বোঝার ভারে ন্যুব্জ ওরা

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৪, ২২:১৬
রাজধানী ঢাকার সাথে দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে যোগাযোগের একমাত্র উপায় সদরঘাট নৌবন্দর। এই বন্দরে দেড় শতাধিক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ বোঝা বহনের কাজে নিয়োজিত। যারা সমাজে কুলি হিসেবে পরিচিত। শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও এই শিশুরা জীবনের প্রয়োজনেই জড়িয়ে গেছে বয়সের তুলনায় অনুপযোগী কাজে। হাজারো রকমের মানুষ ওদের জীবনকে করছে প্রভাবিত। নেশাগ্রস্ত হচ্ছে অনেকে। দুই স্টিমারের ঘর্ষণে কেউ হারাচ্ছে শরীরের অংশ। ওদের কেউ পড়া না পেরে শিক্ষকের হাতে মার খেয়ে বাড়ি ছেড়েছে। কারো সত্ মা ভাত দেয় না বলে পেট চালাতে পথে নেমেছে। কেউ আবার ছোট্ট বয়সেই সংসারের বড় বোঝা ঘাড়ে নিয়ে বাধ্য হয়েই বাড়ি ছেড়েছে। এমন নানা কারণে বুড়িগঙ্গার পানিতে ভেসে সদরঘাটে থিতু হয়েছে আট থেকে আঠার বছরের শিশু কুলিরা। ছোট বয়সে টার্মিনালের নানা মানুষের প্রভাব তাদের নিয়ে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে। বড় হয়ে কি করবে তার উত্তর যেমন জানা নেই, তেমন সাধ্যের অধিক বোঝা বয়ে বড় অসুখ হলে কি করবে তারও কোন সদুত্তর নেই। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, এমন কাজে আছে নানা রকমের ঝুঁকিপূর্ণ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা। টার্মিনাল কর্তৃপক্ষের মতে শিশুশ্রম অবৈধ। চোখের সামনে দেড় শতাধিক শিশু বোঝা টানলেও তারা কিছুই জানেন না। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে এই এলাকায় শিশু বিকাশ কেন্দ্র থাকলেও এগিয়ে আসছে না তারা। ওদের জীবনালেখ্য: মাদ্রাসার শিক্ষক বকাঝকা করায়, আর না পড়ার সিদ্ধান্ত নেয় চাঁদপুরের আবুল কাশেম। এক পর্যায়ে মায়ের বকুনি খেয়ে লঞ্চে ওঠে সোজা সদরঘাট। সেটা চার বছর আগের কথা। এখন তার বয়স ১২। মোঃ বিপ্লব (১০) বোঝা টানার পাশাপাশি পুলিশের কাজে সহযোগিতা করে টার্মিনাল গেটের রিকশা তাড়িয়ে বাড়তি আয় করে। মা-বাবার সাথে সে থাকে জিনজিরায়। মোঃ রনি মিয়ার বয়স দশ, বাড়ি চট্টগ্রামে। সেও বোঝা টানে মাঝ রাত থেকে দুপুর অবধি। আর ভোলার আসলাম জানায় কুলিগিরির পাশাপাশি লঞ্চেও সে কাজ করে। ফলে রাতে সেই লঞ্চে ঘুমানোর ব্যবস্থা তার। তাদের কাজের ধরন সম্পর্কে কাশেম জানায়, আমরা বড় কুলিদের সাথে মিলে, আবার কখনো একা একাও বোঝা নেই। বড়দের সাথে কাজ করলে তারা ইচ্ছা মতো পারিশ্রমিক দেয়। একা বোঝা নিলে আয়টা তার। তবে পুরো আয় কোনভাবেই ছোট্ট এই কুলিরা নিতে পারে না। ইজারাভুক্ত সরদারকে আয়ের একটা অংশ দিতে হয়। কেউ মাঝ রাত হতেই বোঝা বইতে শুরু করে, কেউ আবার সকাল থেকে। লঞ্চ ঘাটে এলেই দৌড়ে তারা ছাদে ওঠে যায়। ছাদ থেকে নিচে নামতে নামতে দেখে কার বোঝার জন্য কুলি লাগবে। মিলন জানায়, শিশুদের ঠকানো যায় বলে যাত্রীরা তাদের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখায়। আবার যখন লঞ্চের চাপ কম থাকে তখন তারা নির্মাণাধীন গেটের সামনে, টার্মিনালের ভেতরে আবার মসজিদেও ঘুমিয়ে থাকে বলে জানায় আসলাম। একবেলা খেতে তাদের বিশ থেকে চল্লিশ টাকা খরচ হয় বলে জানায় রনি। কখনও লঞ্চের চাপ বেশি থাকলে খাওয়ার সময়ও হয় না ওদের। ঈদের সময় সেই রকম চাপ থাকে বলে মন্তব্য বিপ্লবের। বড় হয়ে কি হবে এমন প্রশ্নে ও কোন উত্তর দিতে পারে নি। শুধু কেউ ওয়ানে, কেউ থ্রিতে পড়েছে বলে উল্লেখ করে। পিটুনি নিত্য সঙ্গি: বোঝা ফেলে দিলে যাত্রীদের মার, বড় কুলিদের কাজে ভাগ বসালে কিল-থাপ্পড়, আবার পুলিশের কাজে সহযোগিতা করেও যখন-তখন তাদের লাঠির বাড়ি আমাদের খেতে হয় বলে মন্তব্য করে আসলাম। নতুনদের মারের হার বেশি, যত পুরান হবে ততই মার থেকে বাঁচার কৌশল আয়ত্ত করে ফেলে বলে জানায় বাতেন। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের বন্দর ও পরিবহন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, এ সকল শিশু কুলির কথা তিনি এই প্রতিবেদকের কাছ থেকেই জেনেছেন। তাদের এজারাভুক্ত লাল পোশাকধারী যাত্রীর সাধারণ মালামাল বহন করার শ্রমিক আছে। আর বিআইডাব্লিউটির আকাশী পোশাকধারী শ্রমিক অন্যান্য বোঝা বহন করে। তিনি বলেন, অপরাজেয় বাংলা কিছু ভাসমান শিশুকে শুক্রবারে এখানে পড়াশুনা করায়। জানা যায়, সেভ দ্যা চিলড্রেন এমন ভাসমান শিশু শ্রমিকদের জন্য লার্নিং এন্ড রিক্রিয়েশন সেন্টার করেছে। সেখানে এক সাথে ৩০ জন করে মোট ১০০ জনের মতো শিশুকে টিভি দেখা, খেলা করা ও কিছু স্বাভাবিক শিক্ষা দেয়া হয় বলে জানান প্রতিষ্ঠানের ওয়াকিং চিলড্রেন প্রোগ্রামের ম্যানেজার মোস্তাফা ফিরোজ। আর মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক উল ইসলাম বলেন, শ্রম, সমাজ কল্যাণ ও তাদের মন্ত্রণালয় নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শিশুশ্রম নিরোধে কাজ করছে। কেরানীগঞ্জে এ সকল শিশুর জন্য তাদের শিশু বিকাশ কেন্দ্র আছে। সেখানে আঠার বছর পর্যন্ত শিশুদের পড়াশুনাসহ থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে অনেক সিট খালি থাকলেও এই সকল শিশু স্বাধীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত বলে যায় না। ওদের অসুখ : সাধ্যের অধিক বোঝা বইতে গিয়ে তারা প্রায়ই ব্যথায় ভোগে। আবার তাড়াহুড়ো করে ছাদ বেয়ে নিচে নামার সময় হাত ফসকে কখনো নদীতে, আবার বোঝা নিয়েও পড়ে। ফলে ব্যথ্যা পাওয়ার অভিজ্ঞতা ওদের সকলেরই আছে। বাতেন হাত দেখিয়ে বলে, দুই স্টিমারের ঘর্ষণে তার একটি আঙ্গুল হারায় সে। এই বিষয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক মিজানুর রহমান ইত্তেফাক বলেন, সাধ্যের অধিক বোঝা প্রতিদিন বইলে ওদের দীর্ঘস্থায়ী ঘাড়ে ব্যথ্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এদের হাত-পায়ে ব্যথ্যাসহ স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, এ ধরনের শিশুরা মানসিক চাপেও থাকে। তারা ধূমপানসহ নানা প্রকার নেশাসক্ত হয়, ফলে হেপাটাইটিস-বি ও সি, এইডসসহ নানা সংক্রামক ব্যাধি দেখা দেয়।