ইবসেনের বিশ্বখ্যাত ‘আ ডলস হাউস’ মঞ্চনাটকের একটি দৃশ্য

হেনরিক ইবসেন: স্রোতের বিপরীতে চলা দুঃসাহসী নাট্যকার

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২২, ০২:২৯

বিশ্বখ্যাত নরওয়েজীয় নাট্যকার হেনরিক জোহান ইবসেন ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন প্রথাবিরোধী নাট্যকার ও নাট্যাচার্য। আধুনিক নাটকের জনক হিসেবে তাঁর খ্যাতি বিশ্বব্যাপী। নারী অধিকার ও নারী ব্যক্তিত্বের উন্মেষ তাঁর নাটকের প্রধান উপজীব্য বিষয়। ইবসেন কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা ইউরোপীয় নাট্য ঐতিহ্যের বিপরীতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর নাটকের প্রধান বিষয় ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার স্খলন ও সংকট। প্রথমদিকে শুধু ব্যক্তি মানুষের সংকট ঠাঁই পেলেও পরবর্তীকালে অন্তর্ভুক্ত হয় ইতিহাস ও সমাজকাঠামো। নাটকের মাধ্যমে তিনি প্রচলিত বিমূর্ত বিশ্বাস ও আচারগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানান। যে কথা কেউ বলতে সাহস করেনি, যে সমস্যা মঞ্চে দেখানো প্রায় নিষিদ্ধ ছিল, ইবসেন অসীম সাহসের সঙ্গে তাই মঞ্চে তুলে আনেন।

শৈশবের দিনগুলোতে ইবসেন বই পড়ার পাশাপাশি আঁকাআঁকি এবং জাদুবিদ্যার কৌশল রপ্ত করে সময় কাটাতেন। ১৮৪৯ সালে তিনি প্রথম ‘কাতিলিনা’ নামে একটি নাটক রচনা করেন। নাটকটিতে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের প্রভাব লক্ষণীয়। ১৮৫০ সালে ইবসেন ক্রিস্টিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য পরীক্ষার প্রস্ত্ততি নিতে চলে আসেন ক্রিস্টিয়ানা শহরে। এ পরিবেশ তাঁর ভীষণ পছন্দ হয়। সাহিত্যচর্চার প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠেন ইবসেন। এ সময় তাঁর হাতে আসে গ্রিক নাটকের সম্ভার। নাটকগুলো ইবসেনের সামনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে দেয়। ফলে নাটকের প্রতি ধীরে ধীরে তাঁর অনুরাগ বাড়তে থাকে।

ইবসেন তাঁর পঁয়ত্রিশ বছর পর্যন্ত আটটি নাটক লিখেছেন। তাঁর এ নাট্যকর্মে শৈল্পিক ছোঁয়া থাকলেও পরিণত শিল্পসৃষ্টির প্রস্ফুরণ ঘটেনি বলে অনেক শিল্পবোদ্ধার অভিমত রয়েছে। তাই অনেকটা হতাশ হয়েই ১৮৬২ সালে ইবসেন নরওয়ে থেকে স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়ে ইতালিতে বসবাস করতে শুরু করেন। ইতালিতে বসে লেখেন নাটক ‘ব্র্যান্ড’। একজন যাজকের বিয়োগাত্মক ঘটনা নিয়ে নাটকটি রচিত। সমালোচকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এতদিন পর যেন তাঁর লেখকজীবনের সার্থকতা পেতে শুরু করে। এর ধারবাহিকতায় তিনি পরবর্তীকালে নির্মাণ করেন তাঁর সাড়া জাগানো তিন অঙ্কের নাটক ‘আ ডলস হাউস’। ১৮৭৯ সালে প্রকাশিত হয় নাটকটি এবং ঐ বছরের ২১ ডিসেম্বর বড়দিন উপলক্ষ্যে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনের রয়েল থিয়েটারে প্রথম মঞ্চস্হ হয়।

‘আ ডলস হাউস’ নাটকের মধ্য দিয়ে তিনি তত্কালীন সমাজব্যবস্হার অন্ধকার দিকগুলোকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছেন এবং অপূর্ব শৈলীতে নারীদের অবস্হা ও তাদের অধিকারের কথা তুলে ধরেন। নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্র নোরা নামের একজন নারী। ঊনবিংশ শতাব্দীর এক পরিবারকে কেন্দ্র করে নাটকটি আবর্তিত। পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্হায় একজন নারী কখনোই নিজের মতো করে বাস করতে পারে না, প্রতিনিয়ত তাকে সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলায় আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়। সমাজে তার বিশ্বাস, ভালোবাসা ও সততার কোনো মূল্য নেই। এ নাটকের মধ্য দিয়ে সেই সমাজব্যবস্হার বিরুদ্ধে ইবসেন তীব্র ধিক্কার জানান।

ইবসেনের আগে নাটকে জনজীবন উপস্হাপিত না হয়ে উপেক্ষিত থাকত। তিনি সাধারণ মানুষের কথা বলেছেন, সমাজস্হ অসংগতি ও নারীদের যথাযথভাবে উপস্হাপন করেছেন মুনশিয়ানার সঙ্গে। ফলে তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্ব নাট্যসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারিগর। ইতিহাস থেকে নয়, সমকালীন মানুষের জীবনযাপন ছিল ইবসেনের নাট্যকাহিনির উত্স। ইবসেনকে তাই বলা হয় ইউরোপীয় বাস্তববাদী নাট্যধারার জনক। লক্ষ করলে দেখা যাবে, নোরা চরিত্রের মাধ্যমেই এ বাস্তবতার চূড়ান্ত অভিব্যক্তি ঘটেছিল। নোরা এমনই এক সৃষ্টি, কালের পরম্পরায় যার আবেদন এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি। ‘আ ডলস হাউস’ নাটকের একেবারে শেষে নোরা তার স্বামীর বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়ে সেই যে পথে বেরিয়ে পড়ে, ধরে নেওয়া হয়, সেটাই ছিল নারীমুক্তির সরণি। ইবসেন অবশ্য নিজে একে নারীমুক্তি না বলে ‘মানবমুক্তি’ বলেই উল্লেখ করেছেন।

শিল্পমহল ও নারী সমাজে এ নাটক ছিল তাদের বাধভাঙা আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। অধিকার বঞ্চিত নারীদের মনের আবেগই যেন ব্যক্ত হয়েছে নাটকটির মধ্য দিয়ে। নারী অধিকার আন্দোলনে এ নাটক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ নাটকের সাফল্যধারা তাঁর পরবর্তী নাটকগুলোতেও প্রতিফলিত হয়। ১৮৮১ সালে ‘গোস্টস’ এবং ১৮৮২ সালে ‘অ্যান এনিমি অব দ্য পিপল’ নাটক দুটিও দর্শক ও সুধীমহলে ব্যাপক প্রশংসা পায়। এর পরপরই হেনরিক ইবসেনের সাড়া জাগানো নাটকগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হতে থাকে। ইবসেনের সাড়া জাগানো উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য ওয়াইল্ড ডাক’ (১৮৮৪), ‘রোসমের্শল্ম’ (১৮৮৬), ‘দ্য লেডি ফ্রম দ্য সি’ (১৮৮৮), ‘দ্য মাস্টার বিল্ডার’ (১৮৯২), ‘হোয়েন উই ডেড অ্যাওয়েকেন’ (১৮৯৯)। এ নাটকগুলো ছিল মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী। ১৮৮০ থেকে ১৯২০ সাল—এ দীর্ঘ চল্লিশ বছর ইউরোপের রঙ্গমঞ্চে তাঁর নাটকগুলো প্রদর্শিত হতো সবচেয়ে বেশি।

নাট্যকার হিসেবে ইবসেনের বিশেষ দিক হলো, তিনি তত্কালীন সমাজকে নাট্যকারের দৃষ্টিতে দেখার পাশাপাশি সমালোচকদের দৃষ্টিতেও দেখতেন। ফলে সমাজের মূল্যবোধ ও অসংগতিগুলো সহজেই তাঁর নাটকে উঠে এসেছে। তাঁর সময়ে নাটকের সমাপ্তি হতো সত্যের জয় ও সামাজিক মূল্যবোধের গুণকীর্তনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ইবসেন এ চিরাচরিত প্রথা ভাঙেন। তিনিই প্রথম সমালোচকের দৃষ্টিতে সমাজকে দেখে নাটকের সমাপ্তিতে বৈচিত্র্য আনেন। অর্থাত্ ইবসেনই প্রথম নাট্যকার, যিনি ইউরোপীয় নাট্য ঐতিহ্যের বিপরীত প্রান্েত দাঁড়িয়ে নাটক রচনা করেন। এজন্য তাঁকে মানুষের কথা ও সমালোচকদের তীক্ষ্ণ তীরও হজম করতে হয়েছে।

বিংশ শতকের নাট্যকারদের কাছে তিনি ছিলেন অগ্রদূত, তাদের অনুপ্রেরণা। নাটকের প্রাচীনত্বকে ভেঙে নাটকের গঠনশৈলীতে এনেছেন আধুনিকত্ব, অভিনবত্ব ও সারল্য। এজন্য তাঁকে আধুনিক নাটকের জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়। সংগত কারণে বলা যায়, হেনরিক ইবসেন বাস্তবতাবাদের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ লেখক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার। 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি