কেন পাক-ভারত বৈঠক বাতিল করলেন মোদী

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০১৪, ২১:১৬
ইমরান-কাদরির আন্দোলনের কারণে শুধু দেশের ভিতরে নয়-দেশের বাইরেও চাপে রয়েছে নওয়াজ সরকার। বিশেষ করে চিরবৈরী প্রতিবেশি দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ভেস্তে গেছে। ২৫ আগস্টের ওই বৈঠক মোদীর ইচ্ছাতেই বৈঠক বাতিল হয় বলে জানা গেছে। সীমান্তে অস্ত্র বিরতির শর্ত লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের সঙ্গে দিল্লিতে পাকিস্তানি দূূতের বৈঠককে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ভেস্তে যায়। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই এই বৈঠকের রেওয়াজ চালু থাকলেও কেন ভারত এই যুক্তিতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাই পুরোপুরি বাতিল করে দিল, তা বিশেষজ্ঞরাও বুঝতে পারছেন না। ২০০১ সালে আগ্রা শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে এসে তখনকার পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফও একই কাজ করেছিলেন। তখন ক্ষমতায় থাকা অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকার তাতে আপত্তি জানায়নি, সম্মেলনও বাতিল হয়নি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন বলেছেন, ভারত যখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করার জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই পাকিস্তানি হাইকমিশনারের তথাকথিত হুরিয়ত নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনা পাকিস্তানের সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। যে কারণে পররাষ্ট্র সচিবের পাকিস্তান সফরকে গুরুত্বহীন মনে করছে ভারত। যদিও দীর্ঘদিন পর দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সূত্রপাতও ভারতের উদ্যোগেই হয়েছিলো। ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শপথ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের যোগদান ও পরের দিন ফলপ্রসূ বৈঠকের দাবির পর দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলছে বলে অনেকেই পূর্বাভাস দিয়েছিলো। দীর্ঘদিন পর দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের উচ্চ পর্যায়ের এই বৈঠকে সদিচ্ছামূলক মনোভাবের পরিচয়ও মিলে ছিলো। ২০০৮ সালে ২৬ নভেম্বরের আগ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে কম-বেশি সংলাপ চালু ছিলো। বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলোর নিষ্পত্তিতে দুই দেশের মধ্যে বিছুটা হলেও আগ্রহ ছিলো। কিন্তু মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার কারণে দুই দেশের সম্পর্কে ভাটা পড়ে। এরপর পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ক্ষমতায় আসার আগে অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে জোর চেষ্টা চালাবেন। সে সুযোগটাই করে দিয়েছিলন নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু সেই উদ্যোগ এখন আশঙ্কার মেঘে ঢাকা পড়েছে। পাকিস্তানের হাইকমিশনারের বৈঠককে ভারত হঠাত্ করে কেন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে মনে করছে? ইতিহাসবিদ ও কাশ্মীর-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কিংশুক চ্যাটার্জি মনে করেন এর পেছনে কূটনৈতিক কারণ কম, রাজনৈতিক কারণই বেশি। এই পরিস্থিতিতে হুরিয়ত নেতারাও বলছেন, এতদিন ধরে চলে-আসা একটা রীতি আচমকা বন্ধ করার চেষ্টা ভারতের ছেলেমানুষি ছাড়া আর কিছু নয়। তবে নরেন্দ্র মোদী সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতাও দায়ী বলেও কেউ কেউ মনে করছেন। যেভাবে পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে, তাতে এই মুহূর্তে সেই সরকারের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছে ভারত। নরেন্দ্র মোদী মনে করেছিলেন, হয়তো তার কাছে এমন কোনো জাদুর চাবি রয়েছে যা দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের বন্ধ থাকা সকল দরজা খুলতে পারবেন। কিন্তু এটা সম্ভব হয়নি। কারণ পাকিস্তান তাদের আগের পথেই রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে আগের মতোই অন্ধভাবে শত্রু মনোভাব পোষণ করে। তারা তাদের পথ পরিবর্তন করতে পারবে না এ বিষয়টি ভারতকে মেনে নিতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না করলে পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ভারতের কোনো লাভ হবে না। ভারতের মিড ডে ডটকমের এক নিবন্ধে বলা হয়, হুরিয়াতের সঙ্গে আলোচনার নির্দেশনা পাকিস্তান থেকেই এসেছে। তারা দেখতে চেয়েছে অতীতের সরকারের মতো নতুন সরকার এই রেওয়াজ মেনে নেয় কিনা। হুরিয়াতের কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। এই অবস্থায় হুরিয়াতের সঙ্গে আলোচনার অর্থ হলো জম্মুু-কাশ্মিরের নির্বাচিত সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীকে অবমূল্যায়ন করা। নিবন্ধে আরো বলা হয়, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতীয় নীতিতে কিছু ভুল বিশ্বাস রয়েছে। ভারত মনে করে, পাকিস্তানি রাজনীতিকরা একটি স্বাভাবিক ও আন্তরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উপর জোর দেবে। কিন্তু পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তা হতে দেবে না। অনেকেই ভুল চিন্তা করে যে, দুই দেশের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত থাকলে পাকিস্তানের রাজনীতিকদের হাত শক্তিশালী হবে এবং সেনাদের ক্ষমতা দুর্বল হবে। কিন্তু এটা হবে না। পাকিস্তানের রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন আনার সামর্থ্য ভারতের নেই। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে ভারতের ঐতিহ্যগত নীতি থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো ফল আসেনি। এখন শুধু সামান্যই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখা যেতে পারে যতদিন না পর্যন্ত তারা ভালো প্রতিবেশী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।