ইসলামের দৃষ্টিতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২২, ০৯:৫৩

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেড়েই চলেছে। মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। করোনা মহামারির কারণে মানুষের আয় কমে গেছে। অনেক মানুষের চাকরি বা কোনো কাজ নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ায় সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। গরিব ও দুঃখী মানুষের দুঃখ ও দুদর্শা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদিকে বছরের বারো মাসের মধ্যে মুসলিম সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাস হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। এই মাসের প্রতিটি কাজে রয়েছে অগণিত সওয়াব। একটি রাত বিশেষ করে লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতম। আমাদের প্রিয় নবি হজরত মোহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র রজব মাস থেকেই পবিত্র রমজান মাসের প্রস্ততি গ্রহণ করতে বলেছেন। কিন্তু আমাদের বাজারব্যবস্হাপনা এতটাই ত্রুটিপূর্ণ যে শাবান মাসের এই পর্যায়ে এসেও বাজারে অস্থিরতা থামাতে পারছি না।

ইসলাম ক্রয়-বিক্রয়ে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ও পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করলেও স্বার্থপরতা, অন্যায় ও লোভের বশবর্তী হয়ে সম্পদের পাহাড় তৈরি অথবা অন্যের ওপর জুলুম করার সুযোগ প্রদান করেনি। খাদ্যপণ্য ও জনসাধারণের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতাকে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। আমাদের প্রিয় নবি হজরত মোহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পণ্যের মজুতকরণকে কঠোর ও কঠিন ভাষায় নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে লোক ৪০ রাত্রিকাল খাদ্যপণ্য মজুত করে রাখল, সে আল্লাহ থেকে নিঃসম্পর্ক হয়ে গেল এবং আল্লাহও নিঃসম্পর্ক হয়ে গেলেন তার থেকে’ (আহমদ)। তিনি আরো বলেন, ‘পণ্য মজুতকারী ব্যক্তি অত্যন্ত খারাপ লোক হয়ে থাকে। সে যদি শুনতে পায় যে, পণ্যমূল্য কমে গেছে, তাহলে তার খুব খারাপ লাগে। আর যদি শুনতে পায় যে মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তাহলে খুবই উল্লোসিত হয়ে উঠে’ (রাজিন)। অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘বাজারে পণ্য আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত হয় আর পণ্য মজুতকারী হয় অভিশপ্ত’ (ইবনে মাজাহ)।

বাজারের স্বাভাবিক দ্রব্যমূল্যের ওপর কৃত্রিমভাবে হস্তক্ষেপ করতে নিষেধ করার সঙ্গে সঙ্গে মুনাফাখোরি ও ধোঁকাবাজি করতেও স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করেছে ইসলাম। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘মুসলিম জনগণের জন্য পণ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যদি কেউ কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করে, তাহলে আল্লাহ তাআলার অধিকার রয়েছে তিনি কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের ওপর বসাবেন।’ (আহমদ)। ধোঁকাবাজি ও প্রতারণাকে নিষেধ করে রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কোনো পণ্য বিক্রয়ে পণ্যের দোষত্রুটি বলে দেওয়া না হলে হালাল হবে না কারো জন্যই। আর যে তা জানে, কিন্তু জানা সত্ত্বেও যদি না বলে, তবু তা তার জন্য হালাল নয় (বায়হাকি)। বিক্রয়ে বেশি বেশি কিরা-কসম করা নবি করিম (স.)-এর আদৌ পছন্দ নয়। তিনি বলেন, ‘কিরা-কসম দ্বারা পণ্য তো বিক্রয় করা যায়, কিন্তু বরকত পাওয়া যায় না।’ ওজনে কম দেওয়াকে অত্যন্ত কঠিন ভাষায় নিষেধ করে পবিত্র কোরআন মাজিদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তোমরা মাপে পূর্ণমাত্রায় দেবে, যারা মাপে ঘাটতি করে তোমরা তাদের অন্তভু‌র্ক্ত হয়ো না। এবং ওজন করবে সঠিক দাঁড়িপাল্লায়। লোকদের তাদের প্রাপ্য বস্ত্ত কম দেবে না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাবে না।’ (সুরা শু’আরা, আয়াত :১৮১-১৮৩)। অন্য আয়াতে কারিমায় বলা হয়েছে, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে মহাদিবসে! যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ জগত্সমূহের প্রতিপালকের সম্মুখে!’ (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত:১-৬)।

ইসলামে কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করাকে নিষেধ করে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না, তোমরা পরস্পর রাজি হয়ে ব্যবসা করো এবং একে অপরকে হত্যা কোরো না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা-নিসা, আয়াত-২৯)।

সব ধরনের অন্যায় আপরাধকে নিষেধ করে মানুষকে সাধারণভাবে জীবন যাপনে অভ্যস্ত করতে উত্সাহিত করেছে ইসলাম। ব্যবসায় প্রতিযোগিতা ভালো, কিন্তু অত্যধিক মুনাফা, যা অন্যের কষ্টের কারণ হয়, তা নিষেধ করেছে ইসলাম। দালালি, মজুতদারি, প্রতারণা-প্রবঞ্চনা, মুনাফাখোরি ও ধোঁকাবাজির মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করা হারাম ঘোষণা করেছে। একজন মুসলিম হিসেবে এসব নির্দেশনা প্রতিপালন করা আমাদের ওপর অবশ্য কর্তব্য। ব্যবসা করে জাহান্নাম ক্রয় করবেন, নাকি জান্নাত লাভ করবেন—এ সিদ্ধান্ত একজন ব্যবসায়িকে গ্রহণ করতে হবে। তবেই তিনি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবেন।

—লেখক: পির সাহেব, মশুরীখোলা দরবার শরিফ, ঢাকা

ইত্তেফাক/কেকে