স্পেনে বেকারত্ব

আরো বাড়তে পারে!

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৪, ১৯:২২
চলতি বছরের মার্চ মাসে স্পেনে সার্বিক বেকারত্বের হার রেকর্ড পরিমাণ ২৫.৯৩ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরের মাসেই তা অবশ্য ২৫.১ শতাংশে নেমে আসে। ৬ বছর আগে বেকারত্ব যখন বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করলো, তখন সমাজতন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী জোসে লুইস রডরিগুয়েজ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ২০০৯ সালের শেষ নাগাদ অবস্থার উন্নতি ঘটবে। কিন্তু ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় চলে এলেও আহামরি পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই। ব্যাংক অফ স্পেন জানিয়েছে, বেকারত্বের হার সহসাই নাটকীয়ভাবে নিচে নেমে আসবে না। এসব শুনে স্প্যানিয়ার্ডরা রীতিমতো আতঙ্কিত। স্পেনে বর্তমানে ২৫ অনূর্ধ্বদের ৪৫ শতাংশের কোনো কাজ নেই, যা কি-না মহামন্দা আক্রান্ত ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় দ্বিগুণ। রোমান ক্যাথলিক চ্যারিটি ‘কারিতাস’-এর মহাসচিব জানিয়েছেন, স্পেনে তাঁদের কাছে সাহায্য চাওয়া লোকের সংখ্যাটা গত কয়েক বছরে তিনগুণ বেড়েছে। স্পেনের বর্তমান রক্ষণশীল সরকারের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাজয় ক্ষমতায় বসেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, যাতে বেকারত্বের হার নিচে নেমে আসবে। কিন্তু সেই চমকটি দেখাতে পারছেন না প্রধানমন্ত্রী। উল্টো কেউ কেউ এমনও বলছেন, বেকারত্বের হার অদূর ভবিষ্যতে আরো বাড়লেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। ২০০৮ সালের শেষে স্পেনে বেকারের সংখ্যাটা প্রথমবারের মতো যখন তিন মিলিয়নে পৌঁছুলো, তখন সেদেশের ট্রেড ইউনিয়নের এক জ্যেষ্ঠ কর্মী প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, ৪ মিলিয়নে পৌঁছুলে স্পেনে সামাজিক বিপ্লব ঘটে যাবে। রক্ষণশীল অনেক পন্ডিত তখন দ্বিধাহীন কণ্ঠে মন্তব্য করেছিলেন, এমন হলে স্পেনে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেধে যেতে পারে। সে জায়গায় বর্তমান অবস্থাটা ভাবলে অবাকই হতে হয়। বেকারদের সংখ্যা ৫ মিলিয়ন অতিক্রম করেছে; কিন্তু সামাজিক বিপ্লব ঘটেনি; দাঙ্গা-হাঙ্গামার খবরও মিডিয়ায় আসেনি। এর অবশ্য একটি কারণ রয়েছে। স্পেনের লোকেরা আইনের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল। পুলিশের চাকরিটাকে তারা বেশ সম্মানজনক মনে করে। পুলিশের প্রতিটি চাকরির জন্য আবেদনপত্র জমা পড়ে গড়ে ত্রিশটি। ঐতিহাসিকভাবেই স্পেনের লোকজন বেকারত্ব সম্পর্কে সহনশীল। দৃঢ় পারিবারিক নেটওয়ার্ক বেকারদের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। আবার সব বেকারেরই যে কাজ নেই, একথা ঠিক নয়। স্পেনের তেজস্বী ও বর্ধিষ্ণু গুপ্ত (কালো) অর্থনীতির কথা সবাই জানে। ট্রান্স ইন্সপেক্টরস ইউনিয়ন গেসথা’র তথ্যানুযায়ী, জিডিপিতে গুপ্ত অর্থনীতির অবদান ২৩ শতাংশ। গত বছরও তা বৃদ্ধি পেয়েছে ০.৭ শতাংশ। স্পেনে অনেক বেকারই প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ফিরে যেতে ইচ্ছুক নয়, তা সে যতো বেতনই দেয়া হোক। বছরের পর বছর গ্রহণ করছে বেকার ভাতা। স্থায়ী কাজ গ্রহণেও অনেকের রয়েছে ব্যাপক অনীহা। কাজেই বেকারত্বের হার সত্যিই কতো, তা বলা মুস্কিল। অন্তত এটুকু বলা যায় যে, সমস্যাটাকে যতো তীব্র ভাবা হচ্ছে, আসলে ততোটা নয়। ইউরোপের মধ্যে স্পেনে শ্রমবাজার সবচে’ অস্থির। মহামন্দা শুরুর পর থেকে এখানে মানুষ চাকরি হারিয়েছে খুবই দ্রুতগতিতে। কিন্তু তার আগের পরিস্থিতিটা ছিল যেনো তার উল্টো; সৃষ্টি হচ্ছিল অসংখ্য চাকরি, বিশেষত নির্মাণ ক্ষেত্রে। কিন্তু অগণিত বাড়ি অবিক্রিত থাকাতে নির্মাণ শিল্পের অবস্থা এখন করুণ। সে জন্যই স্পেনে বেকারত্বের হার বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। দেশটিতে কর্মীদের ছাঁটাই করাটা খুবই সহজ। স্পেনের একটি ব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, দ্বি-স্তর বিশিষ্ট শ্রম বাজারের কারণেই চাকরি হারোনোর ব্যাপারটা অহরহ ঘটছে। চাকরি প্রার্থীদের এক-তৃতীয়াংশই গ্রহণ করে অস্থায়ী চাকরি, বাকিরা আবদ্ধ হয় স্থায়ী চুক্তিতে। অস্থায়ী শ্রমিকদের বিদায় করে দেয়া যায় জরুরি নোটিসের ভিত্তিতে; ঠিকমতো ক্ষতিপূরণও দেয়া হয় না। এসব দেখে স্পেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর দাবি জানিয়েছেন শ্রম আইন সংশোধনের। তবে তাঁর কথা আমলে নেয়া হচ্ছে না। স্পেনের কার্লোস থ্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমিলিয়ানো কার্লুসিয়ানো বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণ খুঁজতে গিয়ে পেয়েছেন ভিন্ন তথ্য। স্পেনে দ্বি-স্তর বিশিষ্ট শ্রম বাজারের পেছনে কাজ করছে দ্বি-স্তর বিশিষ্ট শিক্ষা। ইউরোপের অন্য বড় দেশগুলোর মতোই এখানে উচ্চশিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কিন্তু ত্রিশ শতাংশ স্প্যানিয়ার্ডই স্কুল ছাড়ে বিশেষ কোনো যোগ্যতা অর্জন ছাড়াই। আর এ স্কুল ছেড়ে আসা তরুণরা চাকরির বাজারে গিয়ে দারুণ সমস্যার মুখে পড়ে। ইন্টারন্যাশনাল নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুসরণে