দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান হয়েছে প্রিন্সেসের। গত বৃহস্পতিবার আবার সে মা হয়েছে। আর এর মধ্যদিয়ে তার নতুন সংসার যেন ভরে উঠেছে। হয়েছে একাকী জীবনের অবসান। পাঠকের হয়তো মনে আছে, এই প্রিন্সেসের কথা। আর কেউ নয়, দুর্লভ ব্লু-গোল্ড ম্যাকাও প্রজাতির পাখি প্রিন্সেস।
ঘটনা দুর্ঘটনার আবর্তে ঘেরা তার জীবন। প্রিন্সের সাথে তার সুখের সংসার ভেঙ্গে গেছে গত বছর ৩ জানুয়ারি। এদের মালিক দু’জন। পুরুষ পাখি প্রিন্সের মালিক ইকরাম সেলিম ও মেয়ে পাখি প্রিন্সেসের মালিক ড. আবদুল ওয়াদুদ। ঘটনা শুরু ২০১০ সালে। উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় ইকরাম সেলিম তার পাখিটি বিশিষ্ট পাখি বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল ওয়াদুদকে উপহার দেন। তিনি প্রিন্সের জন্য একটি সঙ্গী খুঁজে নিয়ে আসেন ব্রাজিল থেকে। মিল রেখে নাম রাখেন প্রিন্সেস। তিন বছরের সুখের সংসারে তাদের চারবারে মোট সাতটি বাচ্চা হয়। শুধু বাংলাদেশে নয় দক্ষিণ এশিয়ায় এর পূর্বে ম্যাকাও পাখির বাচ্চা হওয়ার কোন নজির নেই। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও তাপমাত্রায় বিশেষ ব্যবস্থায় ড্রামের মধ্যে বাচ্চা ফোটানোর ঘটনা সবাইকে চমকে দেয়। তবে বড় চমক অপেক্ষা করে এরপর।
ইকরাম সেলিম উপহার হিসাবে দেয়া পাখি প্রিন্সকে তিনবছর পর ফেরত চাইলে বাধে জটিলতা। প্রথমে থানায় পাল্টাপাল্টি জিডি। পরে ঘটনা গড়ায় আদালত পর্যন্ত। নির্বাহী মেজিস্ট্রেটের আদেশ বলে প্রিন্সেসের কাছ থেকে তার প্রিয় সঙ্গী প্রিন্সকে নিয়ে যায় ইকরাম সেলিম। পাখির সংসার রক্ষায় উচ্চ আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করেন ড. ওয়াদুদ। নিম্ন আদালত যে আদেশ দিয়ে পাখি দুটিকে আলাদা করেছে উচ্চ আদালত সে আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। পাখির সংসার রক্ষায় আইনী লড়াই পৃথিবীতে এক নজীরবিহীন ঘটনা। বর্তমানে প্রিন্সের বাস বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এবং প্রিন্সেসের বাস ২২/২, হাতিরপুলস্থ ফিকামলি সেন্টারের মিনি চিড়িয়াখানায়। একই শহরে থেকেও মালিকানার দ্বন্দ্বে ও আইনী জটিলতার কারণে তারা একত্রে বসবাস করতে পারছে না।
মামলার দীর্ঘসূত্রতা, পাখির করুণ আর্তনাদ প্রতিনিয়ত ব্যথিত করত পাখি প্রেমিক ড. আবদুল ওয়াদুদকে। তিনি প্রিন্সেসের জন্য উপযুক্ত বয়সী একটি পুরুষ পাখির খোঁজ করতে থাকেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। অবশেষে আর্জেন্টিনা থেকে একটি পাখি এনে নাম রাখেন আলেকজান্ডার। প্রথম দিকে প্রিন্সেস তার নতুন সঙ্গী আলেকজান্ডারকে একেবারেই সহজভাবে গ্রহণ করেনি। তাকে প্রথম দেখেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। তবে একসময় মেনে নেয় স্বভাবে অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির আলেকজান্ডারকে।
এ প্রসঙ্গে পাখি গবেষক ড. ওয়াদুদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আলেকজান্ডারের সাথে প্রিন্সেসের জোড়া বাঁধানো খুব সহজ হয়নি। কারণ প্রিন্সেস বাংলা ভাষা বুঝে, আর আলেকজান্ডার বুঝে স্পেনিস। নতুন পরিবেশ ও ভাষাগত পার্থক্যের কারণে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়তে অনেক বেগ পেতে হয়ছে। তবে এখন আমি সফল। ডিম থেকে প্রিন্সেসের একটি ছানা ফুটেছে। মা ও ছানা বর্তমানে সুস্থ আছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রিন্সকে পাওয়ার জন্য আর আইনী লড়াই করবেন না। কারণ, প্রিন্সকে পাওয়ার জন্য নয়, তাদের দাম্পত্য জীবন পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন প্রিন্সেস যেহেতু সঙ্গী খুঁজে পেয়েছে, সংসার হয়েছে, বাচ্চা দিয়েছে তাই মামলার আর প্রয়োজন নেই।
