শেষেও সেই শুরুর মাহেলা

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৪, ২১:৫৩
মাহেলা জয়াবর্ধনের প্রতিটি ইনিংসেরই একটা নিজস্বতা আছে। তার প্রতিটি শটের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। ১৯৯৭ সালের টেস্ট অভিষেকে যখন টার্নের বিপরীতে যখন স্কোয়ার কাটে প্রথম বাউন্ডারি ছাড়া করিয়েছিলেন বল, তখনও এটা সত্য ছিল। সত্য ছিল যখন এইতো গত রবিবার গলে সাঈদ আজমলের বিপক্ষে বিষাক্ত ছোবলের মত খেললেন রিভার্স সুইপ। ১৫ বছর বয়স থেকেই তিনি ছিলেন অনন্য। স্রেফ একার ব্যাটের জোরে জিতেছেন অনেকগুলো টেস্ট। অনেক অস্বাভাবিক কীর্তিতে বাঁচিয়ে দিয়েছেন টেস্ট। তিনিই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়েছেন সবচেয়ে বেশি ক্যাচ। তার মতো সৃষ্টিশীল অধিনায়ক শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটে তো বটেই বিশ্বের ইতিহাসেই বা আর কয়জন জন্মেছেন! নালন্দা কলেজ থেকে লর্ডস, কলম্বোর রাস্তায় টেনিস বলের ক্রিকেট থেকে বিশ্বের সেরা বোলিং আক্রমণের বিপক্ষেও তিনি কখনও যুদ্ধে ক্ষান্ত দেননি। ক্রিকেটের যেকোন ফরম্যাটে, যেকোন ভেন্যুতে তিনি নান্দনিক। ক্রিকেটেরই তিনি একজন অমূল্য অলঙ্কার! ক্রিকেটটা চিরকালই তার জন্য এক শিল্পের নাম। সেই শিল্পের আজ অবসান হতে চলেছে। কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবে আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট দিয়েই ১৭ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারের ইতি টানতে যাচ্ছেন মাহেলা জয়াবর্ধনে। বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেট হারাতে যাচ্ছে এর ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানকে। নিজ দেশে দ্বিপক্ষীয় টেস্ট সিরিজ তো শ্রীলঙ্কার জন্য কোন নতুন ঘটনা নয়। এই তো কদিন আগেই খেলল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। কিন্তু পাকিস্তানের বিপক্ষে এই দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজটির আগে শ্রীলঙ্কা জুড়েই পড়ে গেছে সাজ সাজ রব। মোড়ে মোড়ে টাঙানো হচ্ছে পোস্টার, বিলবোর্ড। আর এ সবকিছুই করা হচ্ছে সেই মাহেলা জয়াবর্ধনের। সেই সাজ-সাজ রবটা এখন কিছুটা বিষাদে রূপ নিতে শুরু করেছে। প্রথম দুই টেস্টের এক টেস্ট শেষ হয়ে গেছে। সেটাতে শ্রীলঙ্কা জিতে গেছে বেশ বড় ব্যবধানেই। এবার দ্বিতীয় টেস্ট জয়ের পালা। কিংবদন্তীর বিদায়টা আরও রাঙিয়ে তোলার মিশন। অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউসও তেমনটাই জানালেন, ‘শ্রীলঙ্কার জন্য ও যা করেছে তার জন্য স্রেফ মুখে বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। ওর অভাব কখনও পূরণ করা যাবে না। সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে এই টেস্ট ম্যাচ জয়। মাহেলার জন্য এরকম একটা বিদায়ই দরকার।’ ব্যাটসম্যান জয়াবর্ধনের বিশালত্ব বোঝাতে একটা তথ্যই যথেষ্ট। ইতিহাসে মাত্র পাঁচজনকেই দেখেছে যারা টেস্ট ও ওয়ানডে — দুই ফরম্যাটেই করেছেন ১১ হাজার রান। তাদের একজন হলেন জয়াবর্ধনে। বাকিরা হলেন — শচিন টেন্ডুলকার, রিকি পন্টিং, জ্যাক ক্যালিস ও কুমার সাঙ্গাকারা। ১৪৮ টেস্ট, ৫০.০২ গড়ে রান, ৩৪ টি সেঞ্চুরি; ঝলমলে ১৭ টি বছর কাটানোর জন্য এর চেয়ে বেশি কিছুর দরকার পড়ে না। আর কি দানবীয় শুরুটাই না ছিল। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে ১৯৯৭ সালে যখন ব্যাট হাতে নেমেছিলেন দলের রান তখনই পৌঁছে গিয়েছিল আকাশের চূড়ায়। ৭৯০ রান! চতুর্থ উইকেট পতনের পর তিনি নেমে করেছিলেন ৬৬ রান। তাতেই ৯৫২ রানের বিশ্বরেকর্ড করে ফেলেছিল শ্রীলঙ্কা। সেদিনের সেই ২০ বছর বয়সী তরুণের আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে বিদায়ী টেস্ট। প্রিয় মাঠ কলম্বোর সিংহলিজ ক্রিকেট গ্রাউন্ডেই শেষ দেখা মিলবে তার। এই মাঠে ২৬টি টেস্ট খেলে করেছেন ২৮৬৩ রান। সাথে ১১টি সেঞ্চুরি ও আটটি হাফ সেঞ্চুরি। শেষ বেলায়ও তার দিকেই তাকিয়ে থাকবে লঙ্কান দল। তিনিই হবেন দলের মূল ভরসা, ঠিক যেমনটি ছিলেন গত দেড় যুগ। প্রিয় সতীর্থ কুমার সাঙ্গাকারা সাফ জানিয়ে দিলেন মাহেলার জায়গা সহজে পূরণ করা যাবে না, ‘শুধু আমি নই, ক্রিকেট বিশ্ব, শ্রীলঙ্কা দল ও এর সমর্থকরা ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটারকে বিদায় জানাতে যাচ্ছেন। তার জায়গা সহজে পূরণ করা যাবে না। সব সময় ও ছিল দলের জন্য অন্তপ্রাণ একজন সদস্য। তাকে আমরা সবাই মিস করবো।’ ১৯৪৮ সালের ১৪ আগষ্ট ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওভালে নিজের শেষ টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান স্যান ডন ব্র্যাডম্যান। ৬৬ বছর পর ঠিক একই দিনে বিদায়ী টেস্ট খেলতে নামছেন আরেকজন গ্রেট। শেষ টেস্ট ইনিংসে ব্র্যাডম্যান ফিরেছিলেন কোন রান না করেই। মাহেলার ক্ষেত্রে এবার সেটা না হলেই হয়!