এক জ্যোতির্ময় নক্ষত্রের আবির্ভাব 

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২২, ০৮:০৫

১৭ই মার্চ এ অঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। বাঙালির শাশ্বত জীবনের বৈশিষ্ট্যকে ভবিতব্য সম্পর্কে রাঙিয়ে দেবার সূচনা ঘটেছিল ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ। এ যেন সৃষ্টিকর্তার অমোঘ বিধান। কে জানত ইতিহাসের মহানায়ক অধিকার হারা বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার ত্রাণকর্তা এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করবে? 

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাইগার নদীর তীরে ছোট একটি সাজানো গোছানো গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। নদীটি তদানীন্তন প্রমত্তা নদী মধুমতীতে মিশে গভীর বন্ধুত্বে আবদ্ধ হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে গোপালগঞ্জ ছিল ফরিদপুর জেলার একটি থানা শহর। পাকিস্তান আমলে মহকুমার মর্যাদা পায়। বর্তমানে জেলা। শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান টুঙ্গিপাড়ার। আনুমানিক ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে একটি পরিবার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত নদীবিধৌত গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বসতি স্থাপন করে। কালের প্রবাহে সেই পরিবার বংশানুক্রমিক মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। পরিবারটি শেখ পরিবার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের ব্যবসা বাণিজ্য গড়ে উঠে কলকাতা কেন্দ্রিক। তখনকার সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল জটিল। নৌপথই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। টুঙ্গিপাড়া গ্রামটিতে অসংখ্য অনাবাদি জমি ছিল। শেখ পরিবারের উত্সাহ প্রেরণাদীপ্ত হয়ে গ্রামের কৃষকগণ ব্যাপকভাবে চাষাবাদ করে টুঙ্গিপাড়াকে একটি সমৃদ্ধিশালী গ্রামে পরিণত করে। শেখ পরিবার হয়ে উঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবার। শেখ লুত্ফর রহমান অত্যন্ত ধার্মিক ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গ্রামে খ্যাতি অর্জন করেন। লুত্ফর রহমানের স্ত্রী সায়রা খাতুন। শেখ লুত্ফর রহমান ও সায়রা খাতুন দম্পতির ঘর আলো করে জন্ম নেওয়া এক মহাপুরুষ আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

পারিবারিকভাবে আদুরে ডাক নাম ছিল খোকা। শেখ মুজিবের ছোটবেলা কেটেছে ছবির মতো টুঙ্গিপাড়া গ্রামেই। তাদের পূর্ব পুরুষের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শেখ মুজিবের প্রাথমিক শিক্ষার হাতে খড়ি। শৈশবকাল থেকেই শেখ মুজিব ছিলেন একদিকে যেমন খুবই চঞ্চল আবার অন্যদিকে পরম মানবিক। গ্রামঘেঁষা নদীতে ঝাঁপ দেওয়া পশুপাখিকে আদর করা মানুষকে ভালোবাসা ছিল তার ছোটবেলার স্বভাব। একেবারে কাদামটির সঙ্গে ছিল তার সম্পর্ক। ছিপছিপে রোগা গড়নের শিশু শেখ মুজিব বাড়িতে রাখা মৌলভী সাহেবের কাছে পড়াশোনা করতেন। এবং তার কাছে আরবি শিখতেন। এলাকায় সম্ভান্ত পরিবার হিসেবে শেখ পরিবারের তদানীন্তন সামর্থ্য ছিল ঈর্ষণীয়। তাই ইংরেজি ও অন্যান্য বিষয় শিক্ষার জন্যও গৃহশিক্ষক ছিল। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্ষাকালে নৌকা করে আসা-যাওয়া করত শিক্ষার্থীরা। বর্ষাকালে একদা স্কুল থেকে ফেরার পথে নৌকাডুবি ঘটে। ছোট্ট শেখ মুজিব পানিতে ডুবে যায়। সামান্য সাঁতার জানা মুজিব বেঁচে যায়। এর পর থেকে তাকে তার স্নেহময়ী জননী আর ঐ স্কুলে যেতে দেননি। সকলের চোখের মণি আদরের দুলাল, তার সামান্য কষ্ট যেন পরিবারের সকলেরই কষ্ট। মুজিবের পিতা শেখ লুত্ফর রহমানের কর্মস্থল গোপালগঞ্জের মিশনারি স্কুলে শেখ মুজিবকে ভর্তি করানো হয়। এখানেই পড়ালেখা শুরু করেন। কিছুদিনের জন্য শেখ লুত্ফর রহমান মাদারীপুরে বদলি হয়ে গেলে শেখ মুজিবকে মাদারীপুরের এক স্কুলে পড়তে হয়। কিছু দিন পর আবার পুনরায় গোপালগঞ্জেই ফিরে আসেন। মোদ্দাকথা শৈশবকালের বেশির ভাগ সময় গোপালগঞ্জেই কাটে। 
দাদা-দাদি পরিবারের সকলে আদর করে খোকা বলে ডাকত তবে গ্রামবাসী ও এলাকার লোকজনের কাছে মুজিব ছিলেন সবার প্রিয় ‘মিয়া ভাই’। গ্রামের সহজ সরল মানুষের সঙ্গে তিনি খুব সহজভাবে মিশে যেতেন। এলাকার মুরব্বি শ্রেণির লোকদের প্রতি ছিল প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, সমবয়সি ও ছোটদের প্রতি ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা। মানুষের দুঃখ কষ্টে মুজিব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ত। কীভাবে মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘব করা যায় এমন চিন্তা করত। জানা যায় নিজের পরনের চাদর, বই খাতা অসহায়দের দান করে দিতেন। পরবর্তী সময়ে আবার কিনে নিতেন। রোদ বৃষ্টি নিবারণের জন্য ছাতাটিও তিনি দিয়ে দিতেন অসহায় মানুষকে। এমন অসংখ্য মানবিক উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করেছেন ছোটবেলাতেই। আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন ভীষণভাবে প্রতিবাদী। তিনি খুবই অধিকার সচেতন মানুষ ছিলেন। গোপালগঞ্জের স্কুল মাস্টার একটা সংগঠন গড়ে তুলেন। সেই সংগঠনের ব্যাপারে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান, চাল, টাকা, জোগাড় করে গরিব-মেধাবী শিক্ষার্থীদের সাহায্য করা হতো। শেখ মুজিব উক্ত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে জনসেবার কাজে যোগ দেন। জনসেবার কাজে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। তার অমায়িক ব্যবহারে মানুষ খুশি হয়ে তাকে নানাভাবে সহায়তা করত। এসব কাজে পরিবারে কেউ তাকে বাধা দিতেন না বরঞ্চ উত্সাহ দিতেন। খুবই মুক্ত পরিবেশে শেখ মুজিব বিকশিত হন। কৈশরে তিনি যখন গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলের ছাত্র তখন যুক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে এম ফজলুল হক গোপালগঞ্জের সফরে এসে স্কুল পরিদর্শন করেন। শেখ মুজিব মুখ্যমন্ত্রীর কাছে স্কুল ঘরে বৃষ্টির পানি পড়ার অভিযোগ তুলে ধরেন এবং তা মেরামত করার অঙ্গীকার আদায় করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মূলত তখন থেকেই তার নেতৃত্বের সূচনা। সাহসী কিশোর মুজিবের কথা শেরে বাংলাকেও আকৃষ্ট করে।

গোপালগঞ্জ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতার ইসলামিক কলেজে ভর্তি হন। সেখানে বেকার হোস্টেলে তিনি থাকতেন। এ সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শ লাভ করেন। তখন হলওয়ে মনুমেন্ট আন্দোলন চলছিল। মুজিব সেই আন্দোলনে জড়িয়ে যান। তার রাজনীতির যাত্রা এখান থেকেই। ১৯৪৬ সালে তিনি বিএ পাশ করেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরাজদের কাছ থেকে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে ভারতবর্ষ বিভক্তির মাধ্যমে। ভারত-পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। দেশ ভাগের আগে ১৯৪৬ সালেই হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সংঘটিত হয়। দাঙ্গার সময় শেখ মুজিব জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঙ্গাদমনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মানবতাবাদী শেখ মুজিব মানুষের মধ্যে কোন ভেদনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করেছেন, পারিবারিক ঐতিহ্যগত কারণেই। ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি কখনো পিছপা হননি। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। সে সময় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলন চলছিল। তাদের ন্যায়সংগত আন্দোলনে মুজিব সমর্থন দেন এবং তিনি নিজেও সক্রিয় হন আন্দোলনে। আন্দোলনকারীরা সচিবালয়ে অবস্থান ধর্মঘট পালন করেন। মুজিব ধর্মঘটে যোগ দেন। ন্যায়সংগত জ্বালাময়ী বক্তব্য দিলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। তিনি গ্রেফতার হন। কয়েকদিন পর আবার মুক্তিলাভ করেন। এভাবে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিয়ে অসংখ্যবার গ্রেফতার হন। তিনি ছিলেন ব্যাপক কর্মকুশলী। তার কর্মগুণ ও যোগ্যতাই তাকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নিয়ে আসেন। এক সম্মোহনী শক্তির অধিকারী ছিলেন। সারা বাংলার মানুষের শোষণ মুক্তির চিন্তা গড়ে উঠে মুজিবকে ঘিরে।

মানব সভ্যতা কীভাবে বিকশিত হবে, রাষ্ট্রনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, শিক্ষা সংস্কৃতি, কৃষি সকল ক্ষেত্রেই মুজিবের দৃষ্টি নিবন্ধিত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনৈতিক অধিকার ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়। তার এই বিশ্বাসকে তিনি সুরক্ষিত রেখে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলেন। সে সময় তিনি লক্ষ্য করেছেন পাকিস্তানি সমাজ আত্মপ্রতিষ্ঠার রাজনীতি দিয়ে ভরা, সেখানে যেন ধর্ম, বিদ্যা ও জ্ঞানের কোন স্থান নেই। এ অবস্থায় শান্তির ভাবনা হবে নিরর্থক। তাই তিনি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার আন্দোলন শক্তিশালী করেন। রাজনৈতিক নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে মুজিব হয়ে উঠেন কিংবদন্তি রাজনীতির মহানায়ক। একটি কথা জানা যায় যে, ছোটবেলায় মুজিবের দাদা মুজিবের মাকে বলেন ‘মা সায়রা তোর ছেলের নাম এমন রাখলাম যে নাম জগত্ জোড়া খ্যাত হবে।’ দাদার আশীর্বাদ মুজিবকে সত্যি বিশ্বখ্যাতি এনে দেয়। শেখ মুজিবের সংগ্রামী জীবনের সফল পরিণতি লাভ করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের মাধ্যমে। তিনি হয়ে যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির পিতা। তার জন্ম না হলে আমরা হয়তো একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতাম না। তার স্বপ্নের সোনার বাংলা তারই কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে যাচ্ছে। আমাদের গৌরব গাঁথা ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়েছে তারই জন্মের ফলে। ১৯৭৫ সালে ঘাতকরা তাকে সপরিবারে হত্যা করলেও তার আদর্শ হত্যা করতে পারেনি। তিনি চিরন্তন ক্ষণজন্মা এক মহাপুরুষ। এমন মহাপুরুষের মৃত্যু হতে পারে না। তার শুভ জন্মদিনে অবিস্মরণীয় জীবন্ত মহাপুরুষের হাতছানিতে গোটা বাঙালি উচ্ছ্বসিত। জয় জাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: রাজনীতিক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন