ভরা বসন্তে একবার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয় জামিলের। বাড়ি থেকে দক্ষিণ দিকে সে টানা হাঁটতে থাকে। বাড়ির দক্ষিণে কৃষ্ণচূড়াগাছ। লাল ফুলের মুকুলগুলো ফুটতে শুরু করেছে। দিনের বেলা মৌমাছিরা দলবেঁধে আসে মধু খেতে। আসে অনেক পাখিও। তীক্ষ্ণ চঞ্চু ফুলের মুকুলে ঢুকিয়ে চঞ্চল চুম্বনে মধু পান করে। ভ্রমরেরা এ ফুল থেকে ও ফুলে উড়ে যায়। প্রজাপতি রঙিন পাখা মেলে উড়তে থাকে। এমন মধুর দৃশ্য ফেলে রেখে জামিল এগিয়ে চলছে।
তার ছেলেবেলার কৃষ্ণচূড়াগাছটা, যেটি সে জন্মের পর থেকে নিজের বলে জানত, সেটি আজ হাতছাড়া। শুধু গাছটাই নয়। গাছের সীমানা পেরিয়ে আরো অনেকটা ভিটের জায়গা পর্যন্ত চাচাতো ভাইয়েরা দখল করে নিয়েছে। এই তারাই তো, তাদের শৈশবে গলায় গলায় মিশে থাকত। একসঙ্গে দুরন্ত গোল্লাছুট, দাইগ্যা, এক্কাদোক্কা কিংবা হাডুডু খেলার সময় কখনো মনেই হয়নি তারা একদিন আলাদা হয়ে যাবে। কিংবা তারা যে আদৌ আলাদা—এমনটি হয়তো কল্পনাও করেনি। তবু সময় বাড়ে। মানুষের সঙ্গে বাড়ে তাদের আত্মসংঘাত। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে এতিম অসহায় হয়ে মেনে নিতে বাধ্য হয় চাচাতো ভাইদের দৌরাত্ম্য। তারা অন্যাঘ্য, তারা অন্যায়। তবু তাদের পক্ষে লোক আছে কথা বলার। তাদের আছে নিজেদেরও সাহস, নিজেদের লাঠির সংখ্যায়। সুতরাং একা এই জামিল কোথায় যাবে?
সে যায় চেয়ারম্যানের কাছে। চেয়ারম্যান বুঝ দেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘মেনে নেও বাবা। কী করবা, তোমার তো কথা বলার লোক নাই।’
তলে তলে চেয়ারম্যান চাচাতো ভাইদের পক্ষে কাজ করে। এ বিষয়টি জামিলও বোঝে। করবেই বা না কেন? নির্বাচনের দিন তার একটি ভোট নিয়ে সে যখন সংশয়ান্বিত, তখন দপাদপ তার চাচাতো ভাইয়েরা ভোট দেয় চেয়ারম্যানের প্রতীকে। শুধু নিজেদের ভোটই দেয় না। সঙ্গে জামিলের মৃত বাবা-মা, তাদের মৃত বাবা-মা এবং সবশেষে জামিলের হাতকেও টেনেহিঁচড়ে নিয়ে বসিয়ে দেয় ছাপ চেয়ারম্যানের প্রতীকে। জামিল দেখেছে, সেদিন তার কিছুই করার ছিল না। কিছু বলারও ছিল না। বিজয় মিছিলে সে অচ্ছুত্ থেকেছে। বিজয়পরবতীর্ সুযোগ-সুবিধাদি থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। সুতরাং চেয়ারম্যানের ন্যায়বিচারের আশা সে করবে কীভাবে?
বাড়িতে জায়গা-সম্পত্তি তার কম ছিল না। মাঠেও ছিল প্রচুর। প্রথমে চাচার কালে, অর্থাত্ তার বাবার মৃতু্যর পরপর কী এক সম্পত্তি বিষয়ক বাহানা দেখিয়ে চাচা বিক্রি করে দেয় তার ভাগের মাঠের সব সম্পদ। তারপর মাকে অপবাদের মাধ্যমে বাড়িছাড়া করে। কিশোর বয়েসেই জামিল বাবা-মা হারিয়ে শূন্য হয়ে যায়। তবু বেঁচে থাকে। মাছের মায়ের মতো চাচা-চাচাতো ভাইয়েরা তাকে আদরও করে। সে এ আদরের অর্থ জানে না। দুনিয়া সম্পর্কে কঠিন অভিজ্ঞতা হওয়ার সুযোগ থাকলেও এত কঠিন হতে তার মন সায় দেয় না।
‘কী হবে এসব দিয়ে? থাকলে তো আমার চাচাতো ভাইদেরই থাকল, নাকি?’—এমন সব ভাবনা জামিলের। কিন্তু ভাবানারা দিনদিন পালটাতে থাকে। চাচার মৃতু্যর পর চাচাতো ভাইয়েরা আরো আগ্রাসী হতে থাকে। ধীরে ধীরে তার ভিটের দিকে হাত বাড়ায়। ধীরে ধীরে গিলতে থাকে সাপের মুখের ব্যাঙের মতো। জামিলও সহ্য করে যায়। শেষমেষ আর সহ্য করতে পারে না। রুখে দাঁড়ায় একা-ই। চাচাতো ভাইয়েরা তার মাথা ফাটিয়ে দেয়। রক্তাক্ত জামিলকে কেউ হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য থাকে না। এরকম একপাক্ষিক আক্রমণে জামিল নিজের ঘরেই দরজা বন্ধ করে পড়ে থাকে। আবার মিলিয়েও দেয় পাড়া-প্রতিবেশী। ওরা সবাই ওদের পক্ষে। জগতে লাঠির জোর যার বেশি, মানুষেরা তার পক্ষেই কথা বলে। জামিলকেই দোষী করা হয় সালিসে। সে-ই আবার ক্ষমা চায় চাচাতো ভাইয়ের পায়ে ধরে।
এই ঘটনার পর তার আর বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে হয় না। সাধ হয় বাড়িঘর ছেড়ে যেদিকে চোখ যায় সেদিকে উড়ে যেতে। সে পারে না। কী এক ভিটির টান তাকে আঁকড়ে ধরে। বাড়ির দক্ষিণে কৃষ্ণচূড়াগাছটা তাকে রক্তের আগুন জ্বালাতে বলে। জ্বলে উঠতে পারে না জামিল। জ্বলে উঠে কীই বা করবে? উলটো আবার নিজেকে জখম করা ছাড়া তার আর কোনো পরিণতি নেই। ফলে জামিল চুপ থাকে। নিজের ভিটি কামড়ে পড়ে থাকে নিজের ভেতর। মাঝেমধ্যে যায় সুফিয়ার সঙ্গে দেখা করতে।
সুফিয়া এ গাঁয়েরই মেয়ে। চন্দ্র-সূর্য সাক্ষী রেখে তারা দুজন শপথ করে কেউ কাউকে ছেড়ে কোনোদিন যাবে না। কিন্তু জুত করে উঠতে পারে না জামিল। পিতার মৃতু্যর পরে এত এত ঝামেলার ভেতর নিজের অস্তিত্বকেই টিকিয়ে রাখা দায়। সে জায়গায় প্রেম টিকিয়ে রাখা তো চাঁদের বাটিতে সুরা পানের মতো। কিন্তু তবু টিকে থাকে প্রেম। সুফিয়ার মায়া জামিলের সর্বাঙ্গ ঘিরে থাকে। জামিলও শয়নে স্বপনে সুফিয়াকেই প্রার্থনা করে। সেই শৈশব থেকে প্রেম, সেই কৈশোর সময়ের লাজ, সব মিলিয়ে একে অপরকে অভিন্ন ভাবতেই তারা শিখেছে।
কিন্তু গ্রামের মানুষরা তো আর তত বোকা নয়। তারা এমন প্রেম মেনে নেবে কেন? বয়েস হয়েছে ছেলের, বয়েস হয়েছে মেয়েরও। তাছাড়া সুফিয়া হলো পদ্মফুলের পদ্ম, জ্যোত্স্নারও জ্যোত্স্না। এমন রূপসী উর্বশী অপাত্রে লীন হবে, আগ বাড়িয়েই কেউ কেউ অভিভাবকত্ব দেখায়। সুফিয়ার বাবাকে, মাকে, সুযোগ পেলে সুফিয়াকেও দু-চার কথা শোনায় জামিলের নিরীহপনার, সর্বস্বান্ত হবার বিষয়ে। কানে বিষ মেখে সুফিয়া সে কথা এড়িয়ে যায়। কিন্তু একদিন দুদিন, একবছর, দুই বছর, সময় গড়িয়ে যেতে যেতে একসময় সুফিয়ার বাবারও মনে হয়, কী হবে, এই ভালোমানুষি দিয়ে? সর্বোপরি জামিল যেহেতু তার চাচাতো ভাইদের হাতে সবকিছু হারাতে বসেছে, তখন কেন তাকে বর হিসেবে বেছে নেওয়া? লোকের কথায় আমল দেয়, আবার লোকেরাই তাকে যোগ্যপাত্রের সন্ধান দেয়। জামিলের চাচাতো ভাই ইরফান, বিদেশ থেকে এসেছে। সুফিয়াকে স্বর্ণ দিয়ে মুড়িয়ে রাখতে পারবে। কিছুটা ইতস্তত করে সুফিয়ার বাবা।
—না না, জামিলের চোখের সামনে, সুফিয়া ভেতরে ভেতরে পুড়বে খুব। কিন্তু এই ‘না না’ হ্যাঁ হ্যাঁ হতে সময় লাগে না। জামিলের চাচাতো ভাই সতেরো কেজি মিষ্টি নিয়ে সুফিয়াকে দেখতে যায়। কনে দেখা সম্মানী দেয় নগদ দশ হাজার টাকা। সুফিয়ার বাবা টোপ গেলে। কন্যাকে ইরফানের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়। চোখের জলে স্বপ্ন ভিজিয়ে বসন্েতর রঙিন দিনে সুফিয়া আসে ইরফানের ঘরে। ওদিকে জামিলের ঘরের সব রং মুছে যায়। বিবাহের সপ্তম দিনে জামিল সিদ্ধান্ত নেয়—না, আর এ জীবজগত্ নয়।
সবকিছু ছেড়েছুড়ে দেশান্তরি হতে সে গভীর রাতে বাড়ি থেকে বের হয়। কৃষ্ণচূড়াগাছটি পেরোতেই একটি আবছায়া নারীমূর্তি এসে পথ আগলে দাঁড়ায়। সুফিয়া অন্ধকারে জামিলের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে বলে, —আমারে সাথে নিবা না?
