ফের অশান্তির আগুন গাজায়

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৪, ২১:৪৩
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলা চলছে গত এক মাস ধরে। গাজাবাসীর নিহত কিংবা আহত হওয়াই ছিল প্রধান নিয়তি। দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হয়েছে তাদের। নিজ বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়েছে অন্যত্র। অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েই অকালে জীবন দিয়েছেন। যারা বেঁচে ছিলেন তারা কোনোমতে জীবন কাটিয়েছেন। তবে এত কিছুর পরও মাঝে তিনটি দিন একটু স্বস্তি ফিরে পেয়েছিলেন তারা। মনে করেছিলেন, হয়তো বহুদিনের জন্য বিশ্বের ক্ষমতাবানরা আমাদের স্বস্তি দিল। তাইতো একযোগে সবাই ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়লেন। কেউ নিহতদের লাশ ইচ্ছামতো দাফন করতে, কেউ বা বাজার করতে, কেউ বা প্রিয়জনের খোঁজখবর নিতে। কিন্তু তাদের এই বের হওয়াটা ক্ষমতাবানদের কাছে খুব একটা ভাল লাগেনি! তাইতো তিনদিনই তারা ভোগ করলেন কিছুটা স্বস্তি। ইসরাইল এবং হামাসের তিন দিনের যুদ্ধবিরতির পর গত শুক্রবার থেকে আবারো সেই ইসরাইল বনাম হামাসের যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যুদ্ধ হচ্ছে ইসরাইল এবং হামাসের মধ্যে। আর মরছে নারী-শিশুসহ সাধারণ মানুষ। ইসরাইলি হামলায় ভূতুড়ে শহর গাজায় আবার অশান্তি শুরু হয়েছে। গাজার মসজিদ, জাতিসংঘ আশ্রয় কেন্দ্র, হাসপাতাল, ক্লিনিক কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না ইসরাইলি হামলা থেকে। গাজা পরিণত হয়েছে এক ভূতুড়ে শহরে। গাজার একমাত্র বিদ্যুত্ কেন্দ্রও ইসরাইলি বিমান হামলার শিকার হয়েছে। সেখানেই নিহত হয়েছে প্রায় একশ’। বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে পানি। হাসপাতালগুলোতে পানি এবং বিদ্যুতের অভাবে এক মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। গাজার রাফাহ এলাকার হিলাল এমিরাতি মেটারনিটি হসপিটাল। মাতৃসদনটি ব্যবহূত হয় মা এবং শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য। কিন্তু মাতৃসদন এখন আর সেই সেবার দিতে পারছে না। সেখানে এখন মা এবং শিশুরা চিকিত্সার জন্য আসছেন না। এখনো অনেকেই সেখানে আসছেন, তবে জীবিত নয়, লাশ হয়ে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, তারা এখন আর নতুন জীবনকে স্বাগত জানাতে পারছেন না। মাতৃসদনটি এখন মর্গ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। মাতৃসদনটির ফ্লোরেই কেবল লাশের স্তূপ নয়, রান্নাঘরেও লাশের সারি দেখা গেছে। মাতৃসদনের কর্মীরা এখন নিহতদের আত্মীয়-স্বজনের অপেক্ষায় আছেন। পরিচয় পেলেই তাকে কবর দেয়া হচ্ছে। গাজায় স্বাস্থ্য সেবা ভেঙ্গে পড়ার পর্যায়ে রয়েছে এবং সেখানে যে কোনো সময় চিকিত্সা সেবায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এই তথ্য দিয়েছেন, জাতিসংঘের ত্রাণ ও পূর্ত বিভাগের কর্মকর্তা ক্রিস গানেস। গত তিন সপ্তাহের তীব্র সংঘাতে প্রায় ২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এছাড়া জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে আড়াই লক্ষেরও বেশি ফিলিস্তিনি। তিনি জানান, ৪০ শতাংশ চিকিত্সাকর্মী কাজে যোগ দিতে পারছেন না। তিনি বলেন, গাজার হাসপাতালগুলোর এক-তৃতীয়াংশ, ১৪টি ক্লিনিক এবং অনেকগুলো অ্যাম্বুলেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে পাঁচজন চিকিত্সাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অনেকে। গাজার এসব ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্নির্মাণ করতে হবে সব। গাজার বাড়ি-ঘর এবং সরকারি অবকাঠামোর বেশিরভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে। এর এক কোটি ৮ লাখ অধিবাসী এখন দারিদ্র্যতায় ভুগছেন। তারা এখন সাহায্যের ওপর নির্ভর করছেন। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ি-ঘর এবং অবকাঠামো গড়ে তুলতে এক বছরের বেশি সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তিন দিনের যুদ্ধবিরতি শেষে শুক্রবার থেকে শনিবার পর্যন্ত চালানো হামলায় ১০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। আল-মাগাজি শিবিরে এক বিমান হামলায় দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছে এবং নুসাইরাত শিবিরের আল-কাসাম মসজিদের ধ্বংসস্তূপ থেকে তিনটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে শনিবার। ইসরাইলি যুদ্ধ বিমান নুসাইরাত, জাইশংন ও জাবালিয়া এলাকায় একটি করে মোট তিনটি মসজিদ ধ্বংস করেছে। গাজায় যখন ইসরাইলি হামলায় বেসামরিক লোক গণহারে নিহত হচ্ছে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব এর যথাযথ নিন্দা না জানিয়ে বরং ইসরাইলে আত্মরক্ষার বিষয়টিকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। গাজায় ইসরাইলের নৃশংস বোমা হামলা প্রসঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে ইসরাইল রকেট এবং টানেলের মাধ্যমে আক্রমণের শিকার হচ্ছিল এবং তাদের হামাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হতো। এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে হামাস জঘন্য কাজ করেছে। ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে। সেই অধিকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন আছে। তবে এতে বেসামরিক লোক নিহত হওয়ায় তিনি ‘দুঃখ’ প্রকাশ করেন। পশ্চিমা বিশ্ব যখন ইসরাইলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে তখন আরব বিশ্ব সেটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে! আরব বিশ্ব যে সত্যিকারের কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না সেটা স্বীকারও করেছেন ওআইসি মহাসচিব আব্দুল্লাহ মাদানি। তিনি দাবি করেন, ১৯৬৭ সালে সিনাই মরুভূমি, জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর ও গোলান মালভূমিতে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর প্রবেশেই আরব বিশ্বের পরাজয়ের সুর বেজে ওঠে। আরবরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন দেয়া বন্ধ করার কথা ভাবতেও পারে না। আবার তারা ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনো কিছু করতেও পারছে না। মহাসচিব বলেন, ওআইসি এখন ফিলিস্তিনিদের নির্বিচারে হত্যার বিষয়টিকে ‘যুদ্ধাপরাধ’র শ্রেণিভুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, মানবাধিকার নিয়ে যারা বিশ্বে হইচই করেন তারা ইসরাইলকে কেবল সমর্থনই দিচ্ছে না, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ও দিচ্ছে। ইসরাইল গত ৮ জুলাই হামলার কারণ হিসেবে তাদের তিন যুবক হামাস কর্তৃক অপহরণের কথা জানায়। কিন্তু সেই যুবক অপহরণ এবং তাদের নিহত হওয়া নিয়ে জানা যায় নতুন তথ্য। হামাস এতে দায়ী নয় বলে ইসরাইলি পুলিশ জানায়। এরপর ইসরাইল দাবি করে, গাজা নিয়ন্ত্রণকারী হামাসের ইসরাইলে রকেট হামলা বন্ধ করতেই তারা বিমান হামলা চালাচ্ছে। এরপর তারা বিমান, স্থল এবং নৌ ত্রিমুখী হামলা চালায়। হামলা চলতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যা। কিন্তু হুঁশ হয় না ইসরাইলের, পশ্চিমা বিশ্বসহ মানবাধিকারের মোড়ল সাজা ব্যক্তিদের। কেবল বিবৃতি আর নিন্দা জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে সব। দুই পক্ষের এই অব্যাহত দ্বন্দ্ব নিরসনে মিসরে চলে আলোচনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতে নেতৃত্ব দেয়। কয়েকবার যুদ্ধবিরতির কথা বললেও ইসরাইল তা ভঙ্গ করে বিমান হামলা অব্যাহত রাখে। যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের দোষ পড়ে হামাসের ওপর। এরপর গত মঙ্গলবার জানা যায় স্বস্তির খবর। ইসরাইল এবং হামাস উভয়ই তিন দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। সেটা হলো তারা হামাসের সুড়ঙ্গ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছেন। এমনকি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও বলেছিলেন, গাজায় ইসরাইলি হামলার লক্ষ্য ছিল হামাসের সুড়ঙ্গ ধ্বংস। সেক্ষেত্রে আমরা সফল হয়েছি। এরপর তিনদিনের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগেই মিসরের মধ্যস্ততায় একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চলে। সেখানেও ইসরাইল জানায়, তাদের উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। তারা পুনরায় যুদ্ধবিরতি করতে রাজি। কিন্তু হামাস যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে রাজি হয়নি। কারণ তাদের অনেকগুলো দাবি আছে। সেই দাবি মেনে নেয়া না হলে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা দেয়। হামাসের প্রধান কিছু দাবির মধ্যে রয়েছে ২০০৭ সাল থেকে গাজার ওপর যে অবরোধ রয়েছে যেটা তুলে নেয়া, সীমান্ত খুলে দেয়া, গাজা পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক তহবিল গঠন করা এবং আটক ফিলিস্তিনিদের মুক্তি দেয়া। কিন্তু হামাসের সেই দাবি মেনে নেয়নি ইসরাইল। এরপর ভেস্তে যায় যুদ্ধবিরতির চেষ্টা। শুক্রবারই মেয়াদ শেষ হয় যুদ্ধবিরতির। তবে বিশ্বের মানুষের কাছে যখন এটা যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়া বলে মনে হচ্ছে, তখন গাজাবাসীর মনে হয় যেন আবার তাদের শান্তি ভেস্তে যাওয়া। কারণ শুক্রবার আবারো পুরোদমে ইসরাইল হামলা শুরু করে গাজায়। হামলা আগের চেয়ে জোরদারের আহবান জানান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। ইসরাইল সবসময়ই বলে আসছে, হামাসের সুড়ঙ্গ থেকে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে অবিরত রকেট হামলা চালানো হয়। হামাসের কতগুলো সুড়ঙ্গ আছে সেটা নিয়ে মতবিরোধ আছে। কারো মতে, ৫শ’, আবার কারো মতে, এক হাজার। বেশিরভাগ সুড়ঙ্গ এক মিটার প্রশস্ত এবং আড়াই মিটার উচ্চতার। সুড়ঙ্গগুলো ভূপৃষ্ট থেকে ৩০ মিটার নিচে। এর ভেতর দিয়ে একজন ব্যক্তি অস্ত্র নিয়ে চলাচল করতে পারে। এর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা রয়েছে। সুড়ঙ্গগুলো দুইভাগে বিভক্ত। একটি প্রতিরক্ষা এবং অপরটি আক্রমণের জন্য ব্যবহার করা হয়। প্রতিরক্ষা সুড়ঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে থাকেন হামাসের রাজনৈতিক এবং সামরিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। তারা ইসরাইলি হামলা থেকে নিজেদের বাঁচান। গাজার অনেক অধিবাসী জানান, দুই বছর আগেই ইসরাইল জানতো সুড়ঙ্গ নির্মাণের কথা। আর সেটা স্বীকারও করেছেন ইসরাইলি সেনাবাহিনী। তবে তারা নিশ্চিত হতে পারছিল না। অনেকের বাসভবনের নিচেও সুড়ঙ্গ রয়েছে। সুড়ঙ্গগুলো নির্মাণ করা হয়েছে গাজা এবং মিসর সীমান্তে। কিন্তু সুড়ঙ্গ নির্মাণের কেন প্রয়োজন হলো হামাসের? এ নিয়ে আছে ইতিহাস। আর তাহলো ১৯৬৭ সালে গাজায় প্রবেশ করে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। ২০০৫ সালে সেনা প্রত্যাহার করে ইসরাইল। কিন্তু ২০০৭ সাল থেকে গাজায় অবরোধ আরোপ করে ইসরাইল। সব সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। দুর্বিষহ অবস্থায় পড়েন গাজাবাসী। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীও তারা আনতে পারছিল না। সুড়ঙ্গ যেমন ইসরাইলকে লক্ষ্য করে হামলার জন্য ব্যবহূত হয় ঠিক তেমনি অনেক সুড়ঙ্গই গাজাবাসীর জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়।