টেস্ট ক্রিকেটকে সদ্যই বিদায় জানানো মাহেলা জয়াবর্ধনে জানিয়েছেন, ক্যারিয়ার নিয়ে সন্তুষ্ট হলেও অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকায় আরো বেশি টেস্ট খেলতে না পারার আফসোস রয়ে গেছে তার। বর্ণাঢ্য টেস্ট ক্যারিয়ারের ইতি টানার একদিন পর ভারতীয় সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে (পিটিআই) দেয়া সাক্ষাত্কারে জয়াবর্ধনে বলেন, ‘এটা সত্যি যে, নিজ মাঠের চেয়ে (উপমহাদেশের বাইরে) বাইরে আমার গড় কম। অবশ্যই এ জন্য আমি হাহুতাশ করছি না। তবে আমি যখন পেছনের দিকে তাকাই তখন মনে হয় ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অবশ্যই আরো বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ পেলে আমি খুশি হতাম।’
১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে সন্তুষ্ট কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মৃদুভাষী জয়াবর্ধনে বলেন, ‘নিজের মনকে প্রশ্ন করলে এমই কিছু বিষয় অবশ্যই আছে যা ভিন্নভাবে করতে পারতাম। তবে আমি সব সময়ই শতভাগ উজাড় করে দিয়েছি এবং সঠিক মূল্যবোধ নিয়েই খেলার চেষ্টা করেছি। এতদিন শ্রীলংকার হয়ে খেলতে পেরে আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান। আমার দেশের হয়ে খেলতে পারাটা অবশ্যই একটা বড় সম্মানের ব্যাপার এবং এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্তগুলো সব সময়ই আমার সঙ্গী হয়ে থাকবে।’
নিজের ক্যারিয়ারের বিশেষ মুহূর্তের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলেই আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন মাহেলা।
তিনি বলেন, ‘ম্যাচ শেষে আমার ভক্তদের বিদায় বলাটা ছিল সত্যিই বিশেষ কিছু। কিন্তু গুরুত্বের দিক থেকে বিচার করলে অনেক মুহূর্ত ছিল। এ বছর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা ছিল ভেরি স্পেশাল।
শৈল্পিক আগ্রাসনের প্রতীক এই ব্যাটসম্যান স্মরণ করলেন সাবেকদেরও, ‘মুরালি, ভাসি (চামিন্দা ভাস) এবং সনত জয়সুরিয়াদের মত গ্রেট খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই ড্রেসিং রুম শেয়ার করতে পারাটা ছিল অনেক বড় ব্যাপার। ২০০৬-২০০৯ সাল এবং পুনরায় ২০১২ সালে দলের অধিনায়কত্ব করাটা ছিল খুবই বিশেষ একটা অভিজ্ঞতা।’
আগামী প্রায় এক বছর শ্রীলংকার কোন আন্তর্জাতিক সূচি না থাকায় টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিদায় নেয়ার জন্য এটাকেই সঠিক সময় মনে করছেন প্রায় ২৫ হাজার আন্তর্জাতিক (২৪৯৮৮) রানের মালিক মাহেলা।
সব সময়ই সতীর্থদের কথা চিন্তা করা বিনয়ী স্বভাবের এ গ্রেট খেলোয়াড় বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে, যেকোন কিছুর মতই আমি টেস্ট ক্রিকেট মিস করবে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে বিদায় নেয়ার জন্য আমার সঠিক সময় এসে গেছে। প্রায় এক বছর পর আমাদের হোম সিরিজ রয়েছে এবং দলে তরুণ খেলোয়াড়দের প্রবেশের ও তাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার এটাই সময়।’
অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় ২০১৫ বিশ্বকাপই হবে তার শেষ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এবং এখানে ভাল কিছু করতে দৃষ্টি নিবদ্ধ মাহেলার।
তিনি বলেন, ‘দলে সুযোগ পেলে ২০১৫ বিশ্বকাপ পর্যন্ত আমি ওয়ানডে ক্রিকেট খেলব এবং সত্যিই আমি সে চ্যালেঞ্জের অপেক্ষায় আছি। আমাদের খুবই ভাল একটা দল রয়েছে এবং আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে আমরা শিরোপার দাবিদার হতে পারব।’
শ্রীলংকার ঘরোয়া ক্রিকেটে আরো বেশি সময় দেয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে জয়াবর্ধনের। আন্তর্জাতিক ব্যস্ততার জন্য যা তিনি এত দিন পারেননি।
‘আগামী দুই বছর আরো বেশি ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার পরিকল্পনাও আমার আছে এবং আগামী দুই বছর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ(আইপিএল), বিগ ব্যাশ এবং সিপিএলও আমি খেলতে চাই।’
এতগুলো সেঞ্চুরিসহ (৩৪) টেস্টের মোস্ট স্পেশাল ইনিংসগুলোর মধ্যে চারটি ইনিংসের কথা স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ‘গলেতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে (১৯৯৭) আমার প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি টি(১৬৭) সবার উপরে। পি সারা স্টেডিয়ামে আমাদের জয় পাওয়া ম্যাচে ২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসের সেঞ্চুরি (১২৩)। ২০০৬ সালে লর্ডস টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসের সেঞ্চুরিটি (১১৯) ভুলে গেলে চলবে না। এবং টেস্টে আমার সর্বোচ্চ স্কোর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৭৪ রানের ইনিংস আমার সারা জীবন মনে থাকবে।’
তিনি নিজে বিদায় বলেছেন এবং কুমার সাঙ্গাকারাও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর পথে। এমন অবস্থায় শ্রীলংকান ক্রিকেটের পরিবর্তনকালীন সময়টাতে কোন সমস্যা হবে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাহেলা বলেন, ‘আমাদের তরুণ খেলোয়াড়দের উন্নতি ঘটবে এবং আমি চলে যাওয়ায় একজন তরুণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। শ্রীলংকা ক্রিকেটীয় মেধায় ভরপুর এবং আমি নিশ্চিত যে, পরিবর্তনকালীন সময়টা খুব দ্রুত শেষ হবে।’
রাজনীতি একদম অপছন্দ জয়াবর্ধনে অবসর জীবনটা কাটাতে চান স্ত্রী-কন্যাদের সময় দিয়েই। সবশেষে তিনি বলেন,‘ আগামী দুই বছর আমার নজর আমি ক্রিকেটেই রাখতে চাই এবং পরিবার ও ক্রিকেটীয় দায়িত্বের মধ্যে একটা ভারসাম্য আনতে চাই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ায় স্ত্রী ক্রিস্টিনা ও মেয়ে সানসাকে আমি বেশি সময় দেয়ার সুযোগ পাব এবং ক্যারিয়ারের শেষ বছরটা সত্যিই আমি উপভোগ করতে চাই।
তবে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসরে যাবার পরে কি করবেন সেটা এখনও ভাবেননি বলেই জানালেন তিনি, ‘ক্রিকেটের পর কি করব আমি এখনো নিশ্চিত নই। সম্ভবত পরিবারকে সময় দেয়া, দাতব্য কাজ, ব্যবসা(সাঙ্গাকারার সঙ্গে যৌথভাবে একটি রেস্টুরেন্ট চালনা করছেন ), গণমাধ্যম এবং কোচিংয়ে কিছুটা ঝুঁকতে পারি।’ বাসস/ ওয়েবসাইট
