৫ আগস্ট ছিল কবি মহাদেব সাহার ৭১তম জন্মদিন।
কবিতা আবেগ আর অনুভূতির মিলিত শিল্পরূপ। কবি তাঁর চেনা জগত্ সংসারের শৈল্পিক বিষয়কে পঙিক্তমালায় ধারণ করে পাঠকের সাথে এক সেতু-সম্পর্ক রচনা করেন। ব্যক্তিগত বিষয় প্রেম-বিরহ, সমাজ, রাজনীতি, প্রতিবাদ, স্মৃতি বেদনা, হাহাকার কিংবা মিলন-বার্তা কবিতার অনুষঙ্গ। ভাষা কবির সহযাত্রী।
মহাদেব সাহা বাংলা সাহিত্যের একজন অগ্রসর কবি। তাঁর কবিতার স্নিগ্ধ গতিধারা লাবণ্যময়। শব্দ বক্তব্য বিষয় উপকরণ প্রবহমান। সুললিত সরল তীক্ষ কবিতা অন্তর্যাত্রার নির্যাস হিসেবে বিবেচ্য। প্রেম-প্রকৃতি, দয়িতা, জগত্ সংসার মহাদেবের কবিতায় স্বতন্ত্র ও উজ্জ্বলভাবে উপস্থাপিত। নারী, নিসর্গ, স্বদেশ, ফুল-পাখি আর আনন্দ-বেদনার উষ্ণ প্রস্রবন তাঁর কবিতাকে শক্তিময় করে তুলেছে। মহাদেব সাহার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই গৃহ, এই সন্ন্যাস’ থেকে শুরু করে ক্রমাগত অগ্রসর হয়ে ‘মানব এসেছি কাছে’, ‘চাই বিষ অমরতা’, ‘কী সুন্দর অন্ধ’, ‘তোমার পায়ের শব্দ’ কাব্যগ্রন্থে জীবনের বিপুলতা, প্রেমিক সত্তা ও দ্রোহের সংমিশ্রণ সার্থকভাবে ঘটেছে। ব্যক্তি-আকাঙ্ক্ষা, বোধ ও মননের অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ মহাদেবের কবিতাকে সৌন্দর্যময় করে তুলেছে। একজন উন্মুল, উদ্বাস্তু মানুষ জীবনাভিজ্ঞাতায় পুষ্ট হয়ে কবিতায় খুঁজে পায় অপার আনন্দ, বেদনা। উত্তম পুরুষে উচ্চারিত তাঁর প্রেমের ভাষা আলাদা দ্যোতক হয়ে সূর্যালোকের বিভায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। গৃহের মধ্যে সন্ন্যাস সত্তার বসবাস আবিষ্কার করেন যে কবি, পরবর্তীকালে রাজনীতির মাঠে ময়দানে তাঁর কণ্ঠ উচ্চকিত হয়।
জন্ম গ্রাম, স্মৃতি আর স্বপ্নে গ্রোথিত মহাদেব তাঁর কবিতার জীবনকে শেকড়লগ্ন করে দ্রুত অগ্রসর হয়েছেন সামনে। মা, মাতৃভূমি, ভাই-বোনের বোধ নাগরিক যাপিত জীবন দ্রুত পল্টে দেয়। একজন কবি মানুষের বদলে যাওয়া, ভেতর-বাহিরের মনঃস্তাপ কবিতায় নিখুঁত কুশলতায় তুলে ধরেন। কবিতার বিষয়, বক্তব্যকে আর্দ্র করে তোলে। মহাদেবের কবিতার আর্তির সাথে মিশে যায় অদ্ভুত এক জীবনচলার মাদকতা। এই মাদকতার সাথে একান্ত হয়ে পাঠক চিনে নেয় তার প্রিয় জন্মভূমি, মানুষের অন্তর্গত বোধ ও আত্মোপলব্ধি। মোবাইল, ফেসবুক, ইন্টারনেটের যুগে হাতে লেখা শব্দমালা কারো হূদয়ে আলোড়ন তোলে কি না—এ প্রশ্ন যখন আসে তখন মহাদেব অবিচল আস্থাশীল চিঠির কাছে। বহুশ্রুত, নন্দিত পঙিক্তমালা—‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও/ আঙ্গুলের মিহিন সেলাই/ ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও/ এটুকু সামান্য দাবী চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো/ অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।/ চুলের মতো কোন চিহ্ন দিও বিষ্ময় বোঝাতে যদি চাও/ সমুদ্র বোঝাতে চাও, মেঘ চাও, ফুল পাখি সবুজ পাহাড়/ বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখের মতো চিহ্ন কিছু দিও/ আজো তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি/ আসবেন অচেনা রাজার লোক/ তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে।...’ (চিঠি দিও)
আধুনিক মানুষের সাথি নিঃসঙ্গতা, প্রেম-কাতরতা ও ব্যাক্তিগত অনুভূতির আলোড়ন। আত্মমুগ্ধতা, বেদনাবোধ কবিকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত করে। আত্মজৈবনিক রচনায় কবি স্বপ্নতাড়িত সংবেদনশীল সত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন। মারী, মড়ক, যুদ্ধ, রাজনীতি, মানুষের হিংস্রতা, বন্ধুত্ব, হিংসার ছুরি তাঁর দিকে লকলকে জিভ বের করে উদ্যত সঙ্গীন হয়ে ওঠে বার বার।
কবি আশা ও স্বপ্নলগ্ন। তাঁর জীবনভাষ্য অপার সম্ভাবনাময়। সংগ্রাম আর পথ অতিক্রমণের মাধ্যম মহাদেব গীতল প্রেমের কবিতার পরিভ্রমণে নিমগ্ন থেকেছেন। গ্রাম, শস্যখামার, প্রকৃতি, ঋতুচক্র, মানবিকতা আর মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম তাঁর কবিতাবদ্ধ। মহাদেবের কবিতা নতুন করে বাঁচতে শেখায়, জীবন আর মানুষ যূথবদ্ধ হয়ে রহস্যময় এক অন্তর্লোক নির্মাণ করে, সেখানে কবির অনুভূতিতে একাত্ন হয় :‘আমার কথা তোমরা সামান্যই জানো, আমি এই হাতে/ গোলাপ বাগানে কতো লুটতরাজ করেছি/ কতো ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে ভাসিয়ে দিয়েছি বুড়িগঙ্গায়/ কতো গন্ধ মাখা রুমাল দলামচা করে/ ফেলে দিয়েছি জঞ্জালে/ কুটি কুটি করে ছিঁড়েছি চোখের জলের চিঠি...’ (তোমরা তার কিছুই জানোনা)।
মহাদেব বাঙালির গৌরবগাথা এবং বীর যোদ্ধাদের স্মরণ করেছেন। তিনি রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী। প্রেমিক কবি ঘাতকের নৃশংসতা দেখে আঁতকে ওঠেন। স্বাধীনতা বিরোধীদের অপতত্পরতায় ক্রুদ্ধ হতে হয় কবিকে। কবি সত্য, সংগ্রামের সারথী। মুক্তিযুদ্ধ, পঁচাত্তরের ট্রাজিক ঘটনা আর নব্বই-এর স্বৈরশাসনের নির্যাতন তাঁর কবিতায় স্থান পেয়েছে। শান্তি, সুন্দর ও প্রেমের পূজারী কবি ব্যথিত হয়ে দ্রোহে ক্রোধে জ্বলে উঠেছেন। আর দশজন মানুষের মতো
কবি ব্যথিত ও স্তব্ধ। মহাদেব বাঙালি সংস্কৃতি, জীবনাচরণ ও মানবিক বোধকে কবিতাবদ্ধ করেছেন।
বাঙালির জাগৃতি, দ্রোহ ও অর্জনের সাথে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম প্রেরণার উত্স হয়ে মিশে আছে। পঁচাত্তরের ট্রাজিক পরিণতি মহাদেব দুঃখ, ক্রোধ, বেদনায় বহন করেছেন। তাঁর অসংখ্য কবিতায় মুজিব আছে স্মরণে কৃতজ্ঞতায় উজ্জ্বল ও মহমান্বিত হয়ে। ‘আমার টেবিলের সামনে দেয়ালে শেখ মুজিবের/ একটি ছবি টাঙানো আছে/ কোনো তেলরঙ কিংবা বিখ্যাত স্কেচ জাতীয় কিছু নয়/ এই সাধারণ ছবিখানা ১৭ই মার্চ এ-বছর শেখ মুজিবের/ জন্মদিনে একজন মুজিবপ্রেমিক আমাকে উপহার দিয়েছিলো/ কিন্তু কে জানতো এই ছবিখানি হঠাত্ দেয়াল ব্যেপে/ একগুচ্ছ পত্রপুষ্পের মতো আমাদের ঘরময়/ প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে সেদিন রাত্রিবেলা!...’ (আমি কি বলতে পেরেছিলাম)
গ্রাম থেকে শহরে আসা ছেলের জন্যে মার ব্যকুলতা আর ছেলের স্মৃতি, কর্মব্যস্ততা নাগরিক জীবনের ক্লান্তি, হতাশা মহাদেব কবিতার ক্যানভাসে ধারণ করেন। বর্ষপরিক্রমায় বোশেখ আসে। শেকড় বিচ্ছিন্ন মানুষের আর্তি, বেদনাবোধ ক্ষরণ কবি পর্যবেক্ষণ করেন। কবির মা পৃথিবীর সব মানুষের মা হয়ে যায়। ইট, কাঠ, কংক্রিটের জীবনে স্বপ্ন বন্দি হয়ে যায়। : ‘মা আমাকে বলেছিলো— যেখানেই থাকিস তুই বাড়ি আসবি পয়লা বোশেখে/ পয়লা বোশেখ বড়ো ভালো দিন এ দিন ঘরের ছেলে বাইরে থাকতে নেই কভু, বছরের এই/ একটি দিনে আমি সিদ্ধিদাতা গণেশের পায়ে দিই ফুলজল,... (বৈশাখে নিজস্ব সংবাদ)।
মহাদেব সাহার কবিতায় প্রেম এক অনিবার্য বিষয়। সান্নিধ্য, আকাঙ্ক্ষা, ব্যাকুলতা, প্রণয়গাথা, বিরহ কাতরতার মাঝে এক অবিনাশী দ্যোতক প্রেম। জড়িয়ে থাকে, আলিঙ্গন করে-দায়বদ্ধতার জন্ম দেয় যে শাশ্বত প্রেম তাকে অস্বীকার করা যায় না। আদম হাওয়া, রোমিও জুলিয়েটসহ ইতিহাসের উপখ্যান প্রেমবন্দনায় মুখর—মহাদেব সেখানে স্থিত। পৃথিবীতে যুদ্ধ, হিংসা, দলাদলি, পরিশ্রমকাতরতার পদধ্বনি—সেখানে একজন কবি স্বাভবিকভাবে হূদয়ের মতো শক্তিশালী বাহন সঙ্গী করে কবিতা রচনায় অগ্রবর্তী থাকেন এটাই স্বাভাবিক : ‘বহুবেদনায় বহুব্যবধানে তোমাকে আজো অসময়ে খুঁজি।/ তুমি ছাড়া কোন স্মরণযোগ্য নারী নেই।...’
মহাদেব সাহা আনন্দ-বিষাদ, দুঃখ-কষ্ট, বেঁচে থাকার অভিযাত্রা কবিতায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। নগরসভ্যতা, চলমান জীবনের ক্লান্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে তাঁর কাছে মানুষ, তার বোধ ও প্রেম মুখ্য থেকেছে। মহাদেব সাহার কবিতা জীবন বিমুখ নয়, তাঁর কবিতায় অন্তহীন জীববৈচিত্র্য, মানবিক গুণাবলি এবং যাপিত জীবনকে বার বার খুঁজে পাওয়া যায়। মহাদেবের কবিতা হূদয়স্পর্শী। আমরা যে জীবন যাপন করছি তার পরতে পরতে দুঃখ-কষ্ট, বিয়োগ, বেদনা, হাহাকার, মূর্ত হয়ে ওঠে। মহাদেবের কবিতা দুঃখ-কষ্টের সংসারে প্রেমস্পর্শ বুলিয়ে দেয়।
সমকালের প্রধানতম কবি মহাদেব সাহা জীবন, সংসার আর সমকালকে করতলে ধারণ করে, ইতিবাচকতায় প্রতিমুহূর্ত যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার প্রণোদনা জুগিয়ে কাব্যভুবন সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্বের গ্লানি মুছিয়ে দেয় কবিতা। তাঁর কবিতায় অনুরণিত : মরবার আগে তুমি আঘাত হানো/ এই যুদ্ধে বন্ধু তোমার জয়/ জানি আগামীর নবীন অভ্যুদয়/...’ (দিনমজুরের গান)
মহাদেব সাহা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মানুষকে অবলম্বন করে কবিতা রচনা করেন। বাঙালির গৌরব, ব্যথা, সংগ্রাম—প্রতিদিন যুদ্ধ করে বেেঁচ থাকার গল্প, তাঁর কবিতার বক্তব্য তাঁর চিত্রকল্পে উপস্থাপিত হয়। তাঁর কবিতা অনন্তের বাণীতে অবগাহিত । সত্য-সুন্দরকে আবিষ্কার করার কাজ মহাদেব সার্থকভাবে সম্পন্ন করেছেন । তাঁর কবিতা শিকড়ের দিকে আমাদের তাগিদ দেয়। মহাদেবের কবিতায় সরল মানুষ ও নিরাভরণ সমাজ ও চিত্রকল্পের উপস্থিতি ঘটে। মহাদেব সাহার কবিতা ঐতিহ্য অন্বেষী ও স্বাদু।
