ছাপা বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি থেকে শুরু করে ডিজিটাল ডক্যুমেন্ট তৈরির জন্য ওসিআর সফটওয়্যারের বিকল্প নেই। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাতেই ওসিআর সফটওয়্যার রয়েছে। তবে এতদিন পর্যন্ত বাংলা ভাষায় ছিল না এমন কোনো সফটওয়্যার। সেই অভাব পূরণ করেছে পুঁথি। জানাচ্ছেন ইমদাদুল হক
একসময় হাতে লেখা পুস্তিকা বা পুঁথিই ছিল আমাদরে সাহিত্য চর্চার সম্বল। ছাপাখানা আবিস্কারের পর তত্কালীন পুঁথি চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, মহাভারত, ইউসুফ-জুলেখা আজও এতটুকু ম্লান হয়নি। এগুলোই আমাদেরকে দিয়ে চলেছে সমকালীন জ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলো। এবার এই পুঁথিকে কালের খেয়ায় আরও সুসংহত করলো টিম ইঞ্জিন, উদ্ভাবন করলো হাতের লেখা ও ছাপা বাংলা অক্ষর ডিজিটাল ফরম্যাটে সংরক্ষণের প্রযুক্তি বাংলা ওসিআর ‘পুঁথি’। অনলাইনে পরীক্ষামূলকভাবে গত সপ্তাহ থেকে সবার মধ্যে আত্মপ্রকাশ করেছে এই ডিজিটাল পুঁথি। বেসরকারি উদ্যোগেই ৩৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব ভাষার ছাপা অক্ষর (অপটিক্যাল ক্যারেক্টর রিকগনাইজার) মেশিনে পাঠযোগ্য করার সফটওয়্যার তৈরির গৌরব অর্জন করল বাংলাদেশ।
ওসিআর
‘অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন’ বা ‘ওসিআর’ এমন একটি সফটওয়্যার যা হাতে লেখা, টাইপ করা ও ছাপার হরফের লেখাকে যন্ত্রে পাঠযোগ্য লেখায় রূপান্তর করতে পারে। ওসিআরের সুবিধা হলো—এটি ছবিতে সংরক্ষিত অক্ষরও চিনতে পারে। ফলে ছবির অক্ষরকে স্ক্যান করে অথবা ছবি তুলে টেক্সট ফাইলে রূপান্তর এবং সম্পাদনাযোগ্য করা যায়।
ওসিআর বনাম পুঁথি
‘পুঁথি’ হলো বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনাইজার (ওসিআর) যা একটি বিশ্বমানের উদ্ভাবন। আবার পুঁথি বাংলা সাহিত্য ও জীবনগাঁথা রচনার সবচেয়ে পুরনো মাধ্যম। বাংলা ওসিআরের মাধ্যমে পুরনো সেই পুঁথি থেকে শুরু করে সব ধরনের ডক্যুমেন্ট ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ ও সম্পাদনযোগ্য করা যাবে। তাই বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে পুরনো এই মাধ্যমের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রথম বাংলা ওসিআরের নামকরণ করা হয়েছে ‘পুঁথি’।
পুঁথির কারিশমা
বাংলা ওসিআর ‘পুঁথি’র মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে যে কেউই নতুন-পুরনো বই বা নথি ডিজিটালাইজড করতে পারবেন। এতে এসব বই, নথি একেবারে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। সেক্ষেত্রে বই, নথি বা কাগজের স্তুপ থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে কোনো তথ্য খুঁজে বের করতে হবে না। ওয়েবে থাকলে সার্চ দিলেই সব তথ্য পাওয়া যাবে। আবার ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তরিত ফাইল থেকেও সহজেই খুঁজে বের করা যাবে প্রয়োজনীয় তথ্য। এ ছাড়া অনলাইন লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় বাংলা ওসিআর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। ই-গভর্ন্যান্স ও কাগজ-ফাইল বিহীন যে অফিসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। সেখানেও ভূমিকা রাখতে পারবে বাংলা ওসিআর। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে আগের সব ফাইল ডিজিটাল ফরম্যাটে ওয়েব, সার্ভার কিংবা কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে সংরক্ষণ করা যাবে। এই মুহূর্তে ‘পুঁথি’ উইন্ডোজের সব সংস্করণ সমর্থন করবে। পরবর্তী সময়ে সফটওয়্যারটি আপগ্রেডের মাধ্যমে অন্য সব অপারেটিং সিস্টেমে ব্যবহারের জন্যও উপযোগী করা হবে। ইতোমধ্যে সেই কাজ শুরুও হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই সফটওয়্যারটি সিম্বল সাপোর্ট করে। তবে আরও উন্নয়নের পর টেবিল (কলাম ও রো সম্বলিত) সাপোর্ট করতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নির্মাতারা। তাদের মতে, বাংলা ভাষায় লিখিত সব কনটেন্ট ডিজিটালের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে টিম ইঞ্জিনের তৈরি পুঁথি ওসিআর অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। এতে সংরক্ষণ করা যাবে ১৮৭৪ সাল থেকে ব্যবহূত নতুন পুরনো বইয়ের সব ধরনের তথ্য। গণগ্রন্থাগারকে খুব সহজেই অনলাইনে নিয়ে আসার একটি বড় মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান যেমন সংবাদপত্র শুধু ডক্যুমেন্টের ইমেজ ফরম্যাটটি ওয়েবে আপ করে দেয়। গবেষণা বা অন্য প্রয়োজনে কোনো তথ্য সার্চ দিলে ওই ইমেজ ফরম্যাট থেকে তা খুঁজে পাওয়া যায় না। ওসিআর অপটিক্যালি ক্যারেক্টারকে রিড করে পাঠককে এই তথ্যের সন্ধান দেবে নিমেষেই। এনবিআর, আদালত, ব্যাংক, জমির নিবন্ধন অফিস এবং এ রকম অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রাত্যহিক দাপ্তরিক দালিলিক কার্যক্রম সম্পাদন করতে পুরনো ডক্যুমেন্ট কম্পিউটার থেকে সহজেই সার্চ করতে সক্ষম হবে। ডক্যুমেন্ট সার্চ করতে আর কোড নম্বরের ওপর নির্ভর করতে হবে না। ডক্যুমেন্টের ইমেজকে ওয়ার্ডে কনভার্ট করে অথবা সরাসরি ইমেজ থেকে রিড করে আউটপুট বের করা যাবে। ওসিআর থেকে সুবিধা নিতে পারবেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও। কেননা ওসিআর ব্যবহার করে পুরনো বা নতুন বইকে ব্রেইল বইয়ে রূপান্তর খুব সহজেই করা সম্ভব। অডিও বুক করাও সহজতর হবে। সবচেয়ে বড় কথা যেকোনো ডক্যুমেন্ট স্ক্যান করে সেই ডক্যুমেন্টের টেক্সটগুলো এডিট করার সুবিধা পাওয়া যাবে পুঁথি সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে।
শুরুর কথা
এই গৌরবের কাজ শুরু হয় আরও তিন বছর আগে। প্রথম এক বছর গেছে কেবল মৌলিক গবেষণার কাজে। এরপর দুই বছর ধরে চলেছে সফটওয়্যার উন্নয়নের কাজ। অবশেষে ৩০ জনের গবেষণা ও উন্নয়ন দলের নিরন্তর পরিশ্রমের ফসল এখন ঘরে উঠেছে বলে জানিয়েছেন টিম ইঞ্জিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরা জুবেরী হিমিকা। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনলাইন লাইব্রেরি ‘অ্যানসেস্টর’ তৈরি করতে গিয়ে বাংলা ওসিআরের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এটা ২০১০ সালের কথা। তখন আমরা পৃথিবীর প্রায় আশি হাজার বিভিন্ন রিসোর্সের বইকে একত্রিত করি। কিন্তু বাংলায় সেটা করতে গিয়ে দেখলাম ওসিআর ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। তাই আমরা এটি নিয়ে গবেষণা ও নানা খোঁজখবর শুরু করলাম। এরপর ২০১২ সালে টেক্সট টু স্পিচ, ওসিআর এবং বাংলা ডিজিটাল অভিধান করপাস তৈরি করতে নিজেরাই কাজ শুরু করি। আশা করছি এ বছরেই করপাসও আলোর মুখ দেখবে। আমরা গত ১৫ আগস্ট ওয়েবে (www.puthiocr.com) সীমিত আকারে বিশ্বের প্রথম বাংলা ওসিআর পুঁথি সেবাটির সঙ্গে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি।’ সরকারি অনুদান পেলে পুঁথির একটি সংস্করণ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথাও জানালেন তিনি। ফ্রি সংস্করণে শতাধিক ফন্টের মধ্যে ১০টির মতো ফন্ট থাকবে। আর বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স সফটওয়্যার কিনতে হবে।
টিম ইঞ্জিন জানায়, প্রকল্পের আওতায় পুঁথি সফটওয়্যারটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। পুঁথির সক্ষমতা বিষয়ে হিমিকা আরও জানান, এই-সফটওয়্যারের মাধ্যমে আগের সব ফাইল ডিজিটাল ফরম্যাটে হার্ডডিস্কে সংরক্ষণ করা যাবে। এটি মাত্র ৪ সেকেন্ডে বইয়ের একটি পাতাকে ডিজিটাইজ এবং এডিটেবল করতে পারে এবং মূল টেক্সটের শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি শব্দ নির্ভুলভাবে প্রদর্শন করতে সক্ষম। নিজস্ব ইঞ্জিন ‘বাংলা ইঞ্জিন’-এ তৈরি এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে হাতে লেখা, স্ক্যান করা, টাইপ করা লেখাকে মেশিনে পড়া ও সম্পাদনা করার মতো করে রূপান্তর করা যায়। এটি ব্যবহার করে নাম দিয়েই খোঁজা যাবে সব ধরনের বাংলা ডক্যুমেন্ট। বাঙালি সভ্যতা ও হাজার বছরের বিলুপ্তপ্রায় বাংলা সাহিত্য সংরক্ষণের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো এই ২৫ মেগাবাইট সাইজের সফটওয়্যারটির মাধ্যমে।
কারিগরদের কথা
বিশ্বে প্রায় ৮০টি ভাষার ওসিআর থাকলেও উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো সফলভাবে বাংলা ওসিআর তৈরি করেছে টিম ইঞ্জিন। ‘টিম ইঞ্জিন’ একটি সোস্যাল গুড কোম্পানি। সামাজিক কল্যাণ ও মুনাফা দুই-ই নিশ্চিত হয়, এমন সব প্রকল্প নিয়ে কাজ করে টিম ইঞ্জিন। বাংলাদেশের উদ্যোক্তা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত তথ্য তৈরি ও সরবরাহ এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য তিনটি ভিন্ন প্রকল্প নিয়ে এখন কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে প্রথম দুই প্রকল্প ‘টেক্সট টু স্পিচ’ এবং ‘বাংলা ওসিআরে’র কাজ শেষ হলেও এখন এই তরুণ দলটি ব্যস্ত রয়েছে ‘বাংলা করপাস’ তৈরির কাজ নিয়ে। টিম ইঞ্জিনের আরএনডি বিভাগের প্রধানের সহযোগিতায় বাংলা ওসিআর সফটওয়্যার তৈরির প্রধান আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করেছেন এসএম আল আমিন (সম্রাট)। মাসুদ রশিদের নেতৃত্বে এসব সফটওয়্যার তৈরির কাজে সহযোগিতা করে ফয়সাল, মোনা, সাজ্জাদসহ ৩০ জনের একটি দল। এই দলের মধ্যে রয়েছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আশিকুর রহমান অমিত। আগামীতে এই পুঁথি যেন স্মার্টফোনেও ব্যবহার করা যায় সেজন্য অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস প্লাটফর্মের উপযোগী অ্যাপ্লিকেশন তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান সামিরা জুবেরী হিমিকা। গবেষণা থেকে বাণিজ্যিক পণ্য উত্পাদনের লক্ষ্য নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে রাত-দিন এক করে ধানমন্ডির একটি বাড়ির নিচতলায় কাজ করছেন এই দলের সদস্যরা।
পুঁথি ব্যবহার
সীমিত পরিসরে ওসিআর ‘পুঁথি’ অনলাইনে বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাবে। তবে পেশাদার বা বাণিজ্যিক কাজের জন্য সফটওয়্যারটি সংগ্রহ করে পিসিতে ইন্সটল করার পর রান করে ব্যবহার করা যাবে। অনলাইনে ওসিআর করতে চাইলে পুঁথির ওয়েবসাইটে ডক্যুমেন্ট আপলোড করে ওসিআর করা যাবে। প্রাথমিকভাবে মোট ৫টি প্যাকেজে পুঁথি বাজারে নিয়ে আসা হয়েছে। টিম ইঞ্জিন সূত্র জানিয়েছে, প্যাকেজগুলোর মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ফন্ট সম্বলিত বেসিক প্যাকেজ রয়েছে। পাশাপাশি একটি হাই-এন্ড প্যাকেজ বাজারে রয়েছে যা শতাধিক ফন্টের সাথে ব্যবহার করা যাবে এবং এর প্রসেসিং গতিও হবে বেশি। এ ছাড়াও বিশেষ কোনো প্রজেক্টের জন্য ডেডিকেটেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজও রয়েছে। অচিরেই মোবাইল অ্যাপ হিসেবেও বাংলা ওসিআর বাজারে নিয়ে আসা হবে।
প্রাথমিকভাবে পুঁথির ওয়েব সংস্করণে কিছু সীমাবদ্ধতাসহ ওসিআর সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এর জন্য ২ মেগাবাইটের নিচে কোনো ইমেজ আপলোড করতে হবে। আর আপাতত কেবল কোনো ইমেজ থেকে প্রথম ৬০টি শব্দকে টেক্সটে রূপান্তর করছে এই ওয়েব সংস্করণটি। সার্ভারের আপগ্রেড করা হলে আর এই সীমাবদ্ধতা থাকবে না বলে জানিয়েছে টিম ইঞ্জিন।
