চিত্রনায়ক ফারুক, এদেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শকের কাছে তিনি মিয়া ভাই নামেই বেশি পরিচিত। সর্বশেষ আজাদী হাসানাত ফিরোজ পরিচালিত ‘ঘরের লক্ষ্মী’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন। এরপর আর নতুন কোনো ছবিতে তাকে দেখা যায়নি। আজকের জানা-অজানা পর্বে কথা বলেছেন দর্শকপ্রিয় এই নায়ক। লিখেছেন কবিতা আলী
আমার কিন্তু কখনোই চলচ্চিত্রে আসার কোনোরকম পরিকল্পনা ছিল না। পাকিস্তান আমলেই আমার বিরুদ্ধে নানা কারণে ৩৭টি মামলা হয়ে যায়। একসময় এগুলো থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য চলচ্চিত্রে কাজ করা শুরু করি। মুক্তিযুদ্ধ করলাম, দেশ স্বাধীন হলো। আবার পুরোদমে চলচ্চিত্রে কাজ করছি আমি। তখন ‘ওরা ১১জন’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবির শুটিং চলছিল। সেই সময় বঙ্গবন্ধুর কাছে যেতে আমার কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো না। কারণ আমার চেহারাই ছিল বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার সিল। তো একবার আমি ধানমন্ডি ৩২-এ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে প্রবেশ করলাম। তিনি দূর থেকে আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, ‘কিরে তুই নাকি এখন রং মাইখ্যা ঢং করা শুরু করছস?’ মনটা আমার এত খারাপ হলো যে মুখটা লুকিয়ে নিলাম। পেছন থেকে কোনোরকম শব্দ ছাড়া আমার কাঁধে হাত রাখলেন। আর বললেন, আরে পাগল আমি কী একটু হাসি-ঠাট্টাও করতে পারব না।’ এরপর তিনি আমাকে বললেন, ‘তুই আসলে এমন একটি জায়গায় আছিস যেখান থেকে তুই অনেক বিপ্লব ঘটাতে পারবি।’ তার সেই কথা আজও কানে ভেসে আসে প্রায়শই।
অনেকের কাছে আমাকে বলতে হয় কেন আমি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার একবার পাওয়ার পর আর পাইনি। আজ সবাইকে বলছি সেই ঘটনা। বঙ্গবন্ধুই কিন্তু মূলত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তন করেছিলেন ১৯৭৫ সালে। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। বাঙালি জাতিই তাকে অ্যাওয়ার্ড দিয়ে পরপারে পাঠিয়ে দিয়েছে। কী এক অসভ্য জাতি আমরা! যাই হোক ১৯৭৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রথা চালু হলো। ‘লাঠিয়াল’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য আমি পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাই। সেই থেকে সেই যে পাশে থাকা শুরু হলো আমার, আমি আর পুরস্কারই পেলাম না। একটি কথাই শুধু বলব ‘লাঠিয়াল’ ছবির প্রধান লাঠিয়াল ছিলাম আমি। কী করে আমি পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পুরস্কার পাই! যাই হোক এরপর থেকে সেই যে লবিংয়ের সূত্র ধরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া নেওয়া শুরু হলো যে কারণে পরবর্তীতে ভালো ভালো ছবিতে অভিনয় করেও আমার ভাগ্যে আর কোনোদিনই জুটল না জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। বিগত কয়েকবছরে এমন অনেক ছবিই নির্মিত হয়েছে যা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আওতাধীন আনাও অযোগ্য। জুরি বোর্ড এমন একটা ঘোষণাই দিয়ে দিক না যে এ বছর ভালো ছবি নির্মিত হয়নি, তাই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া হবে না। তাতে যদি চলচ্চিত্র পরিচালকরা একটু মনোযোগী হন।
আমাদের দেশের ছবির উন্নতি হয় না কেন? এমন প্রশ্ন আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়। কখনোই কাউকে কিছু বলিনি। কারণ বলে কী লাভ। আজ বলতে ইচ্ছে করছে। সিনিয়র শিল্পী কিংবা সিনিয়র পরিচালকদের একের পর এক চলে যাওয়ার কারণে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা কোনোদিনই পূরণ হওয়ার নয়। কারণ সিনিয়র শিল্পী পরিচালকদের মধ্যে পারস্পরিক যে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সময়ের প্রতি সচেতনতা ছিল তার কোনোকিছুই এখনকার শিল্পী-পরিচালকদের মাঝে নেই। যদি তাই হয় তাহলে সিনিয়র শিল্পী-পরিচালকদের প্রয়াণে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা কোনোদিনই আর পূরণ করা সম্ভব নয়। যেমন একজন গল্পকারের ভাবনা দিয়েই এর উদাহরণটা তুলে ধরছি। এখন আর মৌলিক গল্প নেই। পাশের দেশ ভারতের বিভিন্ন ছবি দেখে দেখে একটি গল্প দাঁড় করানোর চেষ্টা চলে। কাহিনীকারই যদি চোর হয় তাহলে ভালো ছবি হবে কী করে?
