যাটিং করার চেষ্টা করেছে। এটা খুব আদর্শ একটা ব্যাপার। একজন খেলোয়াড় যখন ফর্মের বাইরে থাকে, তখন তাকে অনেককিছু সামলাতে জানতে হয়, তখন সে ইচ্ছে করলেও অনেক শট করতে পারে না। এই অবস্থায় ও যে ব্যাটিং করেছে, তা খুবই উল্লেখযোগ্য। আজকে দেখলাম অনেকক্ষণ সময় ব্যাটিং করেছে। প্রায় ১০০ বলের বেশি সে ব্যাটিং করেছে। এবং সুযোগ দেয়নি বোলারদের। এখন আমার মনে হয়, ও দ্রুত নিজেকে ফিরে পাবে।’ সংক্ষিপ্ত স্কোর বাংলাদেশ লাল ৫৪ ওভারে ১৬৭/১ (তামিম অবসর ৪৪, এনামুল হক ২, মুমিনুল অবসর ৪৩, মুশফিক ৩৩*, রুম্মন ২৯*; তাসকিন ১/৩১, মাশরাফি ০/২৮, রবিউল ০/৩২, শুভাগত ০/৫, তাইজুল ০/৩১, মুক্তার ০/১৪, রাজ্জাক ০/২১)। বাংলাদেশ সবুজ ৪৮ ওভারে ২৪৩/৩ (ইমরুল ৪, সামসুর অবসর ৬৪, মার্শাল অবসর ৪০, মিঠুন ৪০, শুভাগত ১২, নাসির ৫৩*, মুক্তার ১৭*; আল আমিন ২/৫০, সফিউল ০/২৫, রুবেল ১/৪৬, লিখন ০/৪৫, সোহাগ ০/৩৩, আরাফাত সানি ০/১৯, মাহমুদউল্লাহ ০/১১, মুমিনুল ০/৭)।