‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই’— মান্না দে’র গাওয়া অমর গানটির মাঝেই লুকিয়ে আছে বন্ধুত্বের মর্মকথা। এই তো হয়ে গেলো বন্ধু দিবস। সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। বন্ধু ও বন্ধুত্ব শব্দটি সবার কাছেই আপন। ‘বন্ধুত্ব’ সম্পর্কটিকে বিশেষভাবে ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন হয় না। জীবনে চলার পথে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু বন্ধু ক’জন হয়? ক্যাম্পাস জীবনে যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সেই বন্ধুত্বের তুলনা অন্য কোন কিছুর সঙ্গে হয় না। তারুণ্যের উচ্ছলতায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তা থেকে যায় সারাজীবন। হয়ত একটা সময় জীবনের নিয়মেই যোগাযোগ কমে যায় কিন্তু থেকে যায় সেই বন্ধুত্বের অটুট বন্ধন।
আজকাল বন্ধুত্ব গড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়ে গেছে। ফেসবুক, টুইটারসহ নানা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অতিদ্রুত মানুষে মানুষে বন্ধুত্ব হয়। ভাবতেই অবাক লাগে! সখ্য খুব দ্রুত গড়ে উঠতে পারে কিন্তু বন্ধুত্ব, সে তো বিশ্বাসের ব্যাপার। আর বিশ্বাস অল্প কয়দিনে গড়ে ওঠা সত্যিই কঠিন। বিশ্বাস ছাড়া বন্ধুত্ব হয় না। বন্ধুত্ব হচ্ছে অনুভূতি যার সঙ্গে আবেগ, ভালবাসা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জীবনের বেশ বড় একটা অংশ আমাদের কেটে যায় ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে। বন্ধুর সাথে ক্যাম্পাসে চায়ের দোকানে আড্ডা, গান, খেলাধুলা আর দুষ্টুমিতে পার হয়ে যায় মধুর সব দিনগুলো। স্কুল আর কলেজ জীবনের বন্ধুত্ব পেরিয়ে এক সময় জীবনে আসে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধুরা। সত্যি বলতে কি, এই শিক্ষা জীবনের অলি-গলি থেকেই কিন্তু আমরা খুঁজে নেই আমাদের আজীবনের বন্ধুদের। ক্যাম্পাস জীবনের পরেও হয়তো বন্ধুত্ব হয় এবং ভালো বন্ধুত্বই হয়। কিন্তু সহপাঠীদের সাথে যে বন্ধুত্বের আবেদনটা চিরকালই কিন্তু একটু অন্য রকম রয়ে যায়। যায় মনের মাঝে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর বিভাগের শিক্ষার্থী প্রতীক রায় বলেন, ‘ক্যাম্পাসে বন্ধুবিহীন দিন পার করা কঠিনই বটে।’ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিন থেকে শেষঅবধি বন্ধুর প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অনামিকা অনু জানান, ‘চলার পথে বন্ধুর সহযোগিতার হাত যেন সে পথকে আরও প্রসারিত করে দেয়।’ স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় নতুন পরিবেশে বন্ধু চিনে নিতে হয়ত অনেকেরই একটু সময় লেগে যায়, তবে শুরু থেকে সবার সাথে পরিচিতি পর্বটা সেরে নিলে সে সংশয় আর থাকে না বললেই চলে। তাই অরিয়েন্টেশন ক্লাসের সময়েই প্রথম পরিচয়ের পর্বটা সেরে ফেলুন। এবং প্রথম দিনের পরিচয় থেমে থাকবেন না। দেখা হলেই কথা বলুন সবার সাথে। তবে এড়িয়ে চললে কারো সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে না।
বন্ধুত্বকে শুধু একটি কথায় বা গানে কিংবা কবিতায় সংজ্ঞায়িত করা যায় না; কোনো কথোপকথনেই সীমাবদ্ধ করা যায় না তার সীমানা। বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসা প্রসঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘বন্ধুত্ব ও ভালোবাসায় অনেক তফাত্ আছে, কিন্তু ঝট করিয়া সে তফাত্ ধরা যায় না। বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালোবাসা পোশাকী। বন্ধুত্বের আটপৌরে কাপড়ের দুই-এক জায়গায় ছেঁড়া থাকিলেও চলে, ঈষত্ ময়লা হইলেও হানি নাই, হাঁটুর নিচে না পৌঁছিলেও পরিতে বারণ নাই।’
ক্যাম্পাসের প্রিয় বন্ধুটির কাছে মন খুলে সবকিছু বলার ক্ষমতা আপনাকে অর্জন করতে হবে। এক্ষেত্রে আপনাকে অনেক বেশি উদার হতে হবে। বন্ধুকে প্রতিযোগী নয়, বরং সহযোগী হিসেবে দেখুন। কাছের বন্ধুটির সাফল্যে আনন্দিত হওয়ার চেষ্টা করুন, তাকে উত্সাহিত করুন। বন্ধুর সাফল্যকে নিজের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করুন। তবেই সমৃদ্ধ হবে বন্ধুর সাথে পথচলা।
