আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, সকল নাগরিকের ও জাতিগোষ্ঠীর সমান অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও এ সমানাধিকার নিশ্চিত হলো না। আদিবাসী ও সংখ্যালঘুরা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। রাষ্ট্র ও সরকারই তাদের অধিকার হরণ করছে, হয়রানি করছে। আদিবাসীদের পরিচয় সংকটেও ফেলে দিয়েছে সরকার। আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবেই সংবিধানে স্বীকৃতি দিতে হবে। মারমা, চাকমা, গারো, সাঁওতাল, খাসিয়া, হাজং, মনিপুরীসহ সকল আদিবাসীকে নিজ নিজ জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি দিতে হবে। তারা স্বতন্ত্র জাতি, বাঙালি নয়, ক্ষমতাসীনদের এ সত্য মেনে নিতে হবে। সরকার বা রাষ্ট্র আদিবাসীদের বাঙালি হিসেবে ডাকার নির্দেশনা দিলে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে।
শুক্রবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ভূমি থেকে আদিবাসী উচ্ছেদ বন্ধ ও তাদের মানবাধিকার সুরক্ষা: রাষ্ট্রের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় দেশের বিশিষ্টজনরা এ কথা বলেন। আদিবাসী দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, এ দেশে কে কোন পরিচয়ে বাস করছে, তা মুখ্য নয়। তবে যে পরিচয়েই বাস করুক না কেন, তার পরিচয় মর্যাদা ও স্বার্থ সরকারকেই রক্ষা করতে হবে। সকল জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে সমান অধিকার দিতে হবে। আর এটি নিশ্চিত করতে জনগণের সচেতনতার বিকল্প নেই। তারাই এজন্য রাজনীতিকদের বাধ্য করতে পারে।
তিনি বলেন, দেশে যেভাবে নিপীড়ন হচ্ছে, এভাবে চললে একসময় এখানে আদিবাসী, হিন্দু, সংখ্যালঘু থাকবে না। এমনকি বলা হবে, এ দেশে নারীও নেই। এ দেশ আমাদের সকলের, এখানে সকলের অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে।
আশা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডালেম চন্দ্র বর্মন বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এবং স্বাধীন হওয়ার ৪৩ বছরেও সংখ্যালঘুদের-আদিবাসীদের অবস্থা একই আছে। সরকার দখলকারী-দখলবাজদের পক্ষে সোচ্চার, ভুক্তভোগীদের ব্যাপারে নিশ্চুপ। যতদিন ন্যায়পরায়ণ শাসন নিশ্চিত না হবে ততদির সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত হবে না।
অর্থনীতিবিদ ড. স্বপন আদনান বলেন, দেশে আইনি কায়দায় অন্যায়ভাবে আদিবাসীদের বাঙালি বানিয়ে দেয়া হচ্ছে। যে সরকার আদিবাসীদের পক্ষে আগে এত কথা বলেছে, তারাই এখন ডিগবাজি খেয়ে আদিবাসীদের পরিচয়ই পাল্টে দিতে ব্যস্ত। এতে তারা শুধু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গই করেনি, দুর্বৃত্তায়নকেও প্রশ্রয় দিচ্ছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংকট বাড়ছেই। রাষ্ট্রযন্ত্র আদিবাসীদের ভূমি দখল করছে।
তিনি বলেন, দেশের রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রবেশ করেছে। আর এর চর্চা করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধেও চেতনার নামে। রাষ্ট্র নিজের বাহিনী ও গুন্ডাবাহিনীকে প্রয়োজনমত ব্যবহার করছে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আদিবাসী বা সংখ্যালঘুরা বৈষম্যে শিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট লাভের রাজনীতির কারণেই। যতদিন নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি থাকবে, ততদিন আদিবাসী সমস্যা থাকবে। কেননা সংখ্যার ও পেশীর জোরে আমরা আইন প্রণয়নে নীতির প্রয়োগ করি, ন্যায়ের প্রয়োগ করি না। অথচ আইন প্রণয়নে নীতি ও ন্যায়, দুইটিই থাকতে হবে। রাঙামাটিতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে বিরোধিতা না করতে তিনি আদিবাসীদের প্রতি আহবান জানান।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার আদিবাসীদের ব্যপারে অনধিকার চর্চা করছে। তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্ররোচনার মাধ্যমে আদিবাসী-বাঙালি, আদিবাসী-আদিবাসী বিভাজন তৈরি করা হয়েছে। এর প্রতিকার করতেই হবে।
গোলটেবিল আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আইনুন নাহার। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং ‘ভূমিই জীবন, ভূমিই অস্তিত্ব’ শীর্ষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস ‘বাংলাদেশের আদিবাসী: সার্বিক অবস্থা, অবস্থান ও করণীয়’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
