পেসারদের বাঁচাতে বিপদে স্পিনাররা

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০১৪, ২১:৫৪
আজ সকালেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বিমানে চাপার কথা তার। সমুদ্রপাড়ে নারকেল গাছের সারি, পৃথিবী কাঁপানো সব কিংবদন্তীর ভূমি, দুনিয়ার অন্যতম সুন্দর পরিবেশের কথা ভেবে দলের বাকিদের মন হয়তো ফুরফুরে হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই বিমানে চাপার সময়টাতেও সোহাগ গাজীর ভ্রু কুঁচকে থাকার কথা দুশ্চিন্তায়—এখনও যে প্রিমিয়ার লিগের কোনো দল নিশ্চিত হয়নি তার! সোহাগের ব্যাপারটা একটু বাড়তি দুশ্চিন্তার। কারণ, এর মধ্যে দল পেলেও তিনি যে টোকেন তুলে রেখেছেন সেটা ২৭ বা ২৮ আগস্টে জমা দিতে হবে তাকেই। সমস্যা হল, সে সময় তিনি থাকবেন ওয়েস্ট ইন্ডিজে। তাই দলবদল সোহাগকে করতেই হলে সেটা বিশেষ বিবেচনায় করতে হবে। এই বাড়তি দুশ্চিন্তাটা সোহাগকে একটু আলাদা করেছে। নইলে সমস্যাটা আসলে স্পিনারদেরই। জাতীয় দলের পুলে থাকা তিন স্পিনারের আসছে প্রিমিয়ার লিগে দল পেতে প্রাণান্ত হচ্ছে। সোহাগের মতোই এখনও পর্যন্ত দল পাননি আরাফাত সানিও। আর দলের সবচেয়ে সিনিয়র স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক শেষ মুহূর্তে বেঁচে গেছেন কলাবাগান তাকে কিনে নেয়ায়। পুলের দলবদলের শেষ দিন সন্ধ্যা পর্যন্তও রাজ্জাক দল পাবেন বলে মনে হচ্ছিল না। কিন্তু হঠাত্ কী এমন রূপান্তর ঘটলো বাংলাদেশে? যে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের গত বছর পর্যন্তও চালিকাশক্তি ছিলেন স্পিনাররা, তারাই কেন হঠাত্ এমন ব্রাত্য হয়ে গেলেন? গতবারের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী আরাফাত সানি, গত মৌসুমে ঘরোয়া ক্রিকেট ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দু-দুবার রেকর্ড বইয়ে নাম লেখানো সোহাগ গাজী এবং দেশের সেরা স্পিনার আব্দুর রাজ্জাককে দলে নিতে হঠাত্ কেন এমন আপত্তি করছে দলগুলো? দেশের সব উইকেট কী রাতারাতি ওয়াকা-ব্রিসবেন হয়ে গেল! মোটেও না। বলা হচ্ছে বটে, এবার প্রিমিয়ার লিগে উইকেট অন্য যে কোনোবারের চেয়ে একটু বেশি স্পোর্টিং হবে। কিন্তু বাংলাদেশের স্পোর্টিং উইকেটের যে ইতিহাস, তাতে স্পিনারদের দাপট অক্ষুণ্নই থাকার কথা। এইসব উইকেট, কন্ডিশন তাই ব্যাপার নয়। ব্যাপার হল, এবার পেসারদের বাঁচানোর জন্য পুল পদ্ধতিতে একটু পরিবর্তন আনা হয়েছে, তাতেই ফেসে গেছেন স্পিনাররা। আগে পুলের ব্যাপারটা বলে নেয়া যায়। জাতীয় দলে গত এক বছরের মধ্যে একবারও খেলেছেন এমন খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত হয় পুল। আর পুলের থেকে সর্বোচ্চ ৩ জন করে ক্রিকেটার দলে নিতে পারে একটি দল। এখন বেশি টাকার মালিক দলগুলো পুল থেকে ৩ জনের বেশি খেলোয়াড় নিতে না পারায় পুলে থাকা মাঝারি মানের খেলোয়াড়দের দল পেতে একটু সমস্যা সবসময়ই হয়; বড় দল তাদের কিনতে পারে না, ছোট দলের কেনার টাকা থাকে না। স্পিনারদের দাপটের কারণেই গত মৌসুম পর্যন্তও ঢাকার ক্রিকেটে ব্রাত্য ছিলেন পেসাররা। প্রতি বছরই এক দুজন পেসার দল পেতেন না, আর প্রায় সবারই দল পেতে কষ্ট হতো। এমনও দাবি ছিল যে, পেসারদের পুলের বাইরে রাখা হোক। এবার সেই সংকট সমাধানে একটা অভিনব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল—পেসারদের আলাদা ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছিল। এবারের নিয়মটা হল ব্যাটসম্যান-স্পিনারদের ভেতর থেকে নিতে পারবেন দুজন খেলোয়াড়; কিন্তু পেসারদের ক্যাটাগরি থেকে একজন নিতেই হবে। এই নিয়ম করায় বড় দলগুলো একজন করে পেসার নিয়ে পেসারদের চিরকালের হাহাকার মেটালো বটে। সমস্যা হয়ে গেল, বাকি দুটো পুল পজিশনে তারা দুজন করে ব্যাটসম্যানই নিলো। এতে দলই পেতে ঝামেলায় পড়ে গেলেন তিন স্পিনার। রাজ্জাক এ নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে চাইলেন না। কারণ যেভাবেই হোক দল পেয়েছেন এবং নতুন দলের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ পায়, এমন কিছু তিনি বলতে চান না। তবে এটুকু বললেন যে, ‘অশেষ ভোগান্তি হয়েছে দল পেতে।’ সোহাগের ভোগান্তি তো মুখ ফুটে বলার দরকার নেই। তবে তিনি আবার পুলের দোষ দিচ্ছেন না। নিজের কাঁধেই দোষটা নিলেন, ‘আমি কাউকে দোষ দেই না। পুলের একজন ক্রিকেটারও নেয়নি এমন দলও তো আছে। ফলে আমি বলি, নিশ্চয়ই দলগুলো আমাকে এখনও যোগ্য মনে করেনি।’এটা নিশ্চয়ই সোহাগের অভিমানের কথা। অভিমানটা সবচেয়ে বেশি থাকার কথা ঘরোয়া ক্রিকেটের নিয়মিত পারফরমার আরফাত সানির। গত মৌসুমেও ২৯ উইকেট নিয়ে সেরা বোলার ছিলেন। নিজের হতাশাটা লুকালেন না আরাফাত, ‘অবশ্যই হতাশ। এমন পারফরম করেও দল না পেলে কার না হতাশ লাগে। আশাকরি সমস্যার সমাধান হবে’ পুরো ব্যাপারটা বেশ বুঝতে পারছেন পুল করার দায়িত্বে থাকা ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান আকরাম খান। তিনি বলছেন, এই সমস্যা এবার কোনো না কোনো ব্যবস্থা নিয়ে সমাধান করা হবে। আর ভবিষ্যতে এই ব্যাপারটা মাথায় রেখেই তার পুল করবেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক। এরা তিনজন দেশের সেরা ক্রিকেটার। এরা দল না পেলে সেটা খুব খারাপ ব্যাপার। এবার যারা সমস্যায় পড়েছে, এদের ব্যাপারে নিশ্চয়ই কিছু বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। আসলে এই দুটো ক্যাটাগরি করা হয়েছিল পেসারদের দিকটা দেখার জন্য। আগে আপনারা জানেন, প্রতি মৌসুমে পাঁচ-সাতজন পেসারের দল পেতে সমস্যা হত। এবার সেটা না হলেও নতুন সমস্যা দেখা দিলো। আগামী মৌসুমে নিশ্চয়ই পুল করার আগে এটা আমরা মাথায় রাখবো।’