পোশাক শিল্পের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন শীর্ষ পর্যায়ে সদিচ্ছা

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০১৪, ২১:৩৪
সেমিনারে বক্তারা ৭০-এর দশকে শুরু হওয়া সস্তা শ্রমের পোশাক শিল্পের রফতানির পরিমাণ বাড়ছে বছর বছর। এ শিল্প এখন দেশের অর্থনীতিতে অপরিসীম অবদান রাখছে। দেশের শিল্পায়নে নতুন মাত্রা যোগ করা এ শিল্পের মাধ্যমেই বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ পেয়েছে নতুন পরিচিতি। সবমিলিয়ে এ শিল্পের সম্ভাবনা প্রচুর। তবে বড় এ শিল্পের সমস্যাও কম নয়। এসব সমস্যার সমাধান করতে প্রয়োজন সদিচ্ছার। এ সদিচ্ছা আসতে হবে শীর্ষ পর্যায় থেকে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা থাকলে পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পের অস্থিরতাও কেটে যাবে। গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে পোশাক শিল্পের চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের উপায় শীর্ষক জাতীয় সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। গবেষণা সংস্থা চিন্তার চাষ ও দি ঢাকা ফোরাম এ সেমিনারের আয়োজন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে এ সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিক উজ জামান। সেমিনারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সস্তা শ্রম দিয়ে শুরু হলেও এখন সে অধ্যায়ের শেষ হয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির গতিধারা ঠিক রাখতে শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না। দরকার দক্ষ শ্রমশক্তি, প্রয়োজন নিরাপত্তার। কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ পোশাক শিল্পকে সোনারখনি উল্লেখ করে বলেন, এ খনি রক্ষা করতে হলে কোথায় কোথায় সমস্যা তা খুঁজে বের করতে হবে। এ বিষয়ে গবেষণা দরকার। বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, পোশাক শিল্পের উন্নয়নে দেশের পোশাক শিল্প কারখানাগুলোকে পূর্ণ কমপ্লায়েন্সের শর্ত না দিয়ে দেশের প্রেক্ষাপটে ভাল (গুড) কমপ্লায়েন্স করতে হবে। এক্ষেত্রে অগ্নি, শ্রমিক ও ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বিভিন্ন ধরনের পরিসংখ্যান করলেও পোশাক শিল্পের বিষয়ে আলাদা কোন পরিসংখ্যান করে না। পোশাক শিল্পের বিষয়ে আলাদা করে পসিংখ্যান করতে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ জানান তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহবুব জামিল বলেন, রাজনৈতিকভাবে এখন ট্রেড ইউনিয়ন ব্যবহার হচ্ছে। এ থেকে বেরিয়ে আসলে ট্রেড ইউনিয়ন আরো ভূমিকা রাখতে পারতো। আবার সরকারের অনেক কিছু করার থাকলেও তা করছে না। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম. এম আকাশ বলেন, সরকারের দায়িত্বটা কতটুকু কার্যকরী হবে তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে। শ্রমিকদের অধিকার, নিয়মিত মজুরি কিংবা সঠিক ক্ষতিপূরণ দিতে পারছি না আমরা। সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, তোবার বিষয়টি যেভাবে সমাধান হচ্ছে তাতে এ শিল্পের মালিক-শ্রমিকদের সুসম্পর্কের উন্নতি হয়েছে বলা হলেও তার নজির দেখা গেল না। সেমিনারে মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, সস্তা শ্রমের কারণেই এদেশে পোশাক শিল্প গড়ে উঠার অন্যতম কারণ। তবে এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনার এ শিল্প এগিয়ে নিতে প্রয়োজন নানা পদক্ষেপের। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকদের অনিয়মিত বেতন-ভাতা এবং কাজের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাবের কারণে শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ছে। সামনে উঠে আসছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের কারণে শ্রমিকরা নিরাপত্তা নিয়েই বেশি আতঙ্কিত। এটা শুধু পোশাক শিল্পের জন্য ক্ষতি নয় বরং মালিক-শ্রমিক তথা গোটা অর্থনীতির জন্যও ক্ষতি। এ শিল্পকে সামনে এগিয়ে নিতে শ্রমিকের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, উচ্চ মূল্যের পণ্য উত্পাদনের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি, কাজের পরিবেশ উন্নয়নের বিকল্প নাই। একইসঙ্গে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি এবং তাদের নিরাপত্তা ও জীবনের মান উন্নয়নের বিষয়টিও অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। সেমিনারে অন্যদের মাঝে বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী, বিকেএমইএ-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিকেএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, চিন্তার চাষের চেয়ারম্যান মুহাম্মাদ শফিকুর রহমান, মজুরি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ইকতিদার আহমেদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।