হে পিতা, ‘তুমি বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাস, আমি তোমাকে ভালোবাসব’ অটোগ্রাফ পড়ে আমি আপনার প্রতি প্রথম অনুরুক্ত হই। তখন ‘বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারণ করা ছিল এদেশে এক প্রকার নিষিদ্ধ। সাহসী বুকে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়ে আমরা হতাম গর্বিত।
বঙ্গবন্ধু, আপনি রাজনীতির অমর কবি। সময়ের প্রভাবশালী নিয়ামক, কিংবদন্তি এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাঙালির মুক্তির দিশারী। আপনার নান্দনিক ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে দৃঢ় তর্জনী হেলনে, কথায়, ব্যবহারে এবং কালজয়ী বক্তৃতা ও ঘটনায়। বাঙালি শত শত বছর ধরে যে স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনেছে, সংগ্রাম করেছে, রক্ত দিয়েছে এবং তার ফলে স্বাধীনতার যে প্রত্যাশাটি উন্মুখ হয়ে উঠেছে, আপনি তাকে ভাষা দিয়েছেন। সে ভাষারই অনন্য ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণ।
প্রিয় মুজিব, আপনার রাজনীতির প্রেরণা এসেছিল সাধারণ মানুষের কল্যাণ কামনা থেকে, আর্থসামাজিক উন্নয়নের চিন্তা থেকে। বাঙালির ক্ষোভ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, অপমান, জেদ, অহং, সংযম, স্বপ্ন, প্রতিরোধ, সংকল্প—সবকিছুই সমন্বিতভাবে বেজে উঠত আপনার আচার-আচরণ, চলন-বলন ও কর্মে। আপনার ভাবভঙ্গি ও চিন্তা-চেতনায় ফুটে উঠত বাঙালির সুখ-শান্তি ও মুক্তির দর্শন। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ৭ কোটি মানুষের মনের ভাব-ভাষা ছিল আপনার নখদর্পণে। আপনি প্রত্যহ, জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত দেশ ও দেশবাসীর প্রতি আত্মনিবেদনে উন্মুখ ও অবিচল থাকতেন। আপনি, বারবার প্রায় মন্ত্রোচ্চারণের মতো বলেছেন, আমার দেশের জনসাধারণকে আমি ভালোবাসি, তারাও ভালোবাসে আমাকে। এই বাক্য উচ্চারণের সময় গর্বে স্ফীত হতো আপনার বুক।
পিতা, আপনিই একমাত্র বাঙালি—বাংলার হাজার বছরের আশা-আকাঙ্ক্ষা, বৈষম্য-বিক্ষোভ ও আবহমান ঐতিহ্যকে নিজের চেতনায় আত্মস্থ করেছেন। স্বদেশকে আপনার মধ্যেই উপলব্ধি করেছে এ দেশের মানুষ। বাঙালি জাতির ইতিহাসে আপনিই সেই মহীরূহ, যিনি বাঙালির মুক্তির স্বপ্ন দেখেছেন, বাঙালিকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথকাঠামো তৈরি করেছেন এবং সেই কাঠামোর আলোকে ব্যক্তি-জাতি-রাষ্ট্র ও জনগণকে শানিত করেছেন। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারায় মুজিব ভাই ও শেখ সাহেব থেকে আপনি হয়েছেন বঙ্গবন্ধু, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতির পিতা, বিশ্বের শোষিত মানুষের মুক্তির কান্ডারি এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। আপনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা দিয়েছেন। আপনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা।
বঙ্গবন্ধু, আপনি বিশাল হৃদয়ের অধিকারী। আপনার সমগ্রজীবনই ত্যাগ ও উদারতায় পরিপূর্ণ। আপনার সব কর্মে, সব পদক্ষেপেই মহানুভবতার দৃষ্টান্ত। বাঙালির মুক্তির জন্য নিজের জীবনের অধিকাংশ সময়ই আপনি কারগারে কাটিয়েছেন। আপনি বুকফাটা আর্তনাদ-অন্তর্দহনেও নিজের সুখ-দুঃখ, আবেগ-আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করেননি—বারবার সুযোগ পেয়েও ক্ষমতার চেয়ারে বসেননি। আপনি নিজের শিক্ষাজীবন নষ্ট করেছেন বাঙালির খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার ও দাবি আদায়ের সংগ্রামে। আপনি নিজের নামে তৈরি করা ফলক মুছেও অঙ্কন করেছেন শহিদের স্মৃতি। ভৈরবের শহিদ হাবিলদার রেলওয়ে সেতুর নাম তার জীবন্ত স্মারক। আপনি যে কোনো বাঙালির স্বীকৃতিকে আপনার স্বীকৃতি মনে করতেন। বাংলার মানুষও স্বদেশ ও দেশপ্রেমকে আপনার মধ্যে উপলব্ধি করেছে। ৭ কোটি মানুষের পরিবারের সবাই ছিল আপনার স্বজন, আপনজন, আত্মার আত্মীয়। আপনি ছিলেন সেই পরিবারের প্রধান।
হে পিতা, এদেশের জনগণ আজও লালন করে—বঙ্গবন্ধু, বাঙালি ও বাংলাদেশ অভিন্ন, মুজিব মানে বাঙালি সমাজের বৃহত্তর ঐক্যের প্রতীক। আপনার বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতিটি স্তরেই রয়েছে সুখী-সমৃদ্ধ মানবিক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। আপনিই আমাদের কালোত্তীর্ণ মুক্তি-দর্শনের পথ। যদিও আজ আমরা বঞ্চিত আপনার স্নেহ, সান্নিধ্য ও নেতৃত্বে থেকে। তবুও আপনার নির্দেশনা, স্মারক, গ্রন্থ, ভাষণ ও কর্ম আমাদের মুক্তির পথ দেখায়। বাস্তবে, আপনাকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি, প্রতিক্ষণে আপনার আদর্শ অনুভবে রাখতে পারিনি। এখন প্রায় সকলেই আপনার প্রশংসায় মুখর হলেও অন্তরে অনেকেই আপনার আদর্শকে লালন করতে পারছে না। পিতা, আপামর বাঙালি ভুলেনি, ভুলবে না কোনো দিন আগস্টের সেই কালরাত্রির কথা। বাঙালি ভুলেনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারণেই নষ্ট, ভণ্ড, শয়তান, নরপিশাচদের আঘাতের কথা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ১৭ই মার্চ ১৯২০ সালে আপনার জন্মদিন। আপনার জন্মদিন মানে বাঙালি-বাংলাদেশের আত্মপরিচয়, মাথা উঁচু করে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলার দিন। আমরা, প্রাণের উল্লাসে মেতেছি। স্বাধীন বাংলার আকাশে-বাতাসে আপনার জয়ধ্বনি ছড়িয়েছি। আমরা পালন করছি বাঙালি জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের ভাষণে আপনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘...হে বিশ্বকবি তুমি আজ জীবিত থাকলে বাঙালির বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে নতুন কবিতা সৃষ্টি করতে।’ বাঙালি উন্নত জীবনের অধিকারী হোক, বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক এই ছিল আপনার আজীবন কামনা। আপনি জেনে আনন্দিত হবেন, আপনার জ্যেষ্ঠ কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্ভাবনী নেতৃত্বে মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলা বাংলাদেশের গদ্য-পদ্য রচনা করে চলেছে অযুত-নিযুত বাঙালি, বিশ্বের স্বনামধন্য নেতৃত্ব-ব্যক্তিত্ব ও গবেষণা সংস্থা।
জাতির পিতা, আপনার স্বপ্নের সোনার বাংলার মানুষ আজ পেট ভরে ভাত খায়, উত্সবে নতুন জামা-কাপড় পরে। আপনার বাংলাদেশ মাছ, চাল অনেক পণ্যদ্রব্য রপ্তানি করে। আপনার সোনার ছেলেরা আজ ক্রিকেট খেলে, বিশ্বকাপ মাতিয়ে বেড়ায়। আপনার প্রাণপ্রিয় বাংলা ভাষা আজ বিশ্বস্বীকৃত। আপনার প্রাণের জাতীয় সংগীত আজ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীত। আপনার সেই পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেতু। আপনি একটি বার তাকিয়ে দেখুন। বিশ্ব আপনাকে কতটা ভালোবাসে। কতটা মহান আনন্দ-চিত্তে আপনার জন্মবার্ষিকী পালন করছে।
বঙ্গবন্ধু, আপনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, মুক্তির কান্ডারি। আপনি আছেন, আমাদের সুখ-দুঃখ, উত্সাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দের ক্ষণে। বাঙালির হৃদয়ে, মননে, চেতনা ও মুক্তির দর্শনে। যত দিন যাচ্ছে ততই শানিত হচ্ছে আপনার লড়াই-সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতীক্ষার ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের সব পঙ্তি, সব পাতা, সব অধ্যায়, সব খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের নাম শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের চূড়ান্ত মুক্তি ও দর্শনের মহানায়কের নাম জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। ‘সোনার বাংলা’ গড়ার পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব ও মতবাদের নাম মুজিববাদ। জন্মদিনে সশ্রদ্ধ শ্রদ্ধা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
লেখক: শিক্ষা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ
