নজরুল সাহিত্যে মানিকগঞ্জের চিত্রকল্প

‘বসিয়া নদী কূলে কে গো উদাসিনী’

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৪, ১৮:৫৪
এপার মানিকগঞ্জ। ওপার ফরিদপুর। মাঝ দিয়ে ঢেউ খেলে বয়ে চলে প্রমত্তা পদ্মা। ভাঙা-গড়ার নেশায় উন্মত্ত এই কীর্তিনাশা-পদ্মা। এই পদ্মার পলিমাটিতে গড়ে উঠেছে মানিকগঞ্জ নামে এক জনপদ। চাঁদের স্নিগ্ধ জ্যোত্স্নালোকে বিভাসিত হয়ে ওঠে পদ্মার মোহনীয় রূপ। আর পদ্মার সর্পিল ঢেউ নীল শাড়ি রূপে চিত্রায়িত হয়ে ভাসে কবি নজরুলের মানসপটে। চাঁদ ও পদ্মা ‘কৃষ্ণ আর রাধা’র প্রেম উপাখ্যান হয়ে উদ্ভাসিত হয় কবির কল্পরাজ্যে। পদ্মার জলে চাঁদের স্নিগ্ধ কিরণের বিম্বিত প্রতিচ্ছবি এক কাব্যময় ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে। কবি নজরুল তাঁর চোখে দেখা সেই রূপ-অপরূপ ছবি মনের মাধুরী মিশিয়ে এঁকেছেন তাঁর ‘বনের পাপিয়া’ নামক ছোট গল্পে : ‘পূর্ণ চাঁদের প্রেম-জ্যোত্স্নার ছোঁয়ায় পদ্মা নদী যেন আবিষ্টা হয়ে দুলছে। তার হূদয়ের আনন্দ দেহের কূলে কূলে আছড়ে পড়ছে। রমলা আবিষ্টার মত পসার ঢেউ দেখছিল। ... দূরে আবছার মত একটা ডিঙি নৌকায় সরল ভাটিয়ালি সুরে তার বাঁশি বেজে উঠল। রমলা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল—‘‘ওগো দেখছ? ঐ চাঁদ যেন কৃষ্ণ, পদ্মা যেন রাধা-ওর ঢেউ যেন নীল শাড়ি, কৃষ্ণকে দেখে ওর সারা দেহে-প্রাণে যেন নাচন লেগেছে।’’ রমলা পদ্মা নদীর ঢেউ আর চাঁদকে রাধা-কৃষ্ণের লীলা মনে করে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে যা মনে আসছিল বলে যাচ্ছিল।’ পদ্মা ছিল কবির কবিতা লেখার উত্স। পদ্মার ঢেউয়ের দোলায় দুলে দুলে কবির হূদয়ে জাগে কবিতার ছন্দমালা। কবি ১৯২৭ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি পদ্মার বুকে স্টিমারে বসে লিখেছেন :‘আসিলে কে গো অতিথি পোড়ায়ে নিশান সোনালী।/ ও চরণ ছুঁই কেমনে দুই হাতে মোর শাখা যে কালি।’ আরও লিখলেন ‘খোশ-আমদেদ’ কবিতাটি। ঢাকায় আসার পথে রচনা করেন পদ্মার বুকে স্টিমারে বসে : ‘বসিয়া নদী কূলে কে গো উদাসিনী।’ কবি প্রেম-বিরহে যখন অস্থিরতায় ভুগছেন, বিষাদঘন ছায়ায় আবর্তিত হূদয়-মন তখন সমস্ত লোকের সংযম ত্যাগ করে পদ্মার ধারে একটি একা কুটিরে চুপ করে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে পোষণ করেন। নীরব-নিস্তব্ধ একাকী বসে প্রিয়ার কথা ভাবতে ভালো লাগে কবির। ১৯২১ সালের এপ্রিলে কবি নজরুল কুমিল্লায় যাবার পথে গোয়ালন্দঘাট থেকে জলপথে স্টিমারে পদ্মার তীরে মানিকগঞ্জের সবুজ-শ্যামল সীমারেখার প্রান্ত ছুঁয়ে-ছুঁয়ে ঢেউয়ের দোলায় দুলতে দুলতে পথ পরিক্রমায় তাঁর চোখে ভাসে পদ্মার বিবর্ণ রূপ। বর্ষায় পদ্মা যেমন যৌবন তরঙ্গে জল-উচ্ছ্বাসে ভেসে চলে। আবার শুষ্ক মৌসুমে ভাটির টানে পদ্মা নিশ্চল, নীরব, নিথর হয়ে পড়ে। পদ্মার বুকে জেগে ওঠে ধু ধু বালুচর। চৈত্রের বিষণ্ন দুপুরের ঝাঁঝালো খাঁ খাঁ রোদ কবির চিত্তে বিষাদঘন কালো ছায়া ফেলে। কবি সেই চিত্র এঁকেছেন তাঁর ‘হারাছেলের চিঠি’তে : ‘রোদে-পোড়া দুপুরটা তৃষ্ণা-কাতর যমকাকের মতো হাঁপাচ্ছে আর খাঁ খাঁ করছে, তখন তরী আমাদের পদ্মার বুকে ভাসলো! দেখলাম পদ্মার শুকনো ধু-ধু করা চরটা নির্জলা একাদশীর উপবাস-ক্লান্ত বিধবা মেয়ের মতো উপুড় হয়ে পড়ে পড়ে ধুঁকছে।’ উন্মত্তা পদ্মার বুকে থুবড়ে পড়া মুখ, যৌবনহীনা রূপ দেখে কবির মনে-প্রাণে বিষাদঘন ছায়া ফেলে। কবি গোধূলি বেলাকার অস্তাচলের পদ্মার বিবর্ণ ধূসর ধূপছায়া চিত্র বর্ণনা করেন : ‘পদ্মার বুকেই ধোঁয়ার মতন ঝাপসা হয়ে মলিনা সন্ধ্যা নেমে এলো! সন্ধ্যা এলো, ধূলি-ধূসরিত সদ্য-বিধবার মতন ধূমল কেশ এলিয়ে, দিগবালাদের মেঘলা অঞ্চলে সিঁথির সিঁদুরটুকুর শেষ রক্তরাগ মুছে! ধানের চারায় আর আমার চোখে অশ্রু-শীকর ঘনিয়ে এলো!’ মানিকগঞ্জ আর ফরিদপুর নামে দুটি জনপদকে বিভাজন করেছে কীর্তিনাশা পদ্মা। কবি নজরুল ছিলেন প্রেম-বিরহের কবি। এই দুটি জনপদের বিভাজনের বিরহ-বেদনার সুর তাঁর কবিমনে রেখাপাত করে। কবি লিখেছেন সেই বিরহগাথা : ‘এপারে ওপারে দুটি সাথী হারা কপোত-কপোতী কূজন কান্নায় তখন যেন সারা দুপুরটার বুক দুপুরের মাতম জুড়ে দিয়েছিল। কি এক আকুল শূন্যতার ব্যথায় বুকটা আমার যেন হো হো করে আর্তনাদ করে উঠলো।’ কবি নজরুল তাঁর ‘হারাছেলের চিঠি’-তে মানিকগঞ্জের পটভূমিতে এঁকেছেন মমতামাখা করুণগাথায় এক বিষাদময় চিত্রকল্প : ‘মা! সেদিন নিজে নিজে কেঁদে তোমাদের কাঁদিয়ে বিদায় নিয়ে আসি, সেদিন আসন্ন বিকালে এই গোয়ালন্দের ঘাটে পদ্মার বুকে স্টিমারে রেলিং ধরে ঐ ওপারে-মানিকগঞ্জের সবুজ সীমারেখার দিকে তাকিয়ে, আমার বুক চোখের জলে ভেসে গিয়েছিল। তুমি যে বলেছিলে যে, ঐখানে-ঐ অপর পারের সুনীল রেখায় আমাদেরও ঘর ছিল। সে ঘর হয়তো আজো আছে, কিন্তু সে আজ পোড়োবাড়ি, আরো মনে পড়লো, ঐ গাঁয়েরই চিতার বুকে হয়তো এই কীর্তিনাশারই অপর কূলে আমার হারা-বোন বেলীর স্মৃতি ছাই হয়ে পড়ে আছে। ওরে কোথা যে সর্বগ্রাসী শ্মশান-মশান? কোথায় সে শতস্মৃতি বিজড়িত পোড়ো ঘরখানি?’ তিনি অশ্রুঝরা বেদনায় আরও লিখেছেন : ‘আমায় সবচেয়ে বেশি করে কাঁদাতে লাগলো আমার ঐ দুটি হারা-বোন লিলি আর বেলীর পোড়ো স্মৃতি! সবচেয়ে বেশি দুঃখ রয়ে গেল আমার, আমি তাদের দেখতে পাইনে!...’ কবি জলপথে পথ চলতে চলতে সারি সারি সুনিবিড় গাছের ফাঁকে ফাঁকে আঁতিউতি খুঁজে ফিরেন মা-মাসিমার নাড়িপোঁতা বসত ঘর-বাড়ি : ‘আমি ছায়া-সুনিবিড় এপার ওপার গাছের সারির পানে সজল চোখে চেয়ে চেয়ে চিনবার চেষ্টা করতে লাগলাম, কোথায় আমার সেই মা-মাসিনার পরশ-পূত হারা-গৃহগুলি?’ গাঁয়ের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ধরে ময়নামতি শাড়ি পরে জলকে চলে পল্লীবধূ। গ্রাম বাংলার লোকায়ত এ ছবি শাশ্বত চিরন্তন। প্রেমময় দরদী কবি নজরুল মানিকগঞ্জের বুক চিরে বয়ে যাওয়া পদ্মার বুকে জলরথে পথ চলতে চলতে এক বালিকাবধূর মরম ব্যথার চিত্র এঁকেছেন : ‘‘তারপর যেতে যেতে দেখলাম পথের দুধারি ঘাসে আর কাশের সার ছোট্ট অভিমানী মেয়ের মতো শীষ দুলিয়ে দুলিয়ে বলছে—‘না, না না!’ ধানের কচি চারাগুলি তাদের অধরপুটে সবুজ হাসি ফুটিয়ে মাথা হেলিয়ে আঙুল তুলে শাসাচ্ছে— ‘না, না, না!’ দূরে দিগন্ত ছোঁওয়া গ্রামে সীমায় লাজ-নত বাঁশের বধূ মাটির পানে চেয়ে চেয়ে শ্বাস ফেলছে আর কেঁপে কেঁপে জানাচ্ছে, ‘না, না, না!’ বাঁধাঘাটে কাঁখের কলসী জলে ভাসিয়ে দিয়ে কিশোরী পল্লীবধূ আমার রথের পানে চেয়ে সজল চোখের করুণ চাওয়ার ভাষা প্রশ্ন করছিল, ‘কোথা যাও, ওগো বিদেশী পথিক?’ সে বালিকাবধূ ভাবছিল, হয়তো তার বাপের বাড়ির কাছেই আমার বাড়ি! হয়তো তাদের ঘরের সামনে দিয়ে আমার চলার পথ! আহা, ওর যে তাহলে কত কথাই জানাবার আছে তার বাপ-মাকে, তার ছোট ছোট ভাইবোনগুলিকে! ঐ ছোট্টো মেয়েটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে এ গৃহহারার চোখ দুটি জলে ভরে উঠল! আহা, মার কোল-ছেঁড়া গৃহ-হারা দিদি আমার! তোর চোখে আজ সারা বাংলার ঘর-হারা বালিকাবধূর ব্যথা ঘনিয়ে উঠেছে যে ভাই! ঘরের মায়া এমনই বেদনা-বিজড়িত মধুর! দেখলাম, ময়নামতি শাড়ির খুঁটে চোখ মুছে ভরা কলসী কাঁখে সে ধানক্ষেত পারিয়ে শুপারি গাছের সারির মাঝে মিলিয়ে গেল।’’ পদ্মা-যমুনার পলল ভূমিতে জেগে ওঠা এক চরাভূমি মানিকগঞ্জ নামের জনপদ। ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যে মানিকগঞ্জ বিচিত্র রূপ-লাবণ্য বর্ণে ভরে ওঠে। বর্ষায় মানিকগঞ্জের ছোট ছোট বাড়ি-ঘরগুলো পানির ওপর থৈ থৈ করে ভাসতে থাকে। আর কচি আমন ধানের চারাগুলো সাঁতার কেটে পাল্লা ধরে বেড়ে ওঠে। আমন ধানের ফাঁকে ফাঁকে ডাকে ডাহুক-ডাহুকি। সে এক অপূর্ব মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য। মানিকগঞ্জবাসীকে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যেতে হয় ছোট্ট ডিঙি নাও কিংবা কলার ভেলায় চড়ে তালতা বাঁশের লগি ঠেলে ঠেলে। কবি এই মানিকগঞ্জের পল্লী গাঁয়ের দৃশ্য দেখে আপ্লুত হয়ে বর্ণনা করেন : ‘‘আরো দেখলাম, কলার ভেলায় চড়ে উদাসীন পথিক গাঙ পার হচ্ছে, আর গাঙের দুপাশের ধানের চারায় ধানী হরফে লেখা তার কোন যেন হারানোজনের পত্র-লেখা আনমনে পড়তে পড়তে যাচ্ছে। আমার মনে গাঁয়ের চিরদিনের পসারিণী তখনো ‘কে নিবি গো কিনে আমায়, কে নিবি গো কিনে’ হেঁকে হেঁকে দখিন হাওয়াকে ব্যথা দিচ্ছিল।’’ পদ্মা-যমুনার মিলন মোহনার মানিকগঞ্জের পলল ভূমিকে করেছে উর্বর। আর সবুজ-ঘন-ছায়াবীথি সৌন্দর্যে রূপময় করে তুলেছে। মানিকগঞ্জের প্রাকৃতিক রূপ-অপরূপ আনন্দলোকে ভরিয়ে দিয়েছে প্রেমিক কবি নজরুলের মনোভূমিকে। পদ্মা-যমুনার প্রচ্ছায়া প্রতিফলিত হয়েছে কবির মানসলোকে। কবির লেখা ছড়া-গানে, গল্প-কবিতায় চিত্রায়িত হয়েছে পদ্মা-যমুনার চিত্রপট। কবির লেখা একটি ছড়ায় ফুটে ওঠেছে পদ্মার চিত্ররূপ : ‘চুল মেলবা সোনার খাডে/ নাইবা-ধুইবা পদ্মার ঘাডে।’ কবি পদ্মার পাড়ে খুঁজে ফেরেন তাঁর ভালোবাসার নায়িকা মধুমালাকে— ‘(ওরে ও) পদ্মা নদী বলতে পারিস কোথায় মধুমালা?/ সাগর-ঘেরা সোনার পুরী কাঁদে রাজ-বালা/ কোথায় মধুবালা\’ আরও লিখেছেন : ‘প্রাণহীন দেহ আকাশে ফেলিয়া ধরণীতে আসি ফিরে,/ তোমারে খুঁজিয়া বেড়াই গোমতী-পদ্মা-যমুনা তীরে।’ কবি নজরুল প্রিয়তমা মানসীকে বার বার খুঁজে ফিরেছেন এই পদ্মা-যমুনার পাড়ে মানিকগঞ্জের ‘তেওতার তরুছায়ায় দোলে দোলনচাঁপা’ পদ্মা-যমুনার কূলে।