এখনই রপ্ত করুন হজ্বের নিয়ম-রীতি
হজ্ব ইসলামের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ। হজ্বের আভিধানিক অর্থ দৃঢ় ইচ্ছা বা সংকল্প করা। সামর্থ্যের অধিকারী, প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমান নর-নারীর জন্য হজ্ব ফরয। আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা তো বাক্কায় (মক্কা); ওটা বরকতময় এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়েত লাভের কেন্দ্র বানানো হয়েছ। তাতে সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে, যেমন মাকামে ইবরাহীম। আর যে কেউ সেখানে প্রবেশ করে সে নিরাপদ! মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্য ঐ গৃহের হজ্ব তার অবশ্য কর্তব্য এবং কেউ প্রত্যাখান করলে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন’ (সূরা আল ইমরানঃ ৯৬-৯৭)। হজ্বের পুরস্কারঃ হজ্ব মানুষকে নিস্পাপ করে। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্ব করেছে এবং এতে অশ্লীল কথা বলেনি বা অশ্লীল কাজ করেনি, সে হজ্ব হতে সেই দিনের ন্যায় (পাপমুক্ত) হয়ে ফিরবে, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল’ (বুখারী ও মুসলিম)। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মাবরুর হজ্বের (গৃহীত, পূণ্যময়, ত্রুটি বিহীন) প্রতিদান জান্নাত ভিন্ন আর কিছুই নয়’ (বুখারী ও মুসলিম)। হজ্বের ফরজ :১. ইহরাম, ২. উকূফে আরাফা (৯ জিলহজ্ব আরাফায় অবস্থান), ৩. তাওয়াফে যিয়ারত (বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করা)। হজ্বের ওয়াজিবঃ ১. মুজদালিফায় ৯ জিলহজ্ব দিবাগত রাতে অবস্থান করা, ২. রমী (জামারায় কংকর নিক্ষেপ করা), ৩. হাদী (পশু কুরবানী করা), ৪. হলক (মাথা মুন্ডানো/চুল কাটা), ৫. সাফা-মারওয়ায় সাঈ করা, ৬. বিদায়ী তাওয়াফ করা (মীকাতের বাইরে অবস্থানকারীদের)। হজ্বের সুন্নাত :১. মীকাতের বাইরে থেকে আগতদের তাওয়াফে কুদম করা, ২. হজরে আসওয়াদ হতে তাওয়াফ আরম্ভ করা, ৩. রমল করা (উমরাহ ও হজ্বের তাওয়াফে প্রথম ৩ চক্কর দ্রুত হাঁটা) ৪. সাফা-মারওয়ার দুই সবুজ চিহূের মধ্যে দ্রুত হাঁটা, ৫. ৮জিলহজ্ব যোহর হতে ৯জিলহজ্ব ফজর পর্যন্ত ৫ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় আদায় করা, ৬. মক্কায় ৭জিলহজ্ব, আরাফাতে ৯জিলহজ্ব ও মিনায় ১১ জিলহজ্ব ঈমামের খুত্বা শুনা, ৭. উকূফে আরাফার জন্য গোসল করা, ৮. সূর্যোদয়ের কিছুক্ষন পূর্বে মুজদালিফা ত্যাগ করা, ৯). ১০, ১১ ও ১২জিলহজ্ব রাত মিনায় কাটানো। হজ্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যঃ আল্লাহর আনুগত্য, ভয়-ভালবাসা ও ভক্তিতে নিজেকে বিলীন করা। বস্তুর আকর্ষণ মুক্ত হয়ে স্রষ্টার আকর্ষণ বলয়ের মধ্যে প্রবেশ করা। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য পরিপূর্ণ করা। ইসলামি ঐতিহ্যের সর্বাপেক্ষা গুরত্বপূর্ণ নিদর্শনসমূহ স্বচক্ষে পরিদর্শন, হেদায়েত লাভ ও মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তম মিলন কেন্দ্রে অংশগ্রহণ করা। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও ক্ষমা পেয়ে চিরস্থায়ী কল্যাণের স্থান জান্নাতে পৌঁছানোর সুযোগ গ্রহণ করা। হজ্বে মাবরুর (গৃহীত-ত্রুটিবিহীন) হজ্ব অর্জনের উপায়ঃ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের হজ্বের বিভিন্ন নিয়ম-কানুন আমার থেকে গ্রহন কর’ (মুসলিম)। ক. নিয়তকে পরিশুদ্ধ করতে হবেঃ সকল কাজ আল্লাহ তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করা এবং সকল বিষয়ে তাঁর উপর ভরসা করা। তাঁর প্রতি বিশ্বাস, ভালবাসা, ভয় ও আনুগত্য পরিপূর্ণ করা। খ. কর্মসূচি ও কর্মপদ্ধতি পরিশুদ্ধ করতে হবেঃ আল্লাহ তা’য়ালার সকল নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করা। ছোট বড় সকল কাজ মেধা, যোগ্যতা ও আন্তরিকতার সাথে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দেখানো পদ্ধতি অনুযায়ী সম্পাদন করা। নামায বিশুদ্ধ ও সুন্দর করা। কুরআনের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। গ. চরিত্র ও আচার ব্যবহার পরিশুদ্ধ করতে হবেঃ মিথ্যা, অহংকার, রাগ, হিংসা, গীবত, ওয়াদা খেলাপসহ সকল কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। ঝগড়া-বিবাদ, তর্ক-বিতর্ক, বাক-বিতন্ডা পরিহার করা। ধৈর্য ধারণ করা, বিরক্তি পরিত্যাগ করা। অন্যের দোষ-ত্রুটি গোপন করা এবং ক্ষমা করা। নিজের ভুল-ভ্রান্তির জন্য মাফ চেয়ে নেওয়া। দলনেতা, আমীর, দায়িত্বশীলকে মান্য করা। মানুষকে ভালবাসা, অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া। মানুষকে কষ্ট না দেওয়া, বঞ্চিত না করা। সময় ও নিয়মানুবর্তী হওয়া। সব ধরনের অশ্লীলতা
পরিহার করা। দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করা, পর্দা মেনে চলা। অতীতের পাপসমূহ চিহূিত করা। তওবা করা, অনুতপ্ত হূদয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা। জীবনে কখনও এসব গুনাহ না করার প্রতিজ্ঞা করা। ঘ. আর্থিক বিষয়াদি পরিশুদ্ধ করতে হবেঃ হালাল উপার্জিত অর্থ দিয়ে হজ্ব করা। হারাম উপার্জনের সকল উত্স থেকে দূরে থাকা। আমানতের খেয়ানত না করা। অপচয়, অপব্যয় ও কৃপণতা পরিহার করা। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধে আন্তরিক হওয়া। হজ্বের আহকাম এবং পাথেয়ঃ আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘হজ্বের মাসগুলো সুনির্দিষ্ট। অত:পর যে কেউ এই মাসগুলোর মধ্যে হজ্বের সংকল্প করে, তবে সে হজ্বের মধ্যে অশ্লীল আচরন, অন্যায়-আচরন, কলহ-বিবাদ করতে পারবে না। তোমরা উত্তম কাজের যাহা কিছু কর, আল্লাহ তাহা জানেন; আর তোমরা পাথেয়ের ব্যবস্থা করিও; নিশ্চিত উত্কৃষ্টতম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া এবং হে জ্ঞানবানগন! তোমরা আমাকে ভয় কর’ (সূরা বাক্বারাঃ ১৯৭)। তওবা করাঃ আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ অবশ্যই সে সব লোকের তওবা কবুল করেন যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে ও অতি সত্বর তওবা করে। সুতরাং আল্লাহ তাদেরকেই ক্ষমা করবেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। তওবা তাদের জন্য নয়, যারা আজীবন মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, ‘আমি এখন তওবা করছি এবং তাদের জন্যও নয় যাদের মৃত্যু হয় কাফির অবস্থায়। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি’ (সূরা নিসাঃ ১৭-১৮)। গীবতঃ মহান আল্লাহ বলেন, “হে মু’মিনগন, তোমরা অনেক ধারণা পোষণ থেকে বিরত থাক! আর তোমরা পরস্পরের গীবত করোনা। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করে? এটাতো তোমরা অবশ্যই ঘৃণা কর! আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু” (সূরা হুজরাতঃ ১২)। অহংকারঃ আল্লাহ বলেন, ‘ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরন করোনা; তুমি তো কখনো পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনো পর্বত সমানও হতে পারবে না’। (সূরা বনি ইসরাইলঃ ৩৭) ‘অহংকার বশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরন করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না! তুমি পদক্ষেপ করা সংযতভাবে এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু কর; নিশ্চয়ই সুরের মধ্যে গর্দভের সুরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর’ (সূরা লোকমানঃ ১৮-১৯)। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতাঃ আল্লাহ পবিত্রতম! আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তানগন! প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোষাক-পরিচ্ছদ পরিধান কর, খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করোনা, কেননা আল্লাহ অপব্যয়কারীকে ভালবাসেন না’ (সূরা আরাফঃ ৩১)। পর্দা করাঃ আল্লাহ বলেন ‘মু’মিনদেরকে বল তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে; এটা তাদের জন্য পবিত্রতম। মু’মিন নারীদেরকে বলঃ তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। তারা যেন যা সাধারনত প্রকাশ পায়, তা ব্যতীত অলংকার বা সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তাদের ঘাড় ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় (ওড়না/চাদর) দ্বারা আবৃত্ত রাখে, তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে না হাটে’ (সূরা নূরঃ ৩০-৩১)। ধৈর্য্য ধারন করাঃ যে কোন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য্য ধরা। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগন! ধৈর্য্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে আছেন’ (সূরা বাক্বারাঃ ১৫৩)।‘হে মু’মিনগন! তোমরা ধৈর্য্য ধারন কর, ধৈর্য্যর প্রতিযোগিতা কর’ (সূরা আল-ইমরানঃ ২০০)। ‘আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের ভালবাসেন’ (সূরা আল ইমরানঃ ১৪৬)। হজ্ব সফরে শতবার ধৈর্য্য পরীক্ষা হবে! হিংসা পরিহার করাঃ রসূল (স.) বলেন, ‘তোমরা হিংসা করা থেকে বেঁচে থাক কারণ হিংসা নেক আমলসমূহ এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেমন ভাবে আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে’ (আবু দাউদ)।
