কক্সবাজারে ইউপি চেয়ারম্যানের অনিয়ম তদন্তে মাঠে দুদক

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২২, ১৩:৫৫

কক্সবাজারের ঈদগাঁও’র জালালাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ইমরুল হাসান রাশেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সোমবার (১৪ মার্চ) দুপুরে জালালাবাদ পরিষদ ও চেয়ারম্যানের বাড়িসহ বিভিন্ন অনিয়মস্থল এবং অভিযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখেছে দুদক টিম। জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

দুদক কক্সবাজার জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক রিয়াজ উদ্দিনের নেতৃত্বে দুদক টিম লোকাল গভর্ন্যান্স সাপোর্ট প্রজেক্ট (এলজিএসপি)’র প্রকল্প, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহারের ঘর আপন ভাইকে বরাদ্দ, এলজিইডি সড়কের গাছ কেটে সাবাড় করা, নিজের ঘরের চালে জনস্বার্থের সোলার প্যানেলের সাহায্যে পানি পিওরিফাই প্রকল্প বসানোসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করেন। 

রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘জালালাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ইমরুল হাসান রাশেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের লিখিত অভিযোগ কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে যায়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় পরিষদে অভিযান চালানো হয়। পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগ উঠা প্রকল্প এলাকাগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। অনিয়মের সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য-প্রমাণ হাতে পেয়েছি। এসব কমিশনে পাঠানো হবে। ’
 
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যান রাশেদ নিজের বাড়িতে যাতায়াতের পথ তৈরিতে এলজিএসপি-৩ এর ৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে জনস্বার্থে দেওয়া প্রায় ৮ লাখ টাকা মূল্যের সরকারি সৌর প্যানেল বসানো হয়েছে চেয়ারম্যানের বাড়ির ছাদে। বীরাঙ্গনা ও স্বামী পরিত্যক্তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহারের ঘর চেয়ারম্যান তার ভাইকে বরাদ্দ দিয়েছেন। এছাড়াও এলজিইডি সড়ক প্রকল্পে পরিষদের পরিচর্যাধীন ৩৫০টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রাতের আঁধারে বিনা অনুমতিতে কেটে বিক্রি করেছেন চেয়ারম্যান। যার প্রমাণপত্র মিলেছে। 

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ‘জেলা পরিষদ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থা কর্তৃক করা প্রকল্প তথ্য গোপন করে সুকৌশলে ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে কতিপয় এমইউপি ও দুর্নীতিবাজ সচিবের সহযোগিতায় অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। ভিজিএফ চাউল-গম জনপ্রতি ১২-১০কেজি করে দেয়ার কথা থাকলেও চেয়ারম্যান দিয়েছেন ৫-৬ কেজি। ইউপির নতুন ভবন বুঝিয়ে দেয়ার পরও দু’বছর মাসিক ভাড়ায় ঝুপড়ি ঘরে পরিষদের কার্যক্রম চালান।’

এছাড়াও জানা গেছে, টিআর-কাবিখা প্রকল্পের কাজ না করে সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ, কর্মসৃজন প্রকল্পে অনিয়ম, জেলে ভাতার মনগড়া তালিকা, প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার চেয়ারম্যান পরিবারে বিতরণ, পরিষদের মূল আয় ওয়ারিশ সনদের বিপরীতে পাওয়া ২০ লাখ ৩০ হাজার টাকা ও ভূমিহীন সনদের ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রত্যয়ন ও সনদে আয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিষদের আয় ফান্ডে জমা না করে নিজে আত্মসাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ব্যাপক অনিয়ম, ইউপির দু’সদস্য ও ইউপি সচিবের সহায়তায় ১২টি প্রকল্প (প্রায় ২৪ লাখ টাকা) কাজ না করে টাকা উত্তোলনের পর আত্মসাৎ করেন। তাছাড়া জেলা পরিষদ ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক করা প্রকল্পকে ইউনিয়ন পরিষদের প্রকল্প দেখিয়ে (১০টির মত) প্রকল্পের প্রায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানের এসব কাণ্ড ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯ এর ধারা ৩৪(৪) (ঘ) অনুযায়ী অসদাচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার।

এদিকে, ঈদগাঁও কেন্দ্রীয় কালীবাড়ির সামনের খালি জায়গায় অবৈধ বাজার বসিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। ফলে, হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজারীদের যাতায়াতে চরম ভোগান্তির পাশাপাশি মন্দিরের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা। 

কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ঋত্বিক চৌধুরী বলেন, ‘জনস্বার্থে ব্যবহারের জন্য এমপিদের মাধ্যমে সোলার প্যানেলের সাহায্যে পানি পিওরিফাইয়ের বেশকিছু প্রকল্প দেওয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্তরা এটি ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করে থাকলে তা অনিয়মই।’ 

পরিষদ সংশ্লিষ্ট অনেকে বলেন, ‘পরিষদের ২০১৬ হতে ২০২১ সময়ের আয়-ব্যয় হিসাব দেখলে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিলবে। ছাত্রলীগ নেতা থাকাকালে দৃশ্যমান কিছু না থাকলেও চেয়ারম্যান হওয়ার পর ইমরুল রাশেদ এখন কোটিপতি। গড়েছেন ৬০ লাখ টাকা দামের আলিশান বাড়ি, ২০ লাখ টাকা দামের প্রাইভেট কার, ১৮ লাখ টাকা দামের নোহা, কোটি টাকা মূল্যের সেইফ ইসলামিয়া মার্কেটের ৯টি দোকান, ৪০ লাখ টাকায় কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে ফ্ল্যাট বুকিংসহ আরও অনেক সম্পদ রয়েছে। 

যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন চেয়ারম্যান ইমরুল হাসান রাশেদ। তিনি বলেন, ‘পরিষদের সকল কাজের যথাযথ নথি সংরক্ষিত রয়েছে।’ 

ইত্তেফাক/এসজেড