দক্ষিণ সুদান

স্বাধীনতার পরেও রক্তক্ষয়!

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৭
ম্যানি বাওই দক্ষিণ সুদানের খুবই জনপ্রিয় গায়িকা। তিন বছর আগে স্বাধীনতা উদযাপনের দিন গান গেয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন সবাইকে। আর এখন গাওয়ার ফুরসতই পান না তিনি। নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন নারী সুশীল সমাজের গ্রুপগুলোকে সংগঠিত করার কাজে। অনেক দক্ষিণ সুদানিজের মতোই তিনি হতাশ। মনে করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার লোভের কারণেই তাঁর দেশে হাজার হাজার প্রাণ ঝরছে এখনও। ২১ বছরের গৃহযুদ্ধ থামাতে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল আট বছর আগে। আর বহুল প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা লাভের পর কেটে গেছে তিন বছর; তবুও দক্ষিণ সুদান অশান্ত। পৃথিবীর নবীনতম দেশটিতে কোনওভাবেই থামানো যাচ্ছে না চরম সহিংসতা; এক পক্ষ আরেক পক্ষের উপর বিশ্বাস রাখতে পারছে না কিছুতেই। বাওই আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘যখন আমরা গৃহযুদ্ধে লোক হারাতাম, তখন আমরা তাদের নায়ক বলতাম। কারণ তাঁরা একটি স্বাধীন দেশ পাওয়ার জন্য লড়ছিল। কিন্তু এখন যাঁরা সংগ্রাম করছে তাদেরকে আমরা কী নামে ডাকব ভেবে পাচ্ছি না। কী নামে ডাকা উচিত তাও জানি না।’ সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রিক মাচার গত ডিসেম্বরে অভ্যুত্থানের জন্য অভিযুক্ত হওয়ার পরই সহিংসতা চরম মাত্রা পায়; রাজধানী জুভার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে; ফের অস্ত্র হাতে নিতে শুরু করে আমজনতা এবং লঙ্ঘিত হতে থাকে মানবাধিকার। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট তাঁর সাংবিধানিক জরুরী ক্ষমতাবলে ডিক্রিজারি করে মাচারসহ পুরো মন্ত্রীপরিষদকে বরখাস্ত করাতেই সমস্যার সূত্রপাত। সরিয়ে দেয়া হয়েছিল রাজ্য গভর্নরদেরও। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সারা দেশে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারাটাই সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। বর্তমান সরকার জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য একের পর এক উদ্যোগ নিচ্ছে। সরকার সংশ্লিষ্টদের ও সেনাবাহিনীর আনুগত্য লাভের জন্য চেষ্টার কমতি নেই। অধিকন্তু দেশের স্বার্থে প্রগাঢ় ফেডারেলিজম (যুক্তরাষ্ট্রবাদ) প্রতিষ্ঠার আহবান জানানো হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই যেনো কিছু হচ্ছে না। সহিংসতা বাড়ছে তো বাড়ছেই। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্টর অফিসের মুখপাত্র এটনি ওয়েক এটেনি স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘আমরা যুদ্ধের মধ্যে আছি। বলতে দ্বিধা নেই, আমরা বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছি। তারপরেও আমরা ফেডারেলিজমের বিষয়ে কথা বলতে পারি।’ পাবলিক পলিসি থিংকট্যাংক দ্য স্টুড ইনস্টিটিটের প্রতিষ্ঠাতা জক মাদুক জক মন্তব্য করেছেন, দক্ষিণ সুদানের জনগণের মঙ্গলের স্বার্থে সত্যিকারের কোন বিতর্ক হচ্ছে না, বিতর্ক হচ্ছে কে ক্ষমতায় থাকবে আর থাকবে না তা নিয়ে। খার্তুমের আগের সরকারের সকল চরিত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে জুভা সরকারের মধ্যে। শক্তিশালী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে ঐকমত্য ছাড়াই, যাতে অবধারিতভাবেই ব্যর্থ হচ্ছে। দক্ষিণ সুদানের প্রাকৃতিক সম্পদের কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনা প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগাতে গিয়ে স্থানীয়দের স্বার্থ উপেক্ষা করছে। উপরন্তু জড়িয়ে পড়ছে দুর্নীতিতে। যে কারণে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। দেশটির তেল উত্পাদন এরই এরইমধ্যে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। উন্নয়ন প্রকল্প ও মৌালিক সেবার পেছনে ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে সরকার। এর বদলে জোর দেয়া হচ্ছে নিরাপত্তা ও সরকারি কর্মচারীদের বেতনের উপর। সরকারি কর্মচারীদের আনুগত্য লাভের আশায় বেতন বৃদ্ধি করা হচ্ছে ক্রমাগতই। এতে যে অন্যরা অসন্তুষ্ট হচ্ছে, তা বুঝতে পারছে না বর্তমান সরকার। ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় ক’দিন পরপরই আলোচনায় বসে বিবাদমান গ্রুপগুলোর নেতারা। এতে লাভের লাভ কিছুই হচ্ছে না; স্থায়ী সমঝোতার কোন লক্ষণ নেই। যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয় ঠিকই, কিন্তু তা ভাঙতে বেশিদিন লাগে না। জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি হাইড জনসন তাঁর তিন বছরের এসাইমেন্ট শেষ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘দেশ ও দেশের জনগণকে প্রাধান্য দিলে সমাধান বের করাটা কঠিন কোন বিষয় নয়। যদি আরো দেরি হয়, দোষের খেলা চলতেই থাকে, তাহলে আমরা একটি কথাই বলব, ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে গেছে দক্ষিণ সুদানের কিছু লোক।’ হাইড জনসন বর্তমান অচলাবস্থার জন্য মূলত ক্ষমতাসীন এসপিএলএম নেতৃত্বকে দুষছেন। দক্ষিণ সুদানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাবি অনেক পক্ষের। কিন্তু প্রেসিডেন্ট সালভা কীর পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁকে ছাড়া কোন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে না। তাঁর দাবি, তিনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, অতত্রব অন্তর্বর্তী সরকার হলেও তাতে তিনি প্রধানই থাকবেন। এমন হলে কোন লাভ নেই বলেই ধারণা বিশ্লেষকদের। গত ২৩ জুন দু’পক্ষের আলোচনা ভেঙে যায় এসপিএলএম তার আগের অবস্থান থেকে সরে আসায়। এর দুই সপ্তাহ আগে উভয়পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে ক্রান্তিকালীন সরকার গঠনের ব্যাপারে রাজি হয়েছিল। সালভা কীরের অভিযোগ, বিদ্রোহী নেতা রিক মাচার নোংরা রাজনৈতিক খেলা খেলছেন। তাঁর প্রকৃত লক্ষ্য জনগণের মঙ্গল নয়, দেশের সর্বোচ্চ পদটি দখল করা। দক্ষিণ সুদানের সুশীল সমাজের নেতা আর্চবিশপ ড্যানিয়েল ডেং বোলের অভিমত, যত দিন যাবে এবং যত বেশি লোক আলোচনায় জড়াবে ততই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠবে। সবার আগে দুই নেতার একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করা প্রয়োজন। তারপর অন্য বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ক উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিভেন ফেল্ডস্টেইন সম্প্রতি জুভা সফর শেষে মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা এখনই অর্থনৈতিক অবরোধের কথা ভাবছি না। তবে এ অবস্থা চলতে থাকলে এমন কথা ভাবতে বাধ্য হবো। দেশের স্বার্থে দক্ষিণ সুদানের নেতাদের উচিত সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান টানা। নইলে দেশটির সামনে আরো কঠিন পরিণতি অপেক্ষা করছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিদ্রোহীরা সরকারি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কারণে ইতিমধ্যে স্থানচ্যুত হতে হয়েছে লক্ষাধিক লোককে।