‘সৌন্দর্য গায়ের রঙে নয়’

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০১৪, ২০:২৭
ত্বক ফর্সা করার জন্য যারা লেজার সেন্টার ও বিউটি এক্সপার্টদের কাছে ছুটছেন তাদের জন্য পরামর্শ আমি বহুবার লিখেছি ত্বক ফর্সা করা যায়না। ত্বক ফর্সা করার কোন বিজ্ঞান সম্মত চিকিত্সা পৃথিবীর কোথাও আবিষ্কৃত হয়েছে বলে এমন কেউ দাবী করেছেন এমন কোন তথ্যও আমার জানা নেই। অথচ প্রতিদিন আমার চেম্বারে অন্তত:৫ থেকে ৭ জন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, গৃহবধু, তরুণী আসেন যারা ফর্সা হতে চান। আমি বহুবার বলেছি ত্বক ফর্সা করতে পারিনা। হাজার প্রশ্ন শুনতে হয় অন্যরা পারলে আপনি পারবেন না কেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি বুঝাতে চেষ্টা করি স্বাভাবিক ত্বকে অনেক সময় হালকা পিগমেন্ট পড়ে, স্কিন খানিকটা অনুজ্বল হয়ে পড়ে। এসবের কিছুটা বিজ্ঞান সম্মত স্বীকৃত চিকিত্সা আছে। এতে স্কিন কিছুটা ব্রাইট হয়, তবে ফর্সা হয়না। কেউ এসব শুনতে চাননা, সবাই চান ফর্সা হতে। অতি সম্প্রতি ইত্তেফাকে বড় করে প্রকাশিত হয়েছে ত্বক ফর্সা করার নামে তরুণী-মহিলাগণ কিভাবে প্রতারিত হচ্ছেন। তবু ছুটছেন, ফর্সা হওয়া চাই। আমরা যারা মানুষের ত্বক নিয়ে ব্যবসা করি তারা এ সুযোগে বেশ ভালই আছি। যাক এসব কথা। একটা আশার কথা শুনছি গত কিছুদিন ধরে। আর তা শুনছি দেশের অন্যতম বৃহত্ শিল্পগোষ্ঠী স্কয়ার একটি পণ্যের প্রচারনায় সত্যিকার সৌন্দর্য কি তা উল্লেখ করা হচ্ছে। আর তাতে জনপ্রিয় অভিনেত্রী তিশা বলছেন, ‘সৌন্দর্য গায়ের রঙে নয়, ফ্রেশ মানেই সুন্দর’। আসলে স্কয়ার-এর শ্লোগানটি সার্বজনীন। এটা প্রত্যেকটি সচেতন মানুষের শ্লোগান। তাই আমি বলবো সৌন্দর্য ত্বকের রং পরিবর্তন করে নয়, আপনার ত্বক আপনার চুল, আপনার সুন্দর অবয়ব পরিপাটি করে রাখতে পারলেই সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। দয়া করে ত্বক ফর্সা করার জন্য কেউ অন্তত: আমার কাছে আসবেন না। ত্বক ফর্সা করা যায়না। তবে অনেক ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ত্বকের ‘হাইপো পিগমেন্টেশন’ হওয়া বা ত্বক সাদা হওয়া। এটা ঐ ওষুধের কোন গুণাগুন নয়। এটা ঐ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তাই যারা ত্বক ফর্সা করতে বাজারের নানা চটকদার ক্রিম, আমাদের মত লেজার সেন্টারের প্রলোভনে আকৃষ্ট হচ্ছেন তাদের বলবো ত্বক ফর্সা করা যায়না। এতে ত্বকের ক্ষতি হয়। আর জনপ্রিয় অভিনেত্রী তিশার কণ্ঠে যে চরম সত্যিটা উচ্চারিত হচ্ছে এটাই বাস্তব। ‘সৌন্দর্য গায়ের রঙে নয়’। আপনার ত্বক কালো হোক, শ্যামলা হোক, আর ফর্সা হোক এটারই পরিচর্যা করুন। দেখবেন আপনার সৌন্দর্য অটুট থাকবে। ডাক্তার, লেজার সেন্টার বা বিউটি এক্সপার্টদের কাছে ছুটতে হবে না। আমি মায়ামী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অব মেডিসিনের কসমেটিক ডার্মাটোলজীর ফেলো ছিলাম। আমার বস বিশ্বখ্যাত কসমেটিক ডার্মাটোলজিস্ট অধ্যাপক লেজলি বাওম্যান। তাকেও বলতে শুনেছি, সৌন্দর্য ত্বকের রঙে নয়, সব সুন্দরই সৌন্দর্য। তার মতে, ত্বকের যত্নে চাই একটি ভালো ক্লিনজার, একটি ভালো ময়েশ্চরাইজার এবং একটি ভালো সান ব্লক। ৬০ বছরেও তিনি এখনও সুন্দর। বয়স তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি বিশ্বে সর্বাধিক বিক্রীত কসমেটিক ডার্মাটোলজি গ্রন্থেরও রচয়িতা। ত্বকের রঙ যারা মুখ্য মনে করেন তারা সৌন্দর্য বোঝেন না। সৌন্দর্য ভিন্ন জিনিষ। এখানে একটি ঘটনা বলবো। এতে বুঝা যাবে সৌন্দর্য সত্যিই গায়ের রঙে নয়। সুন্দর ত্বকেই সৌন্দর্য। আজ থেকে ১৭ বছর আগের কথা। ১৯৯৮ সালে জেনেভাতে একটি স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্মেলনে গিয়েছিলাম। আমাদের দলে ছিলেন, প্রখ্যাত জীবানুবিদ প্রয়াত মেজর জেনারেল এমআর চৌধুরী, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, কিছু এনজিও কর্মকর্তা ও কর্মীসহ অনেকে। এসব সম্মেলনে অনেক উদ্যোক্তা ফান্ড অনুসন্ধানের চেষ্টা করে। এমনই একজন মহিলা ছিলেন যার বয়স তিরিশের বেশী হবেনা। একটি এনজিওর দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। বিবাহিতা এবং ২ সন্তানের জননী। গায়ের রং কালোর থেকে একটু উজ্জল, স্বাস্থ্যবান এবং সুশ্রী। এনজিও কর্মকর্তার সঙ্গে আমার দীর্ঘ দিনের জানা শোনা। এখন হয়ত উক্ত মহিলার বয়স ৫০-এর কাছাকাছি হবে। পেশার ভিন্নতার কারণে আমার সঙ্গে এখন আর যোগাযোগ নেই। জেনেভায় ভদ্র মহিলার একজন বিট্রিশ সাদা চামড়ার চিকিত্সকের সঙ্গে পরিচয় হয়। একাধিক মিটিংও করেন। উদ্দেশ্য ছিলো উক্ত বৃটিশ চিকিত্সকের সঙ্গে সখ্যতা তৈরী করে ফান্ড জেনারেশনের চেষ্টা। এতেই হলো কাল। উক্ত বৃটিশ চিকিত্সকের নজর পড়লো উক্ত এনজিও কর্মকর্তার দিকে। অবশ্য উক্ত এনজিও কর্মকর্তারও খানিকটা দোষ ছিলো। তিনি এমন একটা অভিব্যক্তি দেখিয়েছেন যে তিনি এখনও কারও পানি গ্রহণ করেননি। স্বল্প পরিচয়ের এক পর্যায়ে সাদা চামড়ার উক্ত চিকিত্সক প্রথমে বন্ধুত্ব এবং পরে সরাসরি জীবন সঙ্গিনী করার প্রস্তাব দেন। বিপাকে পড়ে যান এনজিও কর্মকর্তা। এনজিও কর্মকর্তা আমাকে ঘটনাটি যেভাবে বলেছেন ঐ ভাবে বলার চেষ্টা করছি। কোন গল্পকার, নাট্যকার, উপন্যাসিক হলে হয়তবা এ কাহিনী দিয়ে একটি হিট ছবি বানিয়ে ফেলতেন। ভদ্র মহিলা প্রথমে বলার চেষ্টা করেন আমি তো কালো। এরপর চিকিত্সক বললেন, কালোই তো আমার বেশী পছন্দ। এ কারণেই তার প্রতি এই অনুরাগ। এর পর ভদ্রমহিলা বললেন, আমি তো বিবাহিতা। এতেও কোন ফল হলো না। এরপর চিকিত্সক বললেন, এতে আমার কোন সমস্যা নেই। এরপর ভদ্র মহিলা বললেন, আমার দুটি সন্তান রয়েছে। এরপর বিদেশী চিকিত্সক বললেন, তার দু’সন্তানসহ তিনি তাকে গ্রহণ করতে চান। এরপর উক্ত এনজিও কর্মকর্তা কিভাবে বিদেশী সৌন্দর্য প্রিয় চিকিত্সককে ম্যানেজ করেছিলেন বা আদৌ ম্যানেজ করতে পেরেছিলেন কিনা তা আর জানা হয়নি। এ লেখাটি পড়লে হয়ত অনেকে আর ত্বক ফর্সা করার জন্য ডাক্তার বা বিউটি এক্সপার্টদের পিছনে ছুটবেন না, এটা নি:শ্চয়ই বিশ্বাস করা যায়। ডা: মোড়ল নজরুলইসলাম চুলপড়া, চর্মরোগ ও এলার্জি এবং যৌন সমস্যা বিশেষজ্ঞ লেজার এন্ড কসমেটিক সার্জন বাংলাদেশ লেজার স্কিন সেন্টার বাড়ী-৩৯ (আম্বালা কমপ্লেক্স) রোড-২ ধানমন্ডি, ঢাকা।