গায়ে সাদা এপ্রোন। গলায় ঝোলানো পাতলা স্থেটোস্কোপ। গলায় ঝোলানো সেই স্থেটোস্কোপ দিয়ে সামনে বসা রোগীর হূদপিণ্ডের রক্ত সঞ্চালনের পরিমাপ করছেন। কখনোবা ঘড়ি ধরে হাতের নাড়ী পরীক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করছেন রক্ত প্রবাহের গতি প্রকৃতি। ছোটবেলায় এমন করেননি অথবা বড় হয়ে কি হবেন এই প্রশ্নে ডাক্তারির কথা বলেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু ডাক্তারি করা যেমন মুখের কথা নয় তেমনি ডাক্তারি বিষয়ে পড়াশোনা করাটাও বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার, কারণ মেডিক্যাল কলেজগুলোতে প্রতিটি আসনের বিপরীতে প্রতিযোগিতা করতে হয় একাধিক শিক্ষার্থীকে। কখনো কখনো এই সংখ্যা শ’য়ের ঘরকেও অতিক্রম করে ফেলে। কিন্তু একটু অধ্যবসায়ী হলে এবং সঠিক নিয়মানুযায়ী পড়াশোনা করলে হাজারো প্রতিযোগীর ভিড় ঠেলে নিজের আসনটি নিশ্চিত করা কঠিন কিছু নয়। চলুন দেখে একনজরে দেখে আসা যাক মেডিক্যালে পড়াশোনার পুরো প্রক্রিয়াটি।
ভর্তির যোগ্যতা: মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি ও এইচএসসি’র উভয় পরীক্ষায় সর্বমোট জিপিএ-৮ পেতে হবে। তবে প্রতিটিতে ন্যূনতম জিপিএ-৩.৫ পেতে হবে। উভয় পরীক্ষায় জীববিজ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয় এবং জীববিজ্ঞানে ন্যূনতম ৩.০০ পেতে হবে।
নম্বর বণ্টন: মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোর এমবিবিএস/বিডিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষার সর্বমোট নম্বর ২০০। এর মধ্যে ১০০ নম্বর এসএসসি ও এইচএসসি’র ফলাফলের ভিত্তিতে আর বাকী ১০০ এমসিকিউ অর্থাত্ নৈর্ব্যত্তিকের জন্য বরাদ্দ। এসএসসির জিপিএ গুনন ৮ + এইচএসসি’র জিপিএ গুনন ১২ = ১০০ এর মধ্যে আপনার স্কোর। মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে জিপিএ গণনা করা হয় চতুর্থ বিষয়সহ অর্থাত্ এক্ষেত্রে গোল্ডেন এ প্লাস এবং সাধারণ এ প্লাস এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং এইচএসসিতে জিপিএ-৫ থাকলেই আপনার সর্বমোট স্কোর ১০০। আর যাদের সর্বমোট জিপিএ-৮ এর কম তার পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না।
প্রশ্নের মানবন্টন: জীববিজ্ঞানে ৩০, রসায়নে ২৫, পদার্থবিজ্ঞানে ২০, ইংরেজিতে ১৫ এবং সাধারণ জ্ঞানে ১০ সর্বমোট এই ১০০ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার সময় যথারীতি ৬০ মিনিট।
উত্তরপত্র মূল্যায়ন: প্রতিটি প্রশ্নের মান ১ নম্বর তবে উত্তরপত্রে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ নম্বর কাটা যাবে এর অর্থ হলো প্রতি ৪টি ভুল উত্তরের জন্য ১ নম্বর কাটা যাবে। মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তরে ডাবল অ্যানসার, ট্রিপল অ্যানসার অথবা ফাঁকা থাকতে পারে। অর্থাত্ ৪টি নৈর্ব্যত্তিক এর মধ্যে কখনো ২টি আবার কখনো ৩টি উত্তর থাকতে পারে আবার কখনো উত্তর নাও থাকতে পারে। উত্তর না থাকলে উত্তরপত্রের বৃত্ত ভরাট করা যাবে না। করলে নম্বর কাটা যাবে। দুটো উত্তর থাকলে দুটো এবং তিনটে উত্তর থাকলে তিনটে উত্তরই দাগাতে হবে। নয়তো উত্তর বাতিল বলে গণ্য হবে এবং নম্বর কাটা যাবে।
পাস নম্বর: নৈর্ব্যত্তিক পরীক্ষায় সর্বমোট ১০০ নম্বরের মধ্যে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য কমপক্ষে ৪০ নম্বর পেতে হবে। এর চেয়ে কম পাওয়া কোনো শিক্ষার্থী মেডিক্যালে ভর্তি হতে পারবে না । ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে এই নিয়ম প্রযোজ্য করা হয়েছে। তবে আগের নিয়মে এসএসসি, এইচএসসি এবং ভর্তি পরীক্ষার মোট ২০০ নম্বরের মধ্যে পাস নম্বর ১২০।
আসন সংখ্যা: দেশের ২২টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে সর্বমোট আসনসংখ্যা দুই হাজার ৮১২টি। তবে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে আরো সাতটি নতুন মেডিক্যালে শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ থাকবে। ৫৪টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে আসন চার হাজার ৮০০টি। এছাড়াও নয়টি সরকারি ডেন্টাল কলেজ ও মেডিক্যাল কলেজগুলোর ডেন্টাল বিভাগে আসনসংখ্যা ৫৩২ এবং বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ ও মেডিক্যাল কলেজগুলোতে আসনসংখ্যা ১০৫০।
আবেদনের প্রক্রিয়া: মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোর এমবিবিএস/ বিডিএস কোর্সে ভর্তির জন্য আবেদনকারী অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন www.dghs.teeletalk.com.bd এই ঠিকানায়। এছাড়াও টেলিটক ব্যবহার করে এসএমএস-এর মাধ্যমেও আবেদন করতে পারবেন।
আবেদনের সময়সীমা: সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোর এমবিবিএস/ বিডিএস পরীক্ষার জন্য আবেদন ফরম পূরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে ১৬ আগস্ট থেকে। এই প্রক্রিয়া চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। ভর্তি পরীক্ষার আসন কোথায় পরবে এবং পরীক্ষার দিন ও সময় পরবর্তীতে জানানো হবে। ভর্তি পরীক্ষার দুই সপ্তাহ আগে থেকে অনলাইনের মাধ্যমে প্রবেশপত্র ডাউনলোড করে নিতে হবে।
পড়তে পারেন বিদেশেও: দেশে সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে সীমিত আসনের কারণে প্রতিবছরই অনেক শিক্ষার্থী মেডিক্যালে পড়ার সুযোগ পায় না, তারা চাইলে বিদেশি কোন মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করে এসেও দেশে ডাক্তারি করতে পারেন। বিদেশের অনেক মেডিক্যাল কলেজগুলোতে বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের থেকে খরচ অনেক কম এবং পড়াশোনার মানও বেশ ভাল। বর্তমানে মুক্তবাজারের কারণে পৃথিবীর যেকোন দেশেই মেডিক্যালে পড়াশোনা করা যায়। তবে সবসময় একথা খেয়াল রাখতে হবে যে আপনার পছন্দের মেডিক্যাল কলেজটি BMDC অনুমোদিত কিনা নয়তো এক্ষেত্রে আপনার পুরো প্রচেষ্টাই বিফলে যাবে।
খান সাইদুর রহমান
ছবি:রেজা চৌধুরী
