অনেক কষ্টের অতীত পেরিয়ে আজ তিনি দর্শক নন্দিত রোজিনা। দেশীয় চলচ্চিত্রাঙ্গনে তার অবদান অপরিসীম। তবে সেই অবদানের পেছনের কষ্টের প্রলেপ মাখা অতীত রোজিনা খুব কমই শুনিয়েছেন তার ভক্ত দর্শককে। ছোটবেলা, সিনেমায় আসার গল্প, সেখানকার পথচলা, অর্জন আর এই বেলার গল্প নিয়ে রোজিনা মুখোমুখি হয়েছিলেন আনন্দ বিনোদনের। তার সাথে কথা বলে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নুপূর বন্দ্যোপাধ্যায়
জীবনে প্রথম তিনি সিনেমা দেখেন রাজবাড়ীর চিত্রা সিনেমা হলে। ছবিটি ছিল ‘সাত ভাই চম্পা’। ছবিটি দেখার পর স্কুলে এসে নিজের বয়সী বান্ধবীদের গল্পের মতো মুখস্থ বলেছেন। আর সেটাই ছিল যেন ছাত্রজীবনের সেরা ঘটনাগুলোর মধ্যে একটা। কবরী আর শাবানার ভীষণ ভক্ত ছিলেন রোজিনা। মনের অজান্তে তাই সে সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কবরীর মতো হাসার চেষ্টা করতেন। আর শাবানার হেয়ার স্টাইল নকল করতে গিয়ে কপালের সামনে চুলকে চাঁদের মতো বাঁকা করে রাখতেন। আর সিনেমার পোস্টার যদি কোথাও হাতের নাগালে পেতেন, সেই পোস্টার বাসার দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখতেন আর ভাবতেন, ইস যদি কবরী-শাবানা হতে পারতাম। বলা যায়, সিনেমা দেখা আর সিনেমার নায়িকা হওয়ার ভাবনা ছাড়া আর কোনো ভাবনাই যেন স্থান পেত না তার মাথায়। ঢাকার আলীজান আর সোলেমানের বাবা-মায়ের সাথে রোজিনার বাবা-মায়ের সম্পর্কটাও ছিল বেশ মধুর। তাদের বাসাতেও যাতায়াত ছিল রোজিনার পরিবারের মানুষদের। আলীজান, সোলেমান আর তার বন্ধুরা মিলে নাটকের ক্লাব করতেন। প্রতি বছরই তারা নাটক মঞ্চস্থ করতেন। আবার আলীজান, সোলেমানও রোজিনাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যেতেন। তাদের কাছে রোজিনা নায়িকা হওয়ার ইচ্ছের কথা বেশ কয়েকবার প্রকাশ করেন। একবার রোজিনাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পর আলীজান ও সোলেমান রোজিনার মাকে নায়িকা হওয়ার বিষয়টি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। তার মা কোনোভাবেই রাজি হলেন না। ভীষণ মন খারাপ হলো রোজিনার। ঢাকায় চলে এলেন আলীজান আর সোলেমান। আর তার পরদিনই কাউকে কিছু না বলে নানির কাছে চলে গেলেন। তাকে বললেন তার স্বপ্নের কথা। নানি তার কথা শুনে বিশ টাকা রোজিনার হাতে তুলে দিলেন। অতঃপর ট্রেনে চড়ে ঢাকায় চলে এলেন রোজিনা। উঠলেন আলীজান-সোলেমানদের বাড়িতে। এদিকে আলীজান, সোলেমান তাদের বাত্সরিক নাটক শায়েস্তা খাঁর মহড়া করছেন। তাতে রোজিনাও অংশ নিলেন। লালবাগ হলে সে নাটকে রোজিনার অভিনয় দর্শককে ভীষণ মুগ্ধ করে। খল অভিনেতা দারাশিকোর সাথে আলীজানের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। একদিন কালীদাস বাবুর পরিচালনায় ‘জানোয়ার’ ছবির শুটিং দেখতে গেলেন রোজিনা, আলীজান, সোলেমানসহ আরও দু’তিনজন। সংসদ ভবনের খেজুর বাগানে তখন শুটিং চলছিল। সেটা রোজিনার দেখা জীবনের প্রথম কোনো ছবির শুটিং। দৃশ্য ধারণ হবে এমন যে শর্বরী নাচবেন, দারাশিকো মদ্যপান করবেন আর তা উপভোগ করবেন। তো পরিচালক উপস্থিত দর্শকের মধ্য থেকে যেকোনো একজনকে যেতে বললেন। তার কাজ হবে ট্রেতে করে মদের বোতলটা দারাশিকোকে দিয়ে আসা। রোজিনা নিজে থেকেই বললেন, আমি যাব। তাকে একটি প্যান্ট আর শার্ট দেওয়া হলো। তা পরিধান করলেন, তারপর দেওয়া হলো মেকাপ। ঘটনাটা ১৯৭৬ সালের একেবারে শুরুর দিকে। মুভি ক্যামেরার সামনে ওঠাই ছিল রোজিনার প্রথম কাজ। এদিকে শুটিং শেষ হওয়ার পর ফটোগ্রাফার রোজিনার বেশ কিছু ছবি তুললেন। আর সেই ছবি এ-হাত ও-হাত ঘুরে গিয়ে পড়ল ‘সাগর ভাসা’ ছবির প্রযোজক আফজাল সাহেব ও ফখরুল সাহেবের হাতে। তারা রোজিনার ছবি দেখে মুগ্ধ হলেন; খবর পাঠালেন রোজিনাকে সরাসরি দেখার জন্য। আবৃত্তি, নাচ, অভিনয় কোনোটাতেই অভ্যস্ত ছিলেন না রোজিনা। তাই সেদিন এ দু’জন প্রযোজকের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলেন। যাই হোক এ দু’জনের সামনে রোজিনা অভিনয় করলেন। আর তার সবকিছুই প্রযোজকদের পছন্দ হলো। চূড়ান্ত করা হলো ‘সাগর ভাসা’ ছবিতে নবাগত নায়ক চঞ্চল মাহমুদের বিপরীতে অভিনয় করার জন্য। স্বপ্নের খুব কাছাকাছি পৌঁছতে পারার কারণে এক অনাবিল আনন্দ যেন দোলা দিয়ে গেল রোজিনার মনে। সাগর ভাসা ছবিতে (যদিও পরে কাজ করা হয়নি) যখন রোজিনা কাজ করেন তখন তার পারিবারিক নাম রেনু নামেই তাকে সবাই চিনতেন। পরিচালক মোহসীন তার ‘আয়না’ ছবিতে কাস্ট করার পর তার নাম দেন শায়লা। শায়লা নামেই তখন তিনি মোহসীন, মতিউর রহমান পানুসহ সে সময়ের প্রথিতযশা পরিচালকদের ছবিতে কাজ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন মহিউদ্দীনের ‘মিন্টু আমার নাম’ ছবিতে কাজ করার জন্য নায়িকা হিসেবে তাকে চূড়ান্ত করা হয় তখন ছবির গল্পের নায়িকার নাম রোজিনা থাকায় শায়লা নাম পরিবর্তন করে রোজিনা নামেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় সাংবাদিকদের কাছে। আর তখন থেকেই পারিবারিক নাম রেনু আর পরিচালক মোহসীনের দেওয়া শায়লা নামটি আড়াল হয়ে যায় রোজিনা নামের কারণে। কিন্তু যে ছবিতে অভিনয় করার চুক্তিতে নাম হয় তার রোজিনা সে ছবিতেও কাজ করা হয়নি শেষ পর্যন্ত। স্থানান্তরিত হন ববিতা। এরপর ১৯৭৭ সালে এফ কবীর চৌধুরীর রাজমহল ছবিতে চিত্রনায়ক ওয়াসিমের বিপরীতে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। শুটিং শেষ হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। ছবিটি সুপার ডুপার হিট ব্যবসা করায় রোজিনাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সে সময়টা প্রসঙ্গে রোজিনা বলেন, ‘এরপর আমার রাতদিন কীভাবে কেটেছে আমি নিজেও জানি না। সে সময় রোজিনা প্রতিদিনই দুই শিফটে দুটি ছবির শুটিং করতেন। খান আতাউর রহমান, আমজাদ হোসেন, মোহসীনসহ সে সময়ের প্রখ্যাত পরিচালকদের ছবিতে তিনি ব্যস্ততায় কাটিয়েছেন তার সময়। আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘কসাই’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য রোজিনা সর্বপ্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর মতিন রহমান পরিচালিত ‘জীবনধারা’ ও কবীর আনোয়ার পরিচালিত ‘দিনকাল’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। কোপ্রোডাকশনের ছবি (পাকিস্তানের সাথে) ‘হাম সে হায় জামানা’তে অভিনয়ের জন্য ১৯৮৬ সালে তিনি পাকিস্তান থেকে নিগার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। এ ছবিতে রোজিনার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় নায়ক নাদিম। এছাড়া রোজিনা নেপাল, শ্রীলঙ্কার সাথেও কোপ্রোডাকশনের ছবিতে অভিনয় করেছেন। ১৯৮৪ সালে রোজিনা কোপ্রোডাকশনের ছবি ‘অবিচার’-এ অভিনয় করেন বোম্বের সুপারস্টার মিঠুন চক্রবর্তীর বিপরীতে। এ ছবির পরিচালক ছিলেন হাসান ইমাম ও শক্তি সামন্ত। সময়ের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে এসে রোজিনা তখন প্রায় ২৫০ ছবি বয়সী এক অভিজ্ঞ অভিনেত্রী। আর তখনই রোজিনা ঘোষণা দেন আপাতত আর ছবিতে কাজ করবেন না। তারপরও হাতে থাকা ছবিগুলোর কাজ শেষ করতে করতে সময় লেগে যায় আরও চার বছর। এপর চলে যান কলকাতায়। কোনো অভিমান কাজ করেছে কি এর পিছনে? জবাবে রোজিনা বলেন, ‘না না অভিমান কেন থাকবে। কোনো কারণই ছিল না। আসলে আমি অনেক কষ্ট করে চলচ্চিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। কেউই আমাকে হাত ধরে নিয়ে আসেননি। আর যদি কৃতজ্ঞতার কথা বলতে হয় তবে বলব আমি নিজের প্রতিই নিজে সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ। আমি নিজে যখন একটা অবস্থানে দাঁড়িয়েছি তখন অনেকেই এসেছিলেন। কিন্তু আমিই ছিলাম আমার অভিভাবক।’ কলকাতায় থাকাকালীন সময়েও রোজিনা বেশকিছু ছবিতে অভিনয় করেছেন। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘সবার উপরে মা’, ‘বাংলার বধূ’, ‘মাতা পিতা’, ‘রূপবান’, ‘ভাই আমার ভাই’, ‘আমার স্বামী’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘আমার নাম মালতী’, ‘কুচবরণ কন্যা’ ইত্যাদি। দীর্ঘদিন পর দেশে এসে ২০০৪ সালে তিনি মতিন রহমানের পরিচালনায় ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় ‘রাক্ষুসী’ ছবিতে অভিনয় করেন। এ ছবিতে তার বিপরীতে ছিলেন ফেরদৌস। তারপর আর কোনো ছবিতে অভিনয় করেননি। এ প্রসঙ্গে রোজিনা বলেন, ‘এখন অনেক প্রযোজক-পরিচালক ছবিতে কাজ করার কথা বলেন। কিন্তু আমি যতদূর জেনেছি এখন ছবি নির্মিত হয় নায়ক-নায়িকাকে কেন্দ্র করে। পার্শ্ব চরিত্রে যারা কাজ করেন তাদেরকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হয় না। যদি সম্মানই না দেওয়া হয় তবে কেন আমি যাব। এর আগে আমি যা পেয়েছি সেটাই আমার গৌরব, সেটাই আমার অহংকার। আমি তা নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই।’
