অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব শাহ্ সূফি ওসমান আলী (রহ.)

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৪, ২০:২৯
আলহাজ ওসমান আলী (রহ.)। শুধু একটি নাম নয় বরং একটি ইতিহাস। একাধারে ভাষা সৈনিক, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা সর্বোপরি একজন দৃষ্টান্তমূলক মানুষ। সাধারণ শিক্ষার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌছেও তিনি ছিলেন বিস্ময়কর রকমের আল্লাহওয়ালা মানুষ। ছিলেন নির্লোভ। অপার্থিব চেতনাকে নিজের জন্য মুখ্য করে নিয়ে পার্থিবকে গৌণ করে নিয়েছেন নিজের জন্য। উপনিবেশিক বাংলাদেশে একসময় মুখ থুবড়ে পড়েছিল মুসলিম শিক্ষা সংস্কৃতি ও সভ্যতা। মুসলমানরা ভুলতে বসেছিল তাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা। তাদেরকে এহেন পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ উপমহাদেশে পাঠিয়েছিলেন হযরত মোহাম্মদ মুস্তাফা (স.) এর আদর্শে উদ্ভাসিত কয়েকজন ওয়ালীকে। শাহ সূফী ওসমান আলী ছিলেন তাদের মধ্যেই একজন অগ্রসেনানী। ১৯২৭ সালের ২৯ এপ্রিল শুক্রবার নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা থানার মন্ডলের গাতী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ওসমান আলী (রহ.)। পিতা মাহমুদ জান তালুকদার ও মা আয়েশা খাতুনের সন্তান তিনি। ১৯৩৪ সালে ৭ বছর বয়সে তিনি নিজ গ্রামের মক্তবে ভর্তি হন। ১৯৩৪-৩৬ পর্যন্ত তিনি সেখানে পবিত্র কোরআন শিক্ষা করেন। ১৯৩৭ সালে পার্শবর্তী বড়কাপন গ্রামে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৪০ সালে অত্র স্কুলে অত্র স্কুল থেকে ৪র্থ শ্রেণিতে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪১ সালে ভর্তি হন রানীগাঁও মিডিয়া ইংলিশ স্কুলে ৫ শ্রেণীতে। সেখান থেকে ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণি পড়াশোনা করে ১৯৪৩ সালে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হন দুর্গাপুর থানার বিরিশিরি মিশন স্কুলে। এখান থেকে ৮ম শ্রেণি পাশ করে ১৯৪৫ সালে ৯ম শ্রেণীতে ভর্তি হন বারহাট্টা থানার ভাউমী হাইস্কুলে। সেখানে ৯ম ও ১০ম শ্রেণি পড়াশোনা করেন ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মেট্রিক (এসএসসি) পাশ করেন। অত:পর ভর্তি হন কিশোরগঞ্জের গুরু দয়াল কলেজে। ১৯৫১ সালে অত্র কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। বিএ অধ্যয়নকালে কিছুদিন তিনি কলমাকান্দা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। বিএ পাশ করার পরপরই যোগদান করেন দুর্গাপুর থানার কালসিন্দুর হাইস্কুলে। সেখানে বছরখানেক শিক্ষকতা করেন। ঐ সময় পূর্বধলা থানার দুধী গ্রামের মরহুম জাহেদ আলী সাহেবের কন্যা মোসাম্মত্ জোবেদা বেগমের সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে ভর্তি হন এবং ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে সেখান থেকে এম এ পাশ করেন। অবশ্য পড়াশেনার পাশাপাশি প্রায় দেড় বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আপার ডিভিশন ক্লার্ক (UDA) পদে চাকরীও করেন। এম এ পাশ করার সাথে সাথেই তিনি ১৯৫৫ সালে সাব রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পান সিলেটের বিয়ানীবাজারে। ১৯৫৫ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন স্থানে সাবরেজিস্ট্রার পদে চাকরি করেন। ১৯৮১ সালে ৮৭ সাল পর্যন্ত উজ বা জেলা রেজিস্ট্রার পদে চাকুরী করে অবসর গ্রহন করেন। সুফী ওসমান আলী (রহ.) শিক্ষকতা, সাব রেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্ট্রার পদে চাকরি করলেও তার জীবন ছিল সামগ্রিক মুল্যায়নে উজ্জল-অত্যুজ্জল। ৩২ বছর সাব রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরি করলেও তিনি কোনোদিন এক পয়সা ঘুষ গ্রহণ করেননি। ইসলামের প্রতিটি নীতি ও আমলকে সুক্ষভাবে বিশ্লেষন করে বাস্তব জীবনে যথাযথভাবে তা পালন করতেন। যদিও ১৯৬২ সালে ছারছীনা শরীফের মরহুম আবু জাফর মোহাম্মদ ছালেহ (রহ.) এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। তবে তিনি এর পূর্ব থেকেই একজন কামেল ওয়ালী ছিলেন। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য তিনি ছিলেন আদর্শ ও কল্যানের কান্ডারী। ১৩ টি মসজিদ ও ৫ টি মাদ্রাসাসহ স্কুল কলেজেও তিনি অনুদান দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন। বেশ কয়েকটি মসজিদ ও মাদ্রাসা একক প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন। তাকে প্রত্যক্ষদর্শীরা অনেকেই এমন মন্তব্য করেছেন- ‘জীবিত এমন মানুষ আর দেখি নাই’। ওসমান আলী (রহ.) একজন অনুকরনীয় ও অনুসরনীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ১১ সন্তানের জনক। আশ্চার্যের বিষয় যে, তার সন্তান এবং জামাতারা একই সাথে দীনদার ও পরহেজগার ও সামাজিক- আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৮৮ সালে একা এবং ২০০৫ সালে তিনি স্বস্ত্রীক হজব্রত পালন করেন। ২০১৪ সালের ২০ জুন জুমাবার রাত ১টায় তিনি অসংখ্য শুভাকাঙ্খী ও সত্ সন্তানদের রেখে বর্ণাঢ্য জীবনের ইতি টানেন। —লেখক :সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়