ইউক্রেনের ক্রিমিয়াকে নিজের করে নেয়া এবং পূর্ব ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উস্কে দেয়ার প্রতিবাদে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কয়েক দফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। মস্কোকে শায়েস্তা করার এই কাজে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোট বাধে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো। রাশিয়ার জন্য যা ছিলো চরম অবমাননাকর এবং অপমানজনক। একই ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার কথা তাই ভাবছিলো মস্কো। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঢিলের বিপরীতে ‘পাটকেল’ হিসেবে ঐসব দেশ থেকে খাদ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে রাশিয়া। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউসহ পশ্চিমা দেশগুলোর উপর ‘মস্কোর নিষেধাজ্ঞা’ জারি।
বিশ্ব রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক মহল বলতে যারা তত্পর, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো। অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন কোন দেশের বিরুদ্ধে এ যাবত্কাল তারাই নিয়েছে শাস্তিমূলক শক্ত পদক্ষেপ। কিন্তু এবার যেন ঘটলো ঠিক এর বিপরীত। রাশিয়া অন্যতম পরাশক্তি বলেই হয়তো এবার তথাকথিত আন্তর্জাতিক মহলের বিরুদ্ধে একাই নিষেধাজ্ঞা আরোপের লড়াই শুরু করেছে।
রুশ প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ জানিয়েছেন, এখন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত সব দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নরওয়ে থেকে ফল, মাছ, মাংস, সবজি, দুধ ও দুধজাত কোন পণ্য আমদানি করবে না রাশিয়া। খাদ্য আমদানি নিষেধাজ্ঞার সাথে সাথে রাশিয়ার আকাশসীমায় ইউক্রেনের বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করেছে মস্কো। প্রধানমন্ত্রী মেদভেদেভ জানিয়েছে, রাশিয়া এখন ভাবছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যু্ক্তরাষ্ট্রের এয়ারলাইন্সগুলোর ক্ষেত্রেও একই নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায় কি না। কিন্তু সেক্ষেত্রে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে এশিয়াগামী বিমানের জ্বালানি খরচ ও সময় কয়েক গুণে বেড়ে যেতে পারে। সাইবেরিয়া থেকে শুরু করে চীন সীমান্ত পর্যন্ত এলাকা এড়িয়ে বিমানের ঘুরে আসতে গেলে পারতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে বাকি বিশ্ব।
খাদ্য আমদানি নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি নিজের উত্পাদন বাড়ানোর তাগিদ বেড়েছে রাশিয়ার। সেইন্ট পিটার্সবার্গের বাসিন্দা জুরি আলেক্সাদ্রোভ জানিয়েছেন, খাদ্য আমদানির নিষেধাজ্ঞায় আসলে রাশিয়ার বেশি কিছু আসবে যাবে না। কারণ সেখানে স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত খাবারই কিনে থাকেন সবাই। তিনি মনে করেন, পশ্চিম ইউরোপের সাথে রাশিয়ার অনেক মিল রয়েছে, যা সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নেই। আর এই নিষেধাজ্ঞাই সে কথা বলছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইইউ বলছে, রাশিয়ার এমন পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। কিভাবে এর জবাব দেয়া হবে— তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা চলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানিকৃত ৬০ ভাগ খাদ্য পণ্যের শূন্যস্থান পূরণ করা হয়তো এতটা সহজ হবে না মস্কোর পক্ষে। যদিও তা পূরণ করতে রাশিয়া এখন দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো এবং তুরস্ক ও চীনকে কাছে টানছে। গত বছর রাশিয়ায় বেলারুশ প্রায় তিন বিলিয়ন এবং ইউক্রেন ও জার্মানি প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার খাদ্য পণ্য রপ্তানি করে। এখন এসবই ক্ষতির কাতারে। ধারণা করা হচ্ছে, রাশিয়া আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে লিথুনিয়া। কারণ দেশটির জিডিপির আড়াই শতাংশ আসতো রাশিয়ায় পণ্য রপ্তানি করে। তবে গবেষকরা মনে করছেন, স্বআরোপিত নিষেধাজ্ঞায় খোদ রাশিয়াই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচেয়ে বেশি। সম্ভবত তা বুঝেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ নির্ধারণ করেছেন মাত্র এক বছর।
গত মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আরো জোরদার করে। এতে দেশটির অর্থনীতির প্রধান কয়েকটি খাত বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সাথে পুতিন সরকারের কয়েকজন আজ্ঞাবহের বিরুদ্ধেও জারি করা হয় নিষেধাজ্ঞা। এর আগে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিবাদে গত মার্চে মস্কোর বিরুদ্ধে প্রথম দফা নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। তবে রাশিয়ার সাথে পশ্চিমা বিশ্বের টানাপোড়েনের কারণটা যেমন সামরিক। তেমনি এর সমাধানের পথও হয়তো সামরিক শক্তি দিয়েই হবে বলে এখন পর্যন্ত মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাই তো রাশিয়ার বিরুদ্ধে বারবারই শোনা যাচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর আহ্বান, সতর্কবার্তা। ন্যাটোর প্রধান অ্যান্ডার্স ফগ রাসমুসেন সম্প্রতি ইউক্রেন সফরকালে বলেন, ইউক্রেনের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যত্ হামলার কবলে। কিয়েভে এক বক্তব্যে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন দিয়ে যাবে ন্যাটো। সীমান্ত এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে এবং বিদ্রোহীদের সমর্থন না দিতে রাশিয়ার প্রতি আহ্বানও জানান রাসমুসেন।
ন্যাটো মহাসচিব এমন সময় এসব কথা বলছিলেন, যখন পূর্ব ইউক্রেনে মস্কোপন্থি বিদ্রোহীদের শক্ত ঘাঁটি দোনেস্ক নগরী ঋণক্ষেত্র। ইউক্রেনের সেনারা বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত দোনেস্ক এলাকার যত কাছাকাছি আসছে, বোমাবর্ষণ এবং সংঘর্ষের মাত্রা যেন ততই বেড়ে চলেছে। বহু বেসামরিক লোকের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে সেখানে। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার বিদ্রোহীদের প্রধান রাজনৈতিক নেতা আলেক্সান্ডার বরোদাই পদত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, পূর্ব ইউক্রেনকে অস্থিতিশীল করে তুলতে বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও বিশেষজ্ঞ সরবরাহ করেছে দেশটি। রাশিয়াপন্থি বিদ্রোহীরা সেই অস্ত্র দিয়েই দোনেস্কের জেনাকিয়েভ এলাকার কাছে গুলি করে ভূপাতিত করে ইউক্রেনের একটি মিগ-২৯ যুদ্ধ বিমান। এর আগে, গত মাসে ইউক্রেনে মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হলে রাশিয়ার সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর উত্তেজনা চরমে রূপ নেয়। ইউক্রেনের অভিযোগ মস্কোপন্থি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্রে বিমানটি ভূপাতিত হয়। যাতে মারা যায় ২৯৮ জন। সবার সন্দেহ, বিমান বিধ্বস্তের জন্য রাশিয়ার অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
