২০০১ সালে ইরাক আক্রমণ করার পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরাক হয়ে উঠেছিল গলার কাঁটা। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক নামক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে না পারছিল ফেলতে, না পারছিল গিলতে। বারাক ওবামা ক্ষমতায় আসার পর ইরাক থেকে ‘কাঁথা-কম্বল গুটিয়ে’ দেশে ফিরে যাবার ঘোষণা দেয়ার পর বেশ হাততালি পেয়েছিলেন। কিন্তু ওবামা এটাও বুঝতেন যে ইরাক থেকে একেবারে সরে গেলে জঙ্গিরা যেমন আসকারা পেয়ে মাথায় চড়ে বসবে, তেমনি ইরাকি সরকারও বিদ্রোহীদের কাছে নাস্তানাবুদ হতে পারে। এ কারণে ধীরে ধীরে ইরাকি নিরাপত্তাবাহিনীকে যোগ্য করে গড়ে তুলে তাদের হাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে দিয়ে সরে পড়তে চেয়েছিল মার্কিন সরকার। সেই কারণে, গতবছরের ৩১ আগস্ট বারাক ওবামা আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাক যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেন। এরপর ওয়াশিংটন-বাগদাদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এই চুক্তিতে বলা হয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ায় মার্কিন বাহিনী ইরাকে আর হামলা চালানোর কোনো অধিকার রাখে না। একই চুক্তিতে বলা হয়, ইরাকি বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা অভিযানের বিষয়টি দেখাশোনা করবে এবং মার্কিন বাহিনী যারা অবশিষ্ট থাকবে তারা কেবল ইরাকি বাহিনীকে সহযোগিতা দেবে। তাই কারণ, যা-ই হোক না কেন, ইরাকের মাটিতে আবার হামলা চালানো মানে দেশটির সাথে করা সেই চুক্তিটির লংঘন। সেই কাজটিই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকের মাটিতে আবার হামলা চালিয়েছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বৃহস্পতিবার ইরাকে হামলা চালানোর অনুমোদন দেন। সেই অনুমোদন পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর ইরাকে ‘ইসলামী জঙ্গিদের’ অবস্থানে বিমান হামলা শুরু করে মার্কিন বাহিনী।
আরবিল শহরে কুর্দিদের বিপক্ষে গোলা ছুঁড়তে থাকা ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিদের লক্ষ্য করে শুক্রবার এই বিমান হামলা চালানো হয় বলে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি রিয়ার অ্যাডমিরাল জন কিরবি এক বিবৃতিতে বলেন, স্থানীয় সময় দুপুর পৌনে ২টায় আরবিলের কাছে আইএসের কামান লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালানো হয়। আরবিল শহর রক্ষায় লড়াইরত কুর্দি বাহিনীর ওপর ওই কামান থেকে গোলা ছোঁড়া হচ্ছিল। ইরাকের এই শহরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন বলে পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের দুটি এফ/এ-১৮ জঙ্গি বিমান থেকে ৫০০ পাউন্ড লেজার নিয়ন্ত্রিত বোমা ছোঁড়া হয়েছে বলে পেন্টাগন জানায়। উত্তর ইরাকে ইয়াজিদি সংখ্যালঘুদের ‘অস্তিত্ব’ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে হামলাকে বৈধকরণ করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোন অধিকার বলে ইরাকের মাটিতে হামলা চালিয়েছে তা স্পষ্ট ব্যাখ্যা করা উচিত। যে কয়েকটি দেশের সমর্থন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে সাদ্দাম প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করেছিল, আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘোষণার কারণে সেই আন্তর্জাতিক সমর্থন এখন আর কার্যকর নেই। তাই এই হামলাকে ‘খেয়ালি হামলা’ ও সার্বভৌমত্বের লংঘন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর ওবামা বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী থেকে সংখ্যালঘু ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের জন্য খাবার ও পানির বোতল ফেলা হয়েছে। সিনজার পার্বত্য এলাকায় ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের ঘেরাওয়ের মধ্যে আটকা পড়ে আছেন এই সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার বাসিন্দা। ওই এলাকায় আটকা পড়ে থাকলে ইয়াজিদিদের খাবার ও পানির অভাবে মরতে হবে। আর জঙ্গিদের হাতে পড়লে গণহত্যার শিকার হবে তারা। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে কোনো সঙ্কট তৈরি হলে তার সব জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, আর তা উচিতও হবে না। কিন্তু ইরাকে নৃশংসতা যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র চোখ বন্ধ করে রাখতে পারে না, বিশেষ করে যেখানে ইরাক সরকার সাহায্য চেয়েছে।’
