রবীন্দ্রনাথ তাই মৃত্যুহীন, তিনি শুধু জৈবিক দেহ থেকে বিমুক্ত হয়ে মানস দেহপ্রাপ্ত হয়েছেন
জীবনের একটি রবীন্দ্রসম্মত সংজ্ঞা আছে, সেই সংজ্ঞায় রবীন্দ্রনাথ অনন্তজীবনা, অর্মত্য ও মৃত্যুহীন। জীবন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের এই সংজ্ঞা যেদিন সর্বজনীন হয়ে উঠবে, সেদিন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এখন অবশ্য সেই বিলুপ্তি ঘটেনি, কিন্তু দৃশ্যত রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিন যেন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলার যেকোনো সংস্কৃতিসন্তানের চোখে রবীন্দ্রনাথের কোনো মৃত্যুদিন চোখে পড়বে না। আমরা যারা একখানি দেহের মধ্যে বেঁচে থেকে নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আমি বেঁচে আছি, তাদের মতো এখন অবশ্য কোনো রবীন্দ্র-দেহ নেই। কিন্তু বাঙালির যেকোনো দেহধারী জীবিতের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ বহুগুণ বেশি জীবিত। রবীন্দ্র রচনাবলির প্রতিটি শব্দ, রবীন্দ্র চিত্রাবলির প্রতিটি আঁচড় আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতিটি তান মিশ্রিত হয়ে এক নতুন রবীন্দ্রদেহ তৈরি হয়েছে। এই অমর্ত্য দেহের উচ্চতা এখন পৃথিবী থেকে ঊর্ধ্বলোকে আকাশগঙ্গাকে স্পর্শ করেছে; যেন জ্যোতির্ময় যীশুর মতো দীর্ঘ উত্তরীয় গায়ে স্নিগ্ধ চোখে আমাদের দিকে তিনি চেয়ে আছেন। সে দেহ এমন একটি দীর্ঘ ছায়া সৃষ্টি করেছে, যার পাদদেশে আমরা নিশ্চিন্তে সুখের জন্য বসে থাকতে পারি। রবীন্দ্রনাথ তাই মৃত্যুহীন, তিনি শুধু জৈবিক দেহ থেকে বিমুক্ত হয়ে মানস দেহপ্রাপ্ত হয়েছেন। রবীন্দ্র আলোচনায় তাই এমন কোনো শেষ অধ্যায় নেই, যেখানে রবীন্দ্রনাথ মারা যাবেন। আমরা সবসময় তাঁর জীবন নিয়েই আলোচনা করতে থাকব।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নানা কল্পনার ক্রীড়ার আয়োজন করা যায়। যেমন, যদি কল্পনা করি রবীন্দ্রনাথ জন্ম নিয়েছেন বৈদিক পৃথিবীতে, তাহলে কেমন দেখাবে এই প্রাচীন শিল্পদেবতাকে? বস্তুত বৈদিক রবীন্দ্রনাথ তখন নিজেই পরিণত হবেন একখণ্ড সামবেদে। সভ্যতায় সৃষ্টি হবে আরেকখানি ঈশ্বরগ্রন্থ। অথবা জন্ম হবে একখানি রবীন্দ্রপোনিষদের; যে উপনিষদে ঈশ্বরের প্রধান পরিচয় হবে শিল্পী। আধুনিক শিল্পকলার পৃথিবীর একমাত্র ঈশ্বরকণা রবীন্দ্রনাথ, প্রাচীন পৃথিবীতে জন্ম নিলে যিনি প্রত্যাদিষ্ট দেবদূতের মর্যাদা পেতেন। হয়তো তাঁর নামে পরিচিতি পেত একখানি আরণ্যক। অথবা আরণ্যক থেকে আরো কয়েক শতাব্দী পরে পুরাণের পৃথিবীতে জন্মালে তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি হতো খণ্ড খণ্ড রবীন্দ্রপুরাণ। পুরাণ হলো প্রতীকের প্রেক্ষাগৃহ, অজস্র প্রতীক চরিত্র দিয়ে যেখানে জীবনের সত্য ও সুন্দর প্রদর্শিত হয়। সেইসব পুরাণে পঁচিশে বৈশাখ পরিণত হতো বিশুষ্ক পৃথিবীর প্রতীকে; বাইশে শ্রাবণে যে তাঁর দেহাবসান—তা পরিণত হতো অনন্ত স্নিগ্ধতা আর অশ্রুর প্রতীকে।
রবীন্দ্রনাথ ক্রমান্বয়ে অপরিমাপযোগ্য হয়ে উঠছেন। বস্তুত তিনি নিজেই পরিণত হয়েছেন একটি শিল্প মাপন কাঠিতে। তাঁকে মাপন ফিতা ভেবে আমরা অন্য সকলকে একদফা পরিমাপ করতে পারি। আনন্দ আর জীবন পরিমাপের এক নবপত্রিকা তিনি। মর্ত্য মানবের মুগ্ধতার যে সর্বোচ্চ সীমা ছিল, রবীন্দ্রনাথ তা নতুন করে নির্ধারণ করে দিয়ে গেছেন। বিশেষত তাঁর গান যেন অন্য কোনো অর্মত্যলোকের অনাহত সওগাত, পৃথিবীর মানুষের জন্য তা উপহার দিতে গিয়ে তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন বীণাপাণি। জীবন-যাপন, চিন্তাবিশ্ব আর হূদয়বিশ্ব পূর্ণ করার জন্য তিনি এমন বাণী ও সুর দিয়ে গেছেন, বিশ শতকের পৃথিবী থেকে আগামী কত শতাব্দী পর্যন্ত তা দীপ্তি পাবে, আমরা কোনোভাবেই তা অনুমান করতে পারছি না। হয়তো রবীন্দ্রনাথের সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল নিয়ে অনুমানের এই সময়টা আমরা বারবার পিছিয়ে নিতে থাকব।
রবীন্দ্রনাথ মানব মননের এক আধুনিক প্রান্ত, উজ্জ্বল একটি বিন্দুর মতো যার সূচনা হয়েছিল উপনিষদের পৃথিবীতে। বৈদিক ঋষিদের মধ্যে কেউ বাঙালি ছিলেন না; বস্তুত বাংলা ভাষার জন্ম হতে তখনও অন্তত তিনটি সহস্রাব্দ বাকি। বাংলার এই মাটি থেকে তখন কোনো ঋক ও সাম সৃষ্টি হয়নি। আমরা ভেবে নিতে পারি, বাংলার মাটির প্রথম বৈদিক সৌরভ হলো রবীন্দ্রনাথ; ভারতীয় সভ্যতার তিনি নববেদ; রবীন্দ্রসঙ্গীত হলো বাঙালি ঋষির উচ্চারিত প্রথম বেদস্তোত্র; বেদের রবীন্দ্রকাণ্ড তিনি। তিনি যেন স্রষ্টার দীপরক্ষী; সুর ও সৌন্দর্যের এখন পর্যন্ত শেষ প্রান্ত। তাঁকে দেখে প্রাচীন পৃথিবীর মানুষের কাছে দেওয়া ঈশ্বরের সেই প্রতিশ্রুতির কথায় আমাদের আবার আস্থা ফিরে আসে, ‘সম্ভবামি যুগে যুগে’!
বাঙালি সংস্কৃতির অনেক কিছুই অনন্য ও সুন্দর; বিশ্ব সংস্কৃতিরও রয়েছে অশেষ সৌন্দর্য ও বৈভব। বস্তুত সংস্কৃতি হলো যূথবদ্ধ সৃষ্টি, এই সৃষ্টির খেলায় একক কোনো খেলোয়াড় গুরুত্বপূর্ণ নন, অপরিহার্যও নন। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির জন্য আজ রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য, ভারতীয় সভ্যতার জন্যও। রবীন্দ্রনাথ যেন পরিণত হয়েছেন বাঙালির সাংস্কৃতিক আচার্যে; তাঁকে বাদ দিলে বাঙালিরা হতদরিদ্র হয়ে পড়ে। সারা পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথের মাপের সংস্কৃতিপুরুষ রয়েছে মাত্র একজন, তিনি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই। দুঃখে বিষাদে আর জীবন যাপনের অবিশ্বাস্য শোকার্ত মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির কাছে আদিপিতার মতো বরাভয় দানকারী হয়ে উঠেছেন; আনন্দে-হরষেও রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রধান অতিথি।
যে শ্রেণির বাঙালিরা শিল্প সাহিত্য মননশীলতা চর্চায় অভ্যস্ত, আটপৌরে ধর্মাধর্ম আর ছেলেঘুমানো পাড়াজুড়ানো ঈশ্বরগল্প যাদের কাছে কোনো গুরুত্ব সৃষ্টি করে না, সেই শ্রেণির মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন একটি অবলম্বনের মতো। রবীন্দ্র রচনাবলি এখন যেন নানা বিচিত্র খণ্ডে বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে। সেখানে কবিতার রবীন্দ্রনাথ, গল্পের রবীন্দ্রনাথ, গানের রবীন্দ্রনাথ, নাটকের রবীন্দ্রনাথ, প্রবন্ধের রবীন্দ্রনাথ আর চিত্রকলার রবীন্দ্রনাথের মতো প্রথাগত রবীন্দ্র ছকগুলো ভেঙে গিয়ে তার ভিতর থেকে অলৌকিক আলোর মতো ধীরে ধীরে জেগে উঠছে দ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ, গুরু রবীন্দ্রনাথ, দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ, সন্ত রবীন্দ্রনাথ; সর্বোপরি বিশ্ববোধ আর মানবিক ধর্মবোধের এক প্রজ্ঞানপুরুষ।
গত এক শতকেরও বেশি সময় ধরে রবীন্দ্রনাথ বাঙালি সংস্কৃতির প্রসঙ্গপুরুষ। প্রতিভার বিরাটত্ব আর সঞ্জীবনীশক্তির বিচারে তিনি মহর্ষি বেদব্যাস কিংবা বাল্মিকীর মতো। হয়তো রবীন্দ্রনাথের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সৌন্দর্য বুঝতে গেলে আমাদের জন্ম নিতে হবে আরও কয়েক শতাব্দী পরের পৃথিবীতে; যখন চারপাশের বাংলাদেশ এশিয়া কিংবা পৃথিবীটা হয়ে যাবে অকল্পনীয় যান্ত্রিক। পৃথিবীপৃষ্ঠের বৃক্ষ নদী ঝরনা আর কোমল সব প্রাণীরা যেদিন ইস্পাত পলিমার আর প্রকৌশলীদের দিকে ম্লান চোখে তাকিয়ে থাকবে; যেদিন মানুষের চারপাশটা পূর্ণ হয়ে যাবে যন্ত্রবৃক্ষ যন্ত্রনদী আর যন্ত্রপ্রাণিতে, সেদিনও হয়তো রবীন্দ্রনাথ নামক এক অনন্য উপগ্রহ সেই বিপন্ন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে যাবে।
সংস্কৃতির জগতে অবতারত্বের ধারণা অবান্তর, অবান্তর গুরুবাদও। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে ঠিকঠাক মতো উপস্থাপন করলে তাঁকে কোনো মহাঅবতার বলে মনে হয়, মনে হয় বিশ্বগুরু। কারণ, তাঁর লেখা এখন শুধু নেহায়েতই কবিতা বা গানই নয়, সেগুলো পেতে শুরু করেছে বাণীর মর্যাদা; মানুষ সেখানে জীবনকে দেখার একটি দর্পণ খুঁজে পেয়েছে। পৃথিবীর অবতারমণ্ডলী জন্মাবার পর লোকে খোঁজাখুঁজি করে তাঁর আগমনের একখানি পুরোনো ঘোষণাপত্র পেয়ে যায়। সেই ঘোষণাপত্রে লেখা থাকে : অমুক যুগে অমুক দেশে অমুক সময়ে অমুকের কোলে তিনি জন্মাবেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের আগমন নিয়ে কোনো ভবিষ্যত্দ্রষ্টা কোনো ভবিষ্যপুরাণ রচনা করতে পারেননি। বস্তুত তার কোনো প্রয়োজনও পড়েনি। তিনি যে অনন্য তা প্রমাণের জন্য কোনো প্রাচীন বা গুপ্ত প্রত্যয়নপত্র লাগে না।
রবীন্দ্রনাথ মূলত আকস্মিক, তিনি আসবেন বলে আকাশে বাতাসে কোনো বিশেষ ঘ্রাণ প্রবাহিত হয়নি; ঊর্ধ্বলোক থেকে কোনো দেবদূতেরা ফুল ছিটানোর আয়োজনও করে রাখেনি। আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র যেখানে যেখানে গেলে একজন প্রজ্ঞানপুরুষের আসার সময় হয়, সেখানে তারা যায়নি। সাহিত্যের প্রবৃদ্ধি রেখা চড়তে চড়তে যেখানে উঠলে একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পীর আসার মতো ক্ষেত্র তৈরি হয় বলে সাহিত্যের জ্যোতিষীরা হিসাব কষেন, সেখানেও বাংলা সাহিত্য উঠে পড়েনি। কেউ বুঝতে পারেনি যে মহাজাগতিক এক মহত্তম উপহার বাঙালির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। আকস্মিকভাবে গোটা দশেক প্রতিভাবানের দায়িত্ব একা নিয়ে পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতো উচ্চতা ও আয়তনের আর কোনো বাঙালি নেই, তিনি এখনও সমস্ত বাঙালির দীর্ঘ লাইনের একেবারে সামনের মানুষটি। এজন্য তিনি একদিন মারা গিয়েছিলেন, এই সংবাদটি আমাদের সকলের জানা থাকলেও তাতে আমরা বিশ্বাস করি না।
