সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি যিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন স্বমহিমায় তিনিই বঙ্গবন্ধু, আমাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন তার বিনয়, সততা মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর অসীম সাহসের কারণে। তার গভীর জীবনবোধ, মানবিক গুণাবলি, সংগ্রাম আর সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি তাকে বাংলার আপামর জনসাধারণের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ছাত্রজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন নির্ভীক, অন্যায়ের সঙ্গে আপসহীন ও দৃঢ়চেতা। তিনি নিজ স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়ার জন্যে ছিলেন সংকল্পবদ্ধ। বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়লেই প্রতীয়মান হয় কেন শেখ মুজিবুর রহমান অনন্যসাধারণ, কেন তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, কেন তিনি মুক্তির মহানায়ক।
বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ও ঘটনাপ্রবাহ যা না ঘটলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না, তার মধ্যে অন্যতম ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন ও ছাত্রলীগ গঠন, ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে কারাগারে অনশন, ১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আত্মপ্রকাশ, ১৯৫৬ সালে স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ১৯৫৮ সালে কারাবাস, ১৯৬৩ সালে পাকিস্তানের সংবিধানের বিরোধিতা, ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবি, ১৯৬৮ তে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন, ত্যাগ-তিতিক্ষা, ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাঙালির আর্থসামাজিক মুক্তির জন্যে তার ভাবনা তাকে কিংবদন্তি নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। রাজনীতি করতে গিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নানাবিধ ষড়যন্ত্র ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, জেল খেটেছেন বহুবার কিন্তু বাঙালির অধিকার রক্ষার আন্দোলন থেকে তিনি সরে যাননি বরং ঐতিহাসিক সব পটভূমিকায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপসহীন সংগ্রামী, অবিসংবাদিত নেতা, দক্ষ সংগঠক এবং সবার আস্থাভাজন।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা এবং বাংলার মানুষের স্বাধিকার আদায়ে ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জেলখানায় আমরণ অনশন ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ে বলেন—‘...বিনা বিচারে বন্দি রেখেছেন। কোনো অন্যায়ও করি নাই। ঠিক করেছি জেলের বাইরে যাব, হয় আমি জ্যান্ত অবস্থায় না হয় মৃত অবস্থায় যাব।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউপিএল লি., ঢাকা, ২০১২, পৃষ্ঠা ১৯৭) পাকিস্তানি শাসকেরা অসংখ্যবার বঙ্গবন্ধুকে জেলখানায় আটক করেছে, কিন্তু জনগণ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। জেলখানার প্রকোষ্ঠে থেকেও তিনি মুক্তই থেকেছেন, চিন্তায়-চেতনায় থেকেছেন বাংলার শোষিত, নির্যাতিত মানুষের সঙ্গেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধস্তন কর্মচারীদের স্বার্থ আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এই অপরাধে ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। যে কয়েক জন আন্দোলনকারী সত্ আচরণ করার মুচলেকা দিয়েছিল তাদের বহিষ্কারাদেশ বাতিল করা হলেও বঙ্গবন্ধু যেহেতু এরূপ কোনো মুচলেকা দিতে রাজি হননি তাই তার ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এমন অনেক উদাহরণ বঙ্গবন্ধু সৃষ্টি করেছিলেন তার ৫৪ বছরের জীবদ্দশায়। বাংলার দুঃখী মানুষের স্বার্থ, বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ, রাজনৈতিক অধিকার আদায় এবং বাঙালির মুক্তির ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপসহীন। বঙ্গবন্ধুর এই আপসহীন সাহসী অবস্থানের অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায় তার বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক জীবনের সব ক্ষেত্রে।
স্ত্রী-সন্তানবিহীন জেলখানার ঈদ কত কষ্টের তা বলতে গিয়েও বঙ্গবন্ধু মনোবলের ওপরেই জোর দিয়েছেন বেশি। তিনি বলেছেন— ‘জীবনের বহু ঈদ এই কারাগারে আমাকে কাটাতে হয়েছে, আরো কত কাটাতে হয় ঠিক কি? তবে কোনো আঘাতই আমাকে বাঁকাতে পারবে না। খোদা সহায় আছে।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৭, পৃষ্ঠা ২০১)। দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে তার অটল সংগ্রাম যে জীবনের নানা কষ্টের কারণ হতে পারে তা জানা সত্ত্বেও তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার আদায় থেকে পিছপা হননি। বরং দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন— ‘জীবনে আমার অনেক দুঃখ আছে সে আমি জানি, সেই জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছি।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৭, পৃষ্ঠা ১৭২)। রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বরচিত বইগুলোতে বাংলার সাধারণ মানুষ, তাদের দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্টের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়েছে। এছাড়াও উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন, সুদূরপ্রসারী ভাবনা আর বিভিন্ন ঘটনার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। মানুষের কল্যাণে জীবন উৎসর্গকারীর দুঃখ-কষ্ট থাকতে নেই, এমনটাই যেন বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন— ‘কোনো ব্যথাই আমাকে দুঃখ দিতে পারে না এবং কোনো আঘাতই আমাকে ব্যথা দিতে পারে না।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৭, পৃষ্ঠা ১১৪)।
সংগ্রামের ডাক দিয়ে বঙ্গবন্ধু বসে থাকেননি—বাংলার পথে প্রান্তরে ছুটে বেড়িয়েছেন জনমত তৈরির লক্ষ্যে, আবার অন্যায়ের প্রতিবাদ করে অসংখ্যবার গিয়েছেন জেলে। বঙ্গবন্ধু তার ৫৪ বছরের জীবনের ৪ হাজার ৬৮২ দিন জেল কাটিয়েছিলেন আর স্বাধীন দেশে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় হত্যার শিকার হয়েছিলেন। সর্বাবস্হায় তিনি প্রস্তুত ছিলেন সর্বোচ্চ ত্যাগের। ১৯৬৭ সালে কারাগারে বন্দি থাকাকালীন তার একটি মন্তব্য যেন সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রস্তুতির কথাই ব্যক্ত করে—‘...১১টা মামলা চিন্তা করে কী হবে। গা ভাসাইয়া দিয়াছি। সাগরে শয়ন যার শিশিরে কী ভয় তার।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৭, পৃষ্ঠা ২০৮)।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন নির্ভীক, শত্রুর ভয়ে কখনো আত্মগোপন করেননি। তাই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে বাড়িতেই রয়ে গিয়েছিলেন মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে। বঙ্গবন্ধু ঢাকার সার্বিক অবস্থা জেনেও নিজের নিরাপত্তার জন্যে বিচলিত হননি বরং বলেছেন— ‘আমি বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে হানাদাররা আমার জন্যে ঢাকা শহরের সকল লোককে হত্যা করবে। আমার জন্যে আমার জনগণের জীবন যাক এটা আমি চাই না’ (ড. মোহাম্মদ হাননান, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, ৪র্থ খণ্ড, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা)। মাঝরাতে প্রবল গুলি উপেক্ষা করে ধানমন্ডি ৩২ নং বাসার দোতলা থেকে নিচে নেমে বজ্রকণ্ঠে পাকিস্তানি সেনাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন— ‘স্টপ দিস ননসেন্স। হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?’ (খন্দকার মোজাম্মেল হক, ‘যেভাবে মুজিব হলেন বঙ্গবন্ধু ও জাতির জনক’, কবির চৌধুরী সম্পাদিত, বঙ্গবন্ধু জননায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক, অন্বেষা প্রকাশন, পৃষ্ঠা ১২৮)।
বঙ্গবন্ধুর সাহস, শত্রুর কাছে নতি স্বীকার না করার দৃঢ়তা এবং বাংলার সাধারণ মানুষের প্রতি তার টান প্রকাশ পেয়েছে বারংবার। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেই তিনি চলে যান রেসকোর্স ময়দানে অপেক্ষমাণ জনতার কাছে। সেখানে গিয়ে তিনি বলেন—‘ইয়াহিয়া খান আমার ফাঁসির হুকুম দিয়েছিলেন...আমি, ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের কাছে নতি স্বীকার করব না। ফাঁসির মঞ্চে যাবার আগে আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। তাদের আরো বলেছি, তোমরা মারলে ক্ষতি নাই। কিন্তু আমার লাশ বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও।’ (ড. আতিউর রহমান, বঙ্গবন্ধুর নান্দনিক ভাবনা, বঙ্গবন্ধু :জননায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক, কবীর চৌধুরী সম্পাদিত, অন্বেষা, ২০১০, পৃষ্ঠা ৪৩৩)।
মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব আজীবন মৃত্যুকে পরোয়া করেননি। তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বক্তব্যে তা প্রতীয়মান হয়েছে অসংখ্যবার। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা তাকে বিচলিত করতে পারেনি, কোনো ভয় তাকে ঠেকাতে পারেনি মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্য থেকে। কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে তিনি লিখেছেন—‘‘বুঝতে পারলাম আরো যে ছয়-সাতটা বক্তৃতার মামলা আছে, সব মামলাই নিচের কোর্টে আমাকে সাজা দিবে। শুধু মনে মনে বললামু
‘বিপদে মোরে রক্ষা করো
এ নহে মোর প্রার্থনা,
বিপদে আমি না যেন করি ভয়,’
কবিগুরুর এই কথাটা আমার মনে পড়ল।” (শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৭, পৃষ্ঠা ২৩০-২৩১)।
এই নির্ভীক, শোষিতের পক্ষের মানুষটিই যে কত বিনয়ী ছিলেন তা তার আত্মজীবনী পড়লেই অনুমেয় হয়। বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব যখন জেলগেটে খাতা নিয়ে গিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকে তার আত্মজীবনী লিখতে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে তখন বঙ্গবন্ধু কী বিনয়ের সঙ্গেই বলেছেন—‘লিখতে যে পারি না; আর এমন কী করেছি যা লেখা যায়।...শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্যে সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউপিএল লি., ঢাকা, ২০১২, পৃষ্ঠা ১)। শুধু দেশ আর দেশের মানুষকে ভালোবেসে জীবনের সুবর্ণ দিনগুলো জেলখানায় কাটিয়ে কিংবা স্ত্রী-সন্তানদের বঞ্চিত করেও বঙ্গবন্ধুর কোনো আক্ষেপ ছিল না বরং এই মহান ত্যাগকে তিনি ‘এইটুকু ত্যাগ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, যা তার মহানুভবতা আর বিরল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকেই তুলে ধরে।
বঙ্গবন্ধুর বিনয়ী ও তার নিরহংকারী সত্তার পরিচয় পাওয়া যায় ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইটিতে। যখন সাংহাইয়ের এক সেলুনওয়ালা আলাপচারিতার সময় তার পরিচয় জানতে চাইলেন, তখন বঙ্গবন্ধু স্বগোক্তি করলেন—‘আমার আবার পরিচয়? পথে পথে ঘুরে বেড়াই, বক্তৃতা করে বেড়াই। আর মাঝে মাঝে সরকারের দয়ায় জেলখানায় পড়ে খোদা ও রসুলের নাম নেবার সুযোগ পাই। এই তো আমার পরিচয়।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, আমার দেখা নয়াচীন, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০২০, পৃষ্ঠা ৭৩)। শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে তার ভূমিকা তার রাজনৈতিক পদবি বা বাঙালির ভাষা আন্দোলনে তার অবদান তাকে দাম্ভিক করেনি একবিন্দুও। মহাকাব্যের নায়কেরা বুঝি এমনই হয়, নির্মোহ, নির্ভীক, সত্যান্বেষী ও বিনয়ী।
একজন জাতীয় নেতা, কিন্তু কী অনাড়ম্বর তার জীবনযাপন! বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন তার ব্যক্তিগত যাপিত জীবনের মধ্যে দিয়েও প্রকাশিত হয়। ১৯৬৭ সালের ১৭ মার্চ সংবাদপত্রে তার জন্মদিন পালনের সংবাদ পড়ে নিজেকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন—‘আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস। আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনো দিন নিজে পালন করি নাই—বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটি উপহার দিয়ে থাকত’। (শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৭, পৃষ্ঠা ২০৯)। পূর্ব পাকিস্তানের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যে যে মহাননেতা জীবনের সব আয়োজন দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন, তার কাছে হয়তো তার জন্মদিনের আড়ম্বর খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কিন্তু বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামের যে মহাকাব্য তিনি রচিত করেছেন, সেই মহাকাব্যের রচয়িতা ও নায়কের জন্মদিনে প্রতিটি দেশপ্রেমিক বাঙালি প্রণতি জানায়।
বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস, আত্মোপলব্ধি এবং তার উচ্চারিত কথার মধ্যে কোনো তফাৎ ছিল না। তার সাহসের উৎস ছিল বাংলার মানুষের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা আর বিশ্বাস। যখন বিশ্বাসঘাতকেরা ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে তার পরিবারসহ নৃশংসভাবে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তার বাড়িতে আক্রমণ করে, তখনো বঙ্গবন্ধু আত্মগোপন করেননি বরং নির্ভীকচিত্তে জানতে চেয়েছিলেন ঘাতকদের কাছে, তারা কী চায়? মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ঘাতকের বন্দুকের সামনে মাথা উঁচু করেই দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, তাই গুলি পিঠে নয়, তার সেই বুকেই বিঁধেছিল, যে বুকে তিনি বাংলার মানুষের জন্য অপার-অসীম ভালোবাসা আর সহমর্মিতা পোষণ করতেন। বঙ্গবন্ধুর অসীম সাহস, সহজ জীবনদর্শন আর মানুষের জন্যে নিখাদ টান তাকে বাঙালিদের হৃদয়ে চিরদিনের জন্যে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা ঘাতকের নির্মম বুলেট কিংবা কোনো ষড়যন্ত্র মলিন করতে পারেনি। মৃত্যুঞ্জয়ী এই মহান নেতার জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা আর অকৃত্রিম ভালোবাসা।
লেখক: গবেষক ও সমাজকর্মী
