বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার মুহূর্তে আমাদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু হলো’

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২২, ০১:৩৭

১৯৬৮ সালে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একজন বৈমানিক হিসেবে যোগ দেন। প্রশিক্ষণের জন্য তাকে করাচিতে যেতে হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানে বসেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ আরো ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন।

তখন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসে ৩৫০ জন পাইলটের মধ্যে বাঙালি পাইলট ছিলেন মাত্র ৩০ জনের মতো। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা পেশ করেছেন এবং সেখান থেকেই তারা উপলব্ধি করেছিলেন, বাঙালি বৈমানিকদের নিয়ে আলাদা একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। তারা সহকর্মীরা মিলে ‘ইস্ট পাকিস্তান এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধাচরণের কারণে সেটা তৎক্ষণাৎ সম্ভব হয়নি। পরে আদালতের আশ্রয় নিয়ে তারা সেটি গঠন করতে পেরেছিলেন। ইস্ট পাকিস্তান এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন আলমগীর। ২৫ মার্চের পরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ক্যাপ্টেন আলমগীরসহ আরো তিন জন বাঙালি বৈমানিককে হত্যা করে। ইত্তেফাকের কাছে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রেক্ষাপট বলতে গিয়ে এভাবেই বলছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) সাহাবুদ্দিন আহমেদ, বীর-উত্তম।

এই মুক্তিযোদ্ধা বলছিলেন, ‘৫ মার্চ আমরা ১০-১২ জন ক্যাপ্টেন বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাসায় গেলাম। অন্য পাইলটদের কাছ থেকে আমরা খবর পেয়েছিলাম পাকিস্তানি প্রচুর সৈন্য বিমানে করে এখানে আসছে। উনাকে বিষয়টা জানালাম। পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানকেন্দ্রিক কোনো এয়ারলাইনস করা যায় কি না সেটাও বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আমাদের পাশে ডেকে নিয়ে বললেন, তোমাদের দেশ স্বাধীন হবে, প্রস্তুতি নাও। ফলে আমাদের কথা আর বলা হয়নি। এরপর ৭ মার্চ আমরা পাইলটরা সবাই মিলে রেসকোর্সে গেলাম। ঐ ভাষণ থেকেই আমরা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফিরে এলাম। আমরা তখন আসাদগেট কলোনিতে থাকি। ২৫ মার্চ রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম, ঢাকা শহরে শুধু গুলি আর গুলির আওয়াজ। কোথাও কোথাও আগুনের কুণ্ডলী উপরে উঠছে। অনেক জায়গা থেকে আর্তনাদের শব্দও ভেসে আসছে।’

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘তখন আর আমাদের বুঝতে বাকি থাকল না, মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। ২৭ মার্চ কারফিউ দুই ঘণ্টার জন্য উঠে গেলে মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের ঢাকার বিক্রমপুরের রায়পাড়া গ্রামে রেখে এলাম। এরপর ভগ্নিপতিকে সঙ্গে নিয়ে ফরিদপুর, কুষ্টিয়া হয়ে ভারতের পথে পাড়ি জমালাম। ৩ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী নাপাম বোমার মাধ্যমে পুরো চুয়াডাঙ্গা শহরটিকে ভস্মীভূত করে দেয়। ঐ সময় আমি চুয়াডাঙ্গা শহরে ছিলাম। ঐ সংবাদ কাভার করতে আসা ভারতীয় কিছু সাংবাদিকের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। তাদের একজন যুগান্তরের সাংবাদিক অলীক ভট্টাচার্য। তিনি আমাকে সঙ্গে করে কলকাতায় নিয়ে গেলেন। সেখানে জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফের দেখা পেলাম। সেখানে আরো কিছু মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাদের নিয়েই পরিকল্পনা করলাম সিলেটের শাহাজীবাজার পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দেওয়ার। কারণ এই পাওয়ার স্টেশন থেকেই ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। বিষয়টি সিনিয়দের জানালাম। তখন তারা সেখানে অবস্থান করা তিতাসের ইঞ্জিনিয়ার পুতুলকে ডেকে পাঠালেন। পুতুল জানালেন, তারা চলে আসার সময় ওটা শাটডাউন করে এসেছেন। ফলে সেটা আর করা লাগেনি।’

এরপর তিনি আগরতলায় চলে এলেন। সেখানে সার্কিট হাউজে ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের রূপরেখা চূড়ান্ত হলো। পরে যেটা ১৭ তারিখে ঘোষণা হলো, সেখানে ছিলেন বিএসএফের প্রধান। তাকে জানালাম আমাদের কিছু এয়ারক্রাফট দেওয়ার জন্য। তিনি বললেন, এটা ঊর্ধ্বতনদের জানাতে হবে। তখন আমার সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার ও ক্যাপ্টেন খালেক। তখন সেখানেই অবস্থান করছিলাম আমরা। জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমাদের দিল্লিতে ডাক পড়ল, আমি যে এয়ারক্রাফটের প্রস্তাব দিয়েছিলাম সেটা নিয়ে আলোচনা করতে। আমি, ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার ও ক্যাপ্টেন খালেক দিল্লি গেলাম। কয়েক জন সচিব ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে আমরা বললাম, আমাদের কয়েকটি ছোট ছোট এয়ারক্রাফট দাও, যাতে আমরা অপারেশন চালাতে পারি। তখন তারা আমাদের সরকারের কাছ থেকে প্রস্তাব চাইলেন। দ্রুত সেই প্রস্তাবও দেওয়া হলো। পরে ভারতের যোতপুরের মহারাজা তাদের একটা ড্রাকোটা প্লেন দিয়েছিলেন। আর ভারতীয় বিমানবাহিনী একটা অর্টার প্লেন আর একটা ফ্রেঞ্চ হেলিকাপ্টার দিলেন। এগুলোর কোনোটাই যুদ্ধবিমান ছিল না। সবই ছিল সাধারণ বিমান। এগুলো সমরসাজে সজ্জিত করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি একদিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো আসামের দিমাপুরে। ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের এয়ার চিফ মার্শাল পি সি রায় এবং আমাদের গ্রুপ ক্যাপ্টেন এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার ভারতের দিমাপুরে বিমানবাহিনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন। তখন সেখানে ছিলেন ৯ জন পাইলট। তার মধ্যে আমরা ছয় জনই বেসামরিক পাইলট।

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, শুরু হলো সামরিক প্রশিক্ষণ। ছয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষ হলো তিন সপ্তাহে। আমরা ২০০-২৫০ ফুটের ওপরে প্লেন উড্ডয়ন করতে পারতাম না। কারণ বাংলাদেশের আকাশে এর চেয়ে বেশি উচ্চতায় উড়লে পাকিস্তানি রাডারে ধরা পড়বে প্লেন। সেই সময় একটু মেঘ হলে নাগাল্যান্ডে আর কিছু দেখা যেত না। তাই ঐ সময়ে প্রশিক্ষণটা খুব বিপজ্জনক ছিল। অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে প্রশিক্ষণ শেষ হলো। ৩ নভেম্বর হেলিকাপ্টার নিয়ে ঢাকায় এবং অর্টার দিয়ে চট্টগ্রামে আক্রমণের পরিকল্পনা করা হলো। এ দুই শহরে আক্রমণের মূল কেন্দ্রস্থল ছিল অ্যাভিয়েশন ফুয়েল ডিপো, সেখান থেকে বিমানের তেল সরবারহ করা হতো। কিন্তু হঠাৎ করে উদ্ভূত পরিস্থিতে আক্রমণের পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়। পরে এই আক্রমণ ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে পরিচালনা করা হয়েছিল। যদিও প্রথম অপারেশনে থাকার সুযোগ হয়নি তার, কিন্তু ৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টার দিকে মৌলভীবাজারের পাকিস্তানি একটা বিশাল কনভয়ের ওপর রকেট হামলা করা হয় হেলিকপ্টার থেকে। এই হেলিকপ্টারের পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, ৭ ডিসেম্বর আমি আর ভারতীয় পাইলট শ্রিংলা সিলেটে এলাম। তখন আমাদের কাছে খবর ছিল, পাকিস্তানি সৈন্যরা শহর থেকে পালিয়েছে। আমরা যখন হেলিকপ্টার ল্যান্ড করব, ঠিক তখনই একটি বাংকার থেকে গুলিবর্ষণ হলো। আমরাও বাংকারে রকেট হামলা করলাম। এই হামলায় তাদের বিশাল ক্ষতি হলো। এভাবে বিমানবাহিনীর ৫০টি আক্রমণের মধ্যে ১২টিতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন তিনি।

 

১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানেও হাজির হয়েছিলেন তিনি। বলছিলেন, ঐ দিন বিকেলে তেজগাঁও বিমানবন্দরে আমার সামনেই একটা ঘটনা ঘটল। নিয়াজীকে সেখানে নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় অফিসাররাও আছেন। এর মধ্যে অনেক মানুষ ভিড় করেছে। একজন ছাত্র নিয়াজীকে জুতো ছুড়ে মারল। যদিও সুলতান মাহমুদ হাত দিয়ে ঠেকিয়ে দেওয়ার কারণে সেই জুতো তার লাগেনি। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীনের পর বিমানবাহিনীতে যাওয়ার সুযোগ পেলেও যাননি। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ বিমান থেকে অবসর নেন। এর মধ্যে দুই বছর সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসে চাকরি করেছেন। এখন পুরোপুরি অবসরে রণাঙ্গনের এই বীর।

 

 

ইত্তেফাক/ইউবি