বাবা শখ করে তার নাম রেখেছে বাজলাল ইবনে করিম। বাবা ছোটবেলায় আদর করে ডাকত, বাজলাল তুমি কোথায়? উত্তর আসত—এই তো বাবা। সহপাঠীদের কাছে তা হয়ে গেল বজলু। এরপর বাবা-মায়ের কাছেও একদিন বাজলাল বজলু হয়ে গেল। আয়নায় বজলু এখন নিজেকে দেখছে। গোঁফ আসার আভাস। বজলু চোখ বুঁজে নখ লাগায় ছোট ছোট গোঁফে। হাত দিতেই সিভিল সার্জন বাবার হাঁক—বজলা, তোর প্রগ্রেসিভ রিপোর্টটা নিয়ে আয় তো। বজলুর দু-নখের মাঝে সদ্য তোলা গোঁফ। আয়নাটাকে বিছানায় রাখার আগেই বাবাকে দেখতে পায় বজলু। গতকাল তোর রেজাল্ট শিট দিয়েছে, কই দেখা। বজলু এদিক ওদিক হাতিয়ে বাবার দিকে তাকায়। হারামজাদা পাঁচ পেপারে ফেল করেও আয়নায় মুখ দেখছিস। তোর লজ্জাও করে না? কানে বাবার হাত পড়তেই বজলুর মুখটা বাংলা পাঁচ হয়ে যায়। কান ধরে মুখটা নিচে নামিয়ে পিঠে তিন-চারটা কিল কষিয়ে দেয় সিভিল সার্জন আবদুর রশীদ। শব্দে বেদানা বেগম দৌড়ে আসে। তোমার আদরের মেয়েও তিন পেপারে গোল্লা মেরেছে। তাকে তো কিলাও না, আমার বজলুর আজকে খেলা আছে। আদরে আদরে সব গোল্লায় গেছে।—বিরবির করতে করতে ঘর থেকে বেরোয় আবদুর রশীদ। বাবা লেগেছে। অর্ধেক তোলা গোঁফ হাতে মা দেখে আবার কী ভাববে। হেসে মাথা নেড়ে না বলে বজলু কানে কিন্তু তীব্র ব্যথা। ও বজলু, উঠ তোর খালামণি আসছে এতক্ষণে বোধহয় হুলারহাট এসে গেছে। বজলু লাফিয়ে ওঠে, মা রিমাপুও আসছে। পিরোজপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ক্লাস নাইনের ছাত্র বাজলাল ইবনে করিম সেন্টার ব্যাক হিসেবে চমত্কার ফুটবল খেলে। আজ টাউন স্কুলের সাথে বিকেল তিনটায় খেলা। খেলার কথা মনে করে দশটা বুক ডন দেওয়া শুরু করে। তিনটা দিতেই শুনতে পায়—খালা, বজলু কোথায়? পেন্টালুনটা তুলেই বজলু ভরা কণ্ঠে বলে, এই আমি। আরে তোর তো গোঁফ উঠছে বজলু, ব্রনও। বজলু একটু লজ্জা পায়। থাম রিমা। ও একটু বড় হইছে না। এই শার্টটা পর বজলু। খালার হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে বজলু তার ঘরে ঢোকে। বজলুদের আদি নিবাস শরীয়তপুরে। বরিশালের ডিসি আহসান হাবিব বজলুর ছোট খালু। পিরোজপুরের সিভিল সার্জন বজলুর বাবা। বাবার চাকরিসূত্রে বিভিন্ন জায়গা দেখা হয়েছে বজলুর। পিরোজপুরে বছর দুয়েকের মতো হলো। সাবডিভিশন শহর পিরোজপুর ছোট্ট ছিমছাম। বজলুর ভালো লাগে। পরির মতো রিমাপু, বয়স প্রায় একই হবে। মাথাটা একটু বেশিই মোটা বলে বজলুর শিক্ষাজীবন একটু গতিহীন—এমনটাই বজলুর ভাবনা। সে কারণেই সমবয়সী বোনটিকে রিমাপু বলে। বাজলাল ইবনে করিমের মন খারাপ। ইন্টার স্কুলের ফাইনালে টাউন স্কুলের কাছে তিন গোলে হারার পরে খেলা পরবর্তী সংঘর্ষের সময় বজলু দুটি ঘুষিও খেয়েছে। ঘুষি আর গোলের কথা ভাবতে ভাবতে বজলু যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, নিজেই টের পায়নি। রিমার ডাকে ঘুম ভাঙে তার।
বরিশালের বিখ্যাত অশ্বিনী কুমার টাউন হলে আজ প্রথম গান গাওয়ার কথা মধুরিমার। আয়োজকরা সদর গার্লস থেকে দুজনের নাম চেয়েছে, কর্তৃপক্ষ পাঠিয়েছে বাসন্তী আর রিমার নাম। শুধু পাঠিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, একজন টিচারও সাথে এসেছে তাদের। ব্রিটিশ ধাঁচের টাউনহলটি রিমার ভালো লাগে। কিন্তু নিজের ভয় এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। প্রচুর পুলিশ, পাস দেখে রিমাদের ছেড়ে দেয়। একজন ভিআইপি আসবে বলে কথা। রিমা পরেছে সাদা শাড়ির সাথে খোঁপায় বেলী ফুলের মালা। আয়োজকরা বার বার শিল্পীদের নাম বলে যাচ্ছে। ভিআইপি মহোদয়ের অনিচ্ছাকৃত দেরি। সুতরাং মূল অনুষ্ঠান ও শুধু হচ্ছে না। অনেক নামী শিল্পীর মধ্যে একটি অচেনা নাম মধুরিমা। অবশেষে গেস্টদের বক্তৃতা আলোচনার পর গানের অনুষ্ঠান শুরু। তিন জনের পরেই রিমার গান। মাইকে রিমার নাম আসতেই বিশেষ কোনো হাততালি আসলো না। আবছা আলোয় স্পষ্ট দেখতে পায় বাবাকে। হলটিতে সুনসান নীরাবতা চলে আসে। ভেসে আসে ‘সখি ভাবনা কাহারে বলে’। শেষ হতেই হাততালির পরিমাণ বেড়ে যায়। তারপর লতাজীর গান মধুরিমার কণ্ঠে—‘কৃষ্ণচূড়া শোন...’ হল আবার নীরব হয়ে যায়। নির্ধারিত গান দুটোই রিমার। পেছনের সারি থেকে ভেসে আসছে ওয়ান মোর— ওয়ান মোর। রিমাকে থামায় উপস্থাপক। একটি চিরকূট খুলে আবার বলে, ভিআইপি মহোদয়ের বিশেষ অনুরোধে মধুরিমা আর একটি গান করবেন। এবার মাইকে ভেসে আসলো—‘আমার মনের কোণের বাইরে আমি জানালা খুলে চাইরে। হলটিতে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। অনুষ্ঠান শেষ হতেই পেছনের সারির অনেক দর্শক চলে আসতে চায় সামনে। পুলিশ থামায়। —আপনার মেয়ে এত সুন্দর গায় আপনি তো কখনো বলেননি ডিসি সাহেব। —আমিই জানিনা স্যার, ও এখানে আজ গাইবে। ও তাই! ভিআইপি মহোদয় সিগারেটে শেষ টান দিয়ে গাড়িতে ওঠার আগে হেসে বলল—ভারী সুন্দর আপনার মেয়ের কণ্ঠ। এ মেয়ে একদিন বড়ো শিল্পী হবে। আপনাকে আজ আর আসতে হবে না। ইউ হ্যাভ ডান মোর। আহসান হাবীব আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। মা গাড়িতে ওঠো। রিমার মাথায় হাত রাখে বাবা। রিমা গাড়িতে ওঠে। এখনো ভিড় কমেনি। রিমাদের গাড়িটা স্টার্ট নিতেই কয়েকজন যুবককে সামনে দেখতে পায় রিমা। একটু ভয় নিয়ে নিজেই দরজা খোলে রিমা। কয়েকটা গোলাপ বড়িয়ে দেয় একটি ছেলে। অনল চৌধুরী বিএম কলেজ-এর ছাত্র। আজকের চমত্কার গানের জন্য। বেশ ভরাট গলা। ছেলেটি কি চোখে কাজল পরেছে, রিমা মনে মনে হাসে। রিমা ফুলগুলো নেয়। গাড়ি আবার চলতে শুরু করে। তোর আজকে অনুষ্ঠান অথচ আমাকে একবারও বলিসনি মা। আমিই দুপুরে জেনেছি বাবা। আর তুমি তো ভিআইপি প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত। তা ঠিক। বাবার কণ্ঠে ক্লান্তি রিমা টের পায়। বেশ গরম বাবা, দেশের রাজনৈতিক অবস্থাও বেশ গরম। মানে? না মা। বাবা-মেয়ের ছোট্ট দু-একটি কথার ফাঁকে গাড়িটি কখন যে ডিসি বাংলোতে ঢুকে পড়েছে কেউই টের পায়নি।
অনল চৌধুরীর সাথে দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল রিমার বিএম কলেজের সায়েন্স ফেয়ারে। কেমন যেন কাজল পরা চোখ। ছেলেটাকে দেখলেই হাসি পায় রিমার। সেবার সাথে মা। ডিসির কন্যা বা বউ হিসেবে রিমাদের আলাদা কোনো প্রটোকল ছিল না। অনল একটা স্টলের দায়িত্বে ছিল। সেটারই সামনে ছিল রিমা। মা পেছনের স্টলে। অনল তাকে দেখচ্ছে সূর্য থেকে কিভাবে শক্তি পাওয়া যেতে পারে। রিমা দেখতে চায়। অনল খুব সিরিয়াসলি তাকে বোঝাচ্ছে। রিমা শুধু হাসে। তার চোখের কাজল দেখে। অনল কিছু একটা অনুমান করে। বলো তো কিভাবে সৌর বিদ্যুত্ পাওয়া যেতে পারে। মানে? আপনার কাছে আমি কি পরীক্ষা দিতে এসেছি? আমি ভাবছি আপনার চোখের কাজল তত্ত্ব। একদম অনলের চোখের দিকে তাকায় রিমা, ওমা ছেলেরা কি কাজল পরে নাকি। হঠাত্ বিকট শব্দ। রিমা দৌড়ে মায়ের বুকে পরে। চারদিকে হুটোপুটি। যে যার মতো দৌড়াচ্ছে। আরো শব্দ। রিমা কানে আঙুল দেয়। কাজল চোখের ছেলেটি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ওদের ঘিরে দাঁড়ায়। একটুও ঘাবড়াবেন না। থেমে যাবে সব। সত্যিই থেমে যায়। শুধু মেলায় যাব, মেলায় যাব। তোর বাবা বলছিল না দেশের অবস্থা ভালো না। এখন বোঝ। মায়ের ভারী কণ্ঠ। দোড়াদৌড়ি একসময় থেমে যায়। বাবা আমাদের একটা রিকশা ডেকে দাও। রিমার মা বলেই চলছে। মানে আপনারা গাড়ি আনেননি। কিছুটা ভয়ার্ত চোখে রিমার মা তাকায় ছেলেটির দিকে। তুমি আমাদের চেনো? ওমা চেনব না কেন? আপনি ডিসি সাহেবের ওয়াইফ আর সাথে আপনার মেয়ে মধুরিমা। রিমা হাসে। মায়ের শীতল চোখ, থাম। বিএম কলেজের সোজা মাঠ দিয়ে হাঁটছে ওরা তিন জন গোধূলি বিকেলের মতো মনে হয়। চারদিকে কোলাহল। কে বলবে একটু আগে এখানে গুলি-বোমার শব্দ শোনা গেছে। মা আমি বাদাম খাব। তোকে নিয়ে আর পারছি না মধু। রিকশায় উঠেছে রিমা, সাথে মা। বাবা, এক টাকার বাদাম কেনো তো, না দু টাকার। রিমা দৌড়ে এসে বাদামের ঠোঙ্গা দুটো হাতে নেয়। এটা আপনার, কাজলওয়ালা। চলি। শোন। একটু থামে রিমা। তুমি তো তো সাক্ষাত সুচিত্রা সেন। মধুরিমার হাসি থেমে যায়। পলকহীন চোখে চেয়ে থাকে দুজন। কইরে তোর বাদাম কেনা হলো? সুচিত্রা সেন আর কাজলওয়ালার পরের দেখা সদর রোডের গুল বাগ রেস্টুরেন্টে। সদর গার্লসের ফার্স্ট গার্ল মধুরিমা বুক ভিলা থেকে একটি রবীন্দ্র কবিতাবলি কিনে ওয়েট করছে অনল চৌধুরীর জন্য। আজো গুলির শব্দ। অপেক্ষা আর শেষ হয় না। রিমার চোখে জল চলে আসে। অবশেষে আসে সে। হাতে কতগুলো কদম ফুল। সাথে বিচিত্রার পুজো সংখ্যা। রিমার চোখে জল। কেবিনে বসেই হাতটা ধরে অনল। চোখের জল মুছিয়ে দেয়। বিচিত্রায় একটা গল্প ছাপা হয়েছে আমার। তোমাকে নিবেদন করলাম। আর শোন আমি বুয়েটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পেয়েছি। সত্যি? হ্যাঁ। আমি কখনো মিথ্যা বলি না রিমা। এবার নিজেই বোঝে রিমা, কাজল পরা চোখ নিয়েই আসলে জন্মেছে অনল।
পেজা তুলোর মতো হেমন্তের কাশবন। তার ওপরে সাদা মেঘের সারি। বলেশ্বরের তীর ঘেঁষে ছেয়ে আছে। এপার পিরোজপুর ওপার বাগেরহাট দুটোই সাবডিভিশন। হেমন্তের শুরু তারপরও বলেশ্বর একটু উত্তাল। পড়ন্ত বেলা কাশবনে যাবেই রিমা। মাঝি বলে, চিন্তা করবেন না বজলু ভাই। শালা মাঝিও বজলু ডাকে। বজলু এ আক্ষেপ নিয়ে ছৈ ওয়ালা নৌকায় ওঠে। ইষত্ ঢেউয়ে সাদা শাড়ির ছড়ানো চুলে রিমাকে দেবী দেবী লাগছে। তার মুখে হাসি। তাদের গন্তব্য মহিশপুর। যেটা বাগেরহাটের অংশ। কয়েকটা টংঘরের মতো চায়ের দোকান এবড়ো থেবড়ো রাস্তা, যে রাস্তা পেরিয়ে মানুষ যায় বাগেরহাট। সদ্য বৃষ্টিস্নাত ঘন কচুবন হালকা কাদা পেরিয়ে সে বনে হাঁটে রিমা। তার মুখে ভুবনজয়ী হাসি। কাশবনে হারিয়ে যায় রিমা।
কাশবনের একদম শেষ প্রান্ত। বলেশ্বরের আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ। এলো চুলে রিমা। জোরে ডাকে, অনল।
—এ কি, তুমি কত শুকিয়ে গেছ অনল। অনল হাসে।
কাছে আসো অনল। এসব বিপ্লব টিপ্লব ছাড়ো।
চাইলেই কি ছাড়া যায় যায় মধু। আমার চিঠিগুলো সব পেয়েছ?
—তোমার চিঠিই তো তোমাকে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
—তাই! এবার হাসে অনল। দ্যাখো বলেশ্বরের ওপর লাল সূর্য। শেষবেলার এক খরস্রোতা নদীর ওপর ডুবন্ত সূর্যের আভা। হালকা কাশবনে দুটো মানবমূর্তি মিশে আছে। সবে সন্ধ্যা নেমেছে। কাশবনে যে আঁধার আগেই ছুঁয়েছে। অনলের বুকে রিমা। কোন সময়ে যে অনলের ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের মধ্যে নিয়ে গেছে নিজেই বোঝেনি।
নিজেকে ছাড়িয়ে অনল হাত ধরে রিমার।
—আঁধার নামছে।
—নামুক।
—একটু পরে তোমার খোঁজে পুলিশ বেরোবে।
—বেরোক। আমি তোমাকে আরো কাছে চাই অনল। এবার হাসে অনল।
—ঢাকায় কবে ফিরবে?
—শীঘ্রই।
—তোমার পরীক্ষা কবে?
—সামনের মাসে।
—ফেরার পথে বরিশাল হয়ে এসো। মাকে আমি কিছুটা বলেছি তোমার সম্পর্কে।
—আসবো।
—সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি। এবার বুকের মাঝে রিমাকে টেনে নেয় অনল। রিমা হাসে। আলতো করে চুমো খায়। অস্ফুট স্বরে রিমা বলে ওঠে, অনল।
কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে রিমাপু। আমি তো খুঁজে খুঁজে হয়রান। দুর পাগলা, আমি তো তোকে বলেই গিয়েছিলাম মাস্টার মশাইকে তুমি কিভাবে চেন রিমাপু? আরে বোকা ওই তো কাশবনের শেষ দিকে তুই তো পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলি। আসলে বজলু তুই একটা গাধা। হ ভুইলা গেছি। আমিই তো পরিচয় করাইয়া দিছি। তোমার শরীর কেমন বাজলাল। জানেন স্যার, আপনি শুধু আমাকে আসল নামে ডাকেন। কেউ ডাকে বজলা কেউ ডাকে বজলু। এই দেখেন রিমাপুও। সবাই তোমাকে ভালোবেসে ডাকে। এবার হাসে বজলু সাথে রিমাও। অন্ধকার নামছে মহিষপুর বাজারে। জন-মানব একদম নেই বললেই চলে। প্রবীর মাস্টার, বাজারে আসে মাঝে মধ্যে চা খেতে। তারপর খেয়া পেরিয়ে ওপারে (পিরোজপুরে) রাতে টিউশনি করাতে যায়। প্রবীর বন গাঁয়ে এক পাঠশালায় পড়ায়। এলাকায় ভারী সুনাম তার পড়ানোর জন্য। উত্তম কুমারের মতো কণ্ঠে প্রবীর বলে ওঠে, তো বাজলাল আহমেদ তোমাদের নৌকায় ওপারে একটু যেতে পারব? বজলু তাকায় রিমার দিকে। নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই। বজলু কিছু বলার আগেই বলে ওঠে রিমা। আকাশে সদ্য ওঠা চাঁদ। স্বচ্ছ নদীর জলেও সে চাঁদ দেখা যায়। মাঝি মোহন মিয়ার নৌকায় ওরা তিন জন। রিমার মনে হয় পথটা যেন শেষ না হয়। এই বজলা, নৌকাটা আস্তে আস্তে চালাতে বল। তোমাকে খালামনি পিটাবে রিমাপু। পিটাক। রিমা শক্ত করে অনলের হাত ধরে। রাত একটায় বনগাঁয় নিজের আস্তানায় ফেরে অনল। এটা কাদায় মাখামাখি। পুকুরে গিয়ে পরিষ্কার হতে হতে রাত প্রায় দেড়টা বেজে যায়। পার্টিতে তার নাম প্রবীর দাস। বাগেরহাটের বনগাঁয়ের রজবাড়ী সংলগ্ন এক পাঠশালার হেড টিচার সে। সবই পার্টি ম্যানেজ করেছে। পার্টিকে সে বলেছে সামনের মাসে পরীক্ষার কথা। নির্দেশ পেলেই ঢাকা চলে যাবে অনল। সেদিনের সেই মধুরিমা এখন অনেক ম্যাচিয়ুর। কী রিস্ক নিয়ে সে মহিষপুর চলে এসেছে ভালোবাসার টানে। পরপর তিন দিন সেই কাশবনে এসেছে সে অনলের সাথে দেখা করতে। চিঠিতেই রিমা সব জানিয়েছে অনলকে। অনলও। পিরোজপুরের এক সহবিপ্লবীর বাসায় অনলের চিঠি আসে। অনল প্রতীক্ষায় থাকে চিঠির। যেখানে শুধু পার্টি মা-বাবার চিঠি অ্যালাউ করেছে। অনল তারপরেও ঠিকানাটা দিয়েছে রিমাকে। যে চিঠি অনলকে আলাদা একটা শক্তি জুগিয়েছে। অনল জানে পার্টি তাকে শিখিয়েছে লাল বই ভালোবাসার চেয়ে অনেক বড়ো। যদি পার্টি জেনে যায় রিমা ও তার এখানে আসার কথা। তখন কী হবে? এমনটা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে সে।
ডেপুটি কমিশনার আহসান হাবিবের সম্ভবত এটাই শেষ সফর পিরোজপুরে, এমনটাই জানেন এসডিও। হুলারহাট ঘাটে একটু বেশিই ভিড়। গাজী রকেট বিকেল চারটায় হুলার হাট ঘাটে আসার কথা। পনেরো মিনিট পর রকেটটি ঘাটে ভেড়ে। সেলুন পর্যন্ত যায় এসডিও সাথে এসডিপিও। ডিসি সাহেবের প্রমোশনের কথা আগেই জানতেন এসডিও। স্বল্পভাষী আহসান হাবিব নীরবেই বরিশালের এক অংশ থেকে বিদায় নেয়ার পার্টটি চুকিয়ে ফেললেন। স্যার, আপনার সোনার মতো মেয়ের জন্য। কয়েকটা প্যাকেট সাথে একটা ফুলের বুকে। এসডিও ভাঙা গলায় বললেন, ধন্যবাদ আলম। ফুলগুলো রাখো। প্যাকেটগুলো তোমার ছেলে-মেয়ের জন্য নিয়ে যাও। স্যার! কোনো স্যার নয়। তোমরা নিশ্চয়ই চা খাবে। আহসান হাবিবের ভারী গলা। হৈমন্তীয় এক বিষণ্ন বিকেলে জোরে কয়েকবার ভেঁপু বাজিয়ে গাজী রকেট হুলারহাট ছেড়ে যায়। ফার্স্টক্লাশ সেলুন আজ একদম ডেকের যাত্রীদের জন্য নিষিদ্ধ। কারণ, ডিসি ফ্যামিলিসহ যাচ্ছেন বরিশাল। বিষণ্ন মনে রিমা দেখছে কচা নদীকে। বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছে। উর্দিপরা সেলুনবয় হেসে বলে, ম্যাডাম চা। নো থ্যাংকস বলে রিমা নদী দেখতে শুরু করে। কতটা সাহস করে সে বাগেরহাটের মহিষপুরা গেছে অনলকে দেখতে। তিন বিকেল রিমা কাশবনে কাটিয়েছে। বজলুটা একটু বোকা টাইপের বলে কিছু বুঝতে পারেনি। তারপরও জিজ্ঞেস করেছে, রিমাপু, মাস্টার মশায়কে কি তুমি আগে চিনতে? রিমা হেসে শুধু না বলেছে। অনলের বাবা ভান্ডারিয়ায় এক স্কুলের হেডমাস্টার। তুখোড় স্টুডেন্ট অনলকে বরিশাল বিএম কলেজে পাঠায়, ছেলে বড়ো হয়ে মানুষ হবে বলে। ডিবেট থেকে শুরু করে ছবি আঁঁকা সবকিছুতেই অনল অনেককে ছাপিয়ে যায়। যশোর বোর্ডে সায়েন্স গ্রুপে অনল তৃতীয় হয়ে বুয়েটে ভর্তি হয়। তার জীবনে চলে আসে রিমা আর বিপ্লব। বিপ্লবের জন্য অনল এথন প্রবীর নিয়োগী দাস। বাগের হাটের বনগাঁয়ের এক পাঠশালার মাস্টার বাবু। রিমার জীবনে প্রথম ভালোবাসা—প্রথম ছোঁয়া অনলেরই। সে চিঠি লেখে। কখনো সে রিমাকে বলে হরিণ চোখের মেয়ে। কখনো বা বলে গোলাপি মেয়ে। কখনো সে হয়ে যায় কাজলচোখের মেয়ে। সেখানে থাকে ভালোবাসার কথা বিপ্লবের কথা। চোখে জল আসে রিমার। রেলিং ঘেঁষে দূর অজানাতে তার চোখ। মাথায় একাটা কিছু অনভব করে রিমা। ফিরে তাকায়। বাবা! মা তোমার চোখ দুটো...? কই না তো বাবা। দ্যাখো এই নদীর নাম কচা নদী একসময় বেশ খরস্রোতা ছিল। স্বাধীনতার আগে এখানে ঝড়ে জাহাজডুবির ঘটনাও এখানে ঘটেছে। আর এ রকেট সার্ভিসও চালু করেছে ব্রিটিশ সাহেবরা। বাটলার কুক খানসামা সব নিয়োগ দিত ব্রিটিশরা বেছে বেছে। সেলুন লাগোয়া খোলা বেতের চেয়ারে রিমা তার বাবার সাখে। বাবা তাকে ঢেউ দেখাচ্ছে। জল ছোঁয়া প্রবল বাতাস। চুলগুলো উড়ছে রিমার। চলো মা, তোমার জন্য বিশেষ আয়োজন করেছে রকেট কর্তৃপক্ষ। আমি কিন্তু তোমার প্রিয় ফিস কাটলেটও রাখতে বলেছি। আমার জন্য নয় বাবা। বলো ডিসি সাহেব এবং তার পরিবারের জন্য। এবার হাসে রিমা। বাবা তাকে আরো কাছে টেনে নেয়।
অনলের চিঠির জন্য অপেক্ষা। চিঠি আসে। ভালোবাসার চিঠি। পড়তে পড়তে রাত ভোর হয়ে যায়। যেখানে ভালোবাসার কথা থাকে। থাকে বিপ্লবের কথা। চোখের জল নিয়ে সে লিখতে বসে যায়। ভালো খবর হলো অনল শীঘ্রই তার সেমিস্টার ফাইনালের জন্য ঢাকা চলে যাবে। রিমা তাকে অনুরোধ করেছে। যাওয়ার আগে অবশ্যই যেন সে বরিশালে ডিসিবাংলাতে আসে। উত্তরের অপেক্ষায় থাকে রিমা। রিমার বাবার প্রমোশনের জন্য রিমারাও ঢাকা চলে যাবে। বাবা আর আগের মতো হাসে না, রিমা লক্ষ করে। কাল এক লংগরখানা চালু করতে গিয়েছিল। বাবার বাড়ির অদূরেই বোমা ফাটে। পরে বাবার গাড়ি বহর রক্ষীবাহিনী ঘিরে ফিরতে হয়। বাবা ফিরেছে ভালোয় ভালোয়। মা চায় খুব শীঘ্রই ঢাকা চলে যেতে। বাবা বলেছে আরো কিছুদিন থাকতে হবে। গোলাপি ড্রেসের রিমা। যা তার স্কুলড্রেস। গাড়িতে উঠতে গিয়ে খেয়াল করে, গাড়ির সামনে অস্ত্রধারী পুলিশ। বাবা গেটের কাছে আসে। ভয় পেয়ো না মা। নকশালীদের আক্রমণ বেড়ে গেছে। তাই ওপরের নির্দেশ, আমাকে মানতেই হবে। অবশেষে অনলের চিঠি পায় রিমা। সে আসবে। আসার দিন হলো ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৭৪। রিমা অপেক্ষা করে, আরো সাত দিন বাকি। রিমা প্রহর গোনে। অবশেষে চুয়াত্তরের পয়েলা সেপ্টেম্বর আসে। রিমা হালকা সাজে। খোঁপায় একটা গোলাপও গোঁজে। মাকে বলে অনলের কথা। সে তাকে দুপুরে খাওয়াবে। মা রাজি হয়। বরিশালের দক্ষিণে রাত ভরে গুলির শব্দ শোনা গেছে। একজন এমপিকে গুলি করতে গিয়ে নাকি দুজন চরমপন্থি মারা গেছে। বাবা গেছেন স্পটে, সাথে এসপি আঙ্কেলও। বাবার ফিরতে দেরি হয়। মনটা যেন কেমন করে ওঠে রিমার। গেটের সামনে দুটো গাড়ি থামে। একটা বাবার দ্বিতীয়টি পুলিশের। বাবার গাড়িট ভেতরে ঢোকে। পুলিশের গাড়িটি থেমে চলে যায়। সিঁড়িতে বাবার জুতার শব্দ। এত দেরি কেন? মায়ের কণ্ঠ শুনতে পায় রিমা। আর বলো না, দুজন এনকাউন্টারে মারা গেছে। তার মধ্যে একটা আবার বুয়েটের ছাত্র। আমি দেখেছি লাশটা, মনে হয় ছেলেটির চোখে কেউ কাজল পরিয়েছে। বেশ মায়াবী। পকেটে দুটো চিঠি পাওয়া গেছে, একটা মাকে আর একটা প্রেমিকাকে লেখা। রিমা সব শুনতে পায়। প্রায় দৌড়ে চলে আসে। আবার বলো তো বাবা। কী হয়েছে? তোমাকে শুনতে হবে না মা। খেতে বসো অনেক দেরি হয়েছে।
রিমার গাড়িতে আজ দুজন পুলিশ। কালী বাড়ির মোর ঘুরতেই জ্যামে গাড়িটি আটকে যায়। সদ্য একটা দেয়াল লিখন চোখে পড়ে রিমার। অনল তোমায় লাল সালাম। কমরেড অনল তোমার হত্যার প্রতিশোধ নেবই। গাড়িটা আবার চলতে শুরু করে। লেখাটা আবার দেখতে ইচ্ছে করে রিমার। অনেক জল চোখে। কিভাবে লুকাবে সে? ফোঁপানো কান্না টের পেয়ে এক কনস্টেবল ফিরে তাকায়। তবু সেই কান্নার শব্দ আরো বেড়ে যায়।
