আঁধার ঘরে চাঁদের আলো

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৪, ২০:৫৩
একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও কঠোর অধ্যবসায়কে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে বড়াইগ্রামের লাভলী, আয়েশা আর মুক্তিয়ারা, ভোলার বোরহান উদ্দিনের রহমতউল্লাহ ও ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের খাদিজাতুল কুবরা। কিন্তু অর্থাভাবে ওদের ভাগ্যাকাশে এখন কালো মেঘ উঁকিঝুঁকি মারছে। স্বপ্নিল ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তিত ওরা। এরা ঠেলাগাড়ি চালক, রিক্সাচালক ও দিনমজুরের মেধাবী সন্তান। এসব মেধাবী মুখের খবর তুলে ধরেছেন আমাদের সংবাদদাতারা। বড়াইগ্রামের অদম্য মেধাবী লাভলী আয়শা আর মুক্তি বড় হতে চায় নাটোরের বড়াইগ্রামের অদম্য মেধাবী লাভলী, আয়শা আর মুক্তিয়ারা দারিদ্র্যের সাথে নিত্য সংগ্রাম করে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। দৈন্য আর নানা প্রতিবন্ধকতাকে পেরিয়ে আসতে পারলেও উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা সে আশঙ্কায় তাদের আনন্দ ম্লান হতে চলেছে। চকপাড়া গ্রামের দরিদ্র ভ্যানচালক হাবিল মণ্ডলের মেয়ে লাভলী এবার বড়াইগ্রাম মহিলা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে পেয়েছে জিপিএ-৫। তার বাবা শয্যাগত। মা জরিনা বেগমও হাড় ক্ষয় আর কিডনী সমস্যায় ভুগছেন। চিকিত্সা আর সংসারের ব্যয় মেটাতে বাড়ির ভিটা পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। বর্তমানে শ্বশুর বাড়িতে একটি ঘর তুলে কোন রকমে দিন কাটছে তাদের। লেখাপড়া শিখে লাভলী একজন আদর্শ শিক্ষক হতে চায়। মৌখাড়া ইসলামিয়া মহিলা ডিগ্রী কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ-৫ পাওয়া আয়শার স্বপ্ন বড় হয়ে সরকারি কলেজের শিক্ষক হওয়ার। বাবা নুরুল ইসলাম স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালের নাইট গার্ড। সামান্য বেতনে যেখানে তার সংসার খরচ চালানোই কষ্টকর, সেখানে মেয়ের উচ্চ শিক্ষার ব্যয় মেটানো একেবারেই অসাধ্য তার। মাড়িয়া গ্রামের দরিদ্র রাজমিস্ত্রী আলম সরকারের মেয়ে বড়াইগ্রাম মহিলা কারিগরি এন্ড বিএম কলেজের ছাত্রী মুক্তিয়ারা খাতুন জিপিএ-৫ পেয়েছে। নিজস্ব জমি না থাকায় তার বাবা খাসজমিতে বসবাস করেন। রাজমিস্ত্রীর কাজ করতে গিয়ে কোমড়ে আঘাত পেয়ে প্রায় ৬ মাস ধরে কোন কাজ করতে পারছেন না তিনি। তিন বেলা খাবার জোটানোই যেখানে দুঃসাধ্য, সেখানে মেয়ের ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন তার কাছে যেন শুধুই মরীচিকা। চরভদ্রাসনে দিনমজুরের মেয়ের জিপিএ-৫ লাভ ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার বালিয়াডাঙ্গী গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেয়ে খাদিজাতুল কুবরা চরভদ্রাসন সরকারি কলেজ থেকে পেয়েছে জিপিএ-৫। বাবা ইদ্রিস মণ্ডল দিনমজুর ও মা রোকেয়া বেগম অন্যের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করে সংসার চালায়। ভাল ফলাফলে বাবা-মায়ের পাশাপাশি পাড়া-প্রতিবেশি খুশি হলেও অভাব-অনটনের সংসারে মেয়েটিকে ভালো কলেজে ভর্তি করাতে পারবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত বাবা-মা। দুর্ঘটনায় পা হারিয়েও হার মানেননি রহমতউল্লাহ দুর্ঘটনায় পা হারিয়েও এ বছরের আলিম পরীক্ষার ফলাফলে পূর্বের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন রহমতউল্লাহ। শত বাধা পেরিয়ে সে ভোলার বোরহানউদ্দিন কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। রহমতউল্লাহ জানায়, ২০১০ সালের ২৬ ডিসেম্বর এক দুর্ঘটনায় তার দাদা হাফেজ মোঃ হানিফ ও চাচা ইব্রাহিম মারা যায়। মারাত্মক আহত অবস্থায় তাকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৮ দিন চিকিত্সা শেষে আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ২০১১ সালে তার বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়। রহমতউল্লাহ বর্তমানে স্ক্যাচ ভর দিয়ে কৃত্তিম পা নিয়ে চলাচল করে। রহমতউল্লাহ জানান, মাদ্রাসা থেকে তার বাড়ি সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে হলেও নিয়মিত সে ক্লাস করতো। রহমতউল্লাহ প্রকৌশলী হবার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু তার অসচ্ছল পিতার পক্ষে কতদূর চালিয়ে নেয়া সম্ভব তা ভবিষ্যত্ই বলতে পারে।