বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এই যুদ্ধ শুধু সামরিক খাতেই সীমিত থাকবে না, বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে এই যুদ্ধের প্রভাব হবে সবচেয়ে ক্ষতিকর। তাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই হবে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি এখন পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) বলছে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এখন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
সংস্হাটি বলছে, উত্পাদন হ্রাসের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে সরবরাহের সংকট চলছে, উত্পাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে যে মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, তা গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যান্য বৃহৎ অর্থনীতির অবস্হাও অনেকটা একই রকম। সানেম বলছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরো (বিবিএস) যে পদ্ধতিতে মূল্যস্ফীতি নিরূপণ করে, তা সঠিক নয়। কাজেই বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির প্রদর্শিত হার যৌক্তিক নয়। অবশ্য বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির ওপর আন্তর্জাতিক প্রভাব যতটা না কার্যকর, তার চেয়ে স্থানীয় উপকরণ বেশি প্রভাব বিস্তার করে। সানেম তাদের মূল্যায়নে বলেছে, বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ প্রকৃত যে খাদ্যদ্রব্যে মূল্যস্ফীতির মুখে পড়েছে, তা সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিভাত হচ্ছে না।
দরিদ্র মানুষের ব্যয়ের বেশির ভাগ খাদ্যের পেছনে যায় বলে তাদের পক্ষে বিকল্প ব্যবস্থায় খাদ্য খাতে ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না। সংস্হাটি তাদের গবেষণা প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, শহরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের মোট খরচের ৬১ দশমিক ৩১ শতাংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। আর গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার ৬৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বিবিএস এই খাতে যে হিসাব প্রদান করে, সানেমের হিসাবের চেয়ে তা অনেক কম। বিবিএসের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের ব্যয়ের ৪৫ দশমিক ১৭ শতাংশ খাদ্য খাতে ব্যয় করে। আর গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের ব্যয়ের ৫৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ খাদ্য খাতে ব্যয় করে। সানেমের প্রাক্কলনে ফেব্র‚য়ারি মাসে শহর ও গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্যে মূল্যস্ফীতি পাওয়া গেছে যথাক্রমে ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ ও ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। জানুয়ারি মাসে শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ ও ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১ দশমিক ১১ শতাংশ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি হয়েছে শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরো অবশ্য সানেমের দেওয়া মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে? দিনে দিনেই টিসিবির ট্রাকের পেছনে মূল্যস্ফীতির আঘাতে জর্জরিত মানুষের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। করোনার প্রভাব কমে আসার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বেশির ভাগ দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়ায় সেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া আবারও থমকে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকায় পরিস্হিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৩৭ মার্কিন ডলারের নিচে নেমে এসেছিল। সেই জ্বালানি তেল কিছুদিন আগে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। সেই সময় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের (ডিজেলও কেরোসিন) মূল্য ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। পরিবহন মালিকেরা তাত্ক্ষণিকভাবে পরিবহন ভাড়া সাড়ে ২২ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছেন। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিটি পণ্যের পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ফলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। রাশিয়া কতৃর্ক ইউক্রেন আক্রমণের ফলে পরিস্হিতি আরো জটিল হয়ে পড়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। এই অর্থনৈতিক অবরোধের প্রভাব করোনাকালীন আর্থিক সংকোচনের চেয়ে ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাশিয়ার জিডিপি ৭ শতাংশ সংকুচিত হবে এই অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও তাদের মিত্র দেশগুলো রাশিয়ার ব্যাংক-ব্যবস্থা ও বিভিন্ন সংস্হার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তা দেশটির অর্থনীতির ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
২০২০ সালে করোনার কারণে রুশ অর্থনীতি প্রায় ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়। ২০২১ সালে রাশিয়ার অর্থনীতিতে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করছেন, রাশিয়ার অর্থনৈতিক সংকোচন বিশ্ব অর্থনীতিতে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। কারণ বিশ্ব অর্থনীতিতে রাশিয়ার অবস্হান এখন খুব একটা ভালো নয়। রাশিয়া বর্তমানে বিশ্বের একাদশতম অর্থনৈতিক শক্তি। তাদের জিডিপির আকার হচ্ছে দেড় ট্রিলিয়ন (১ ট্রিলিয়ন সমান ১ লাখ কোটি) মার্কিন ডলার, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ১৪ ভাগের এক ভাগ। তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে রাশিয়ার একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎতম জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ। কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অস্বাভাবিক প্রবণতার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য কয়েকটি দেশ অয়েল এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজকে (ওপেক) জ্বালানি তেলের উত্তোলন বাড়ানোর অনুরোধ জানালেও তারা সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। অনেকের ধারণা, ওপেকের এই সিদ্ধান্েতর পেছনে রাশিয়ার প্রভাব ছিল। রাশিয়া নিজেও সেই সময় জ্বালানি তেলের উত্তোলন বাড়ানোর পক্ষপাতি ছিল না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে ১২০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের মূল্য আরো বৃদ্ধি পাবে, এটা নিশ্চিত করেই বলা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আমাদের মতো দেশের অর্থনীতিতে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে স্থানীয় রপ্তানিকারকগণ বিপাকে পতিত হয়েছে। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা এইচ এম মোক্তার হোসেন জানালেন, এমনিতেই বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছিল। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ছাড়াও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে পরিস্হিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একের পর এক রপ্তানি অর্ডার বাতিল হয়ে যাচ্ছে। কয়েক হাজার কোটি মার্কিন ডলারের অর্ডার ইতিমধ্যে বাতিল অথবা স্হগিত হয়ে গেছে।
তিনি জানালেন, ‘সোঙ্গাচিতা’ নামে ইতালির একটি জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে তৈরি পোশাক নিয়ে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যে পৌঁছে দিত। এতে সময়ের প্রয়োজন হতো ১১ দিন। এতে ব্যয় সাশ্রয় হতো ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। অন্য সাধারণ জাহাজে পণ্য পরিবহনে এক মাসের বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জাহাজের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। ইউক্রেন বন্দরে অবস্হানরত বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’তে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় একজন বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার নিহত হয়েছেন। জাহাজটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ প্রতি বছর রাশিয়ায় ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। যুদ্ধের কারণে এই পণ্য রপ্তানি কমে আসবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যেতে পারে। রাশিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা ‘সুইফট’ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে এসব ব্যাংক আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আর লেনদেন করতে পারবে না। বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার লেনদেনে সমস্যার সৃষ্টি হবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার প্রভাব বাংলাদেশসহ অনেক দেশের ওপরই পড়বে। বাংলাদেশ তার আমদানিকৃত গমের বেশির ভাগই আনে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। যুদ্ধের কারণে এ বছর ইউক্রেনের গম উত্পাদন সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত হবে। মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক গতিতে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। এই অবস্হা বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। কারণ এমনিতেই করোনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি বিপর্যয়কর অবস্হার মধ্যে রয়েছে। ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্রসীমার নিচে চলে গেছে। এদের আবারও পূর্ববর্তী অবস্হানে নিয়ে আসার জন্য ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্হানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে আশাব্যাঞ্জকভাবে। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্হানমূলক, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
অনুত্পাদনশীল খাত জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে আনুপাতিক হারের চেয়ে বেশি অবদান রাখলে তা একটি দেশের জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক উন্নতি হচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে আশানুরূপভাবে। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্হানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। জবলেস গ্রোথ একটি দেশের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আগামী দিনের জন্য আমাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড।
