পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহর কালাম, যা সর্বোচ্চ পবিত্র ও মর্যাদাসম্পন্ন। তাই এই পবিত্রতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে কোরআন স্পর্শ ও পাঠ করার জন্য দৈহিক পবিত্রতার শর্তারোপ করা হয়েছে। সর্বযুগের সব আলেম এ কথার ওপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কোরআন শরিফ সরাসরি স্পর্শ করতে পবিত্রতা অর্জন জরুরি। ইমাম নববি ও ইমাম তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘পবিত্র হওয়া ছাড়া কোরআন স্পর্শ করা নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে মতামত দিয়েছেন হজরত আলি (রা.), সা’য়াদ বিন আবি ওয়াক্কাস, আব্দুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) প্রমুখ সাহাবি। অন্য সাহাবিদের এর বিপরীতে কোনো অভিমত নেই। (শরহুল মুহাজ্জব, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮০, মাজমাউল ফাতওয়া খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ২৬৬)
হজরত আবদুল্লাহ বিন আবু বকর বিন হাযম বলেন, রসুল (স.) আমর বিন হাযমের কাছে এই মর্মে পত্র লিখলেন যে, ‘পবিত্র হওয়া ছাড়া কোরআন কেউ স্পর্শ করবে না।’ (মুয়াত্তা মালেক, হাদিস নম্বর ৬৮০, কানযুল উম্মাল, হাদিস নম্বর ২৮৩০, আল-মু’জামুল কাবীর হাদিস নম্বর ১৩২১৭, আল-মু’জামুস সাগীর, হাদিস নম্বর ১১৬২, মিশকাতুল মাসাবীহ্, হাদিস নম্বর ৪৬৫, সুনানে দারমী, হাদিস নম্বর ২২৬৬)। হজরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ কোরআন স্পর্শ করবে না।’ (মাজমাউল ফাওয়ায়েদ, হাদিস নম্বর ১৫১২)। অজু ছাড়া কোরআন স্পর্শ করা যাবে না—এ কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা সুরা ওয়াকিয়ার ৭৯ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘যারা পূত-পবিত্র, তারা ছাড়া অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না।’ সুরা ওয়াকিয়ার ৭৭-৮০ আয়াত পর্যন্ত দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবেন আল্লাহ তাআয়ালা এখানে কী বোঝাতে চেয়েছেন। মহান আল্লাহ বলছেন, ‘নিশ্চয়ই এটা সম্মানিত কোরআন, যা সুরক্ষিত আছে কিতাবে। যারা পূত-পবিত্র তারা ছাড়া অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না। এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।’
সুরা ওয়াকিয়ার ৭৭-৮০ আয়াতের শানেনুযুল কী তা জানলেও আমরা এই আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা থেকে বেঁচে থাকতে পারব। শানেনুযুল হচ্ছে—মক্কার কাফির-মুশরিকরা রসুল (স.)কে গণক, জাদুকর ইত্যাদি বলত। তারা বলে বেড়াত, শয়তান কোরআন নিয়ে এসে রসুলকে পড়ে শিখিয়ে দেয়। তারপর রসুল সেটা অন্যদের জানায় (নাউযুবিল্লাহ)। কাফিরদের এই অবান্তর কথার উত্তর মহান আল্লাহ সুরা ওয়াকিয়ার এই আয়াতগুলোতে এবং সুরা শুয়ারার কয়েকটি আয়াতে দিয়েছেন। সুরা শুয়ারায় আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান এই কোরআনসহ অবতীর্ণ হয়নি। তারা এ কাজের যোগ্য নয় এবং তারা এ কাজের সামর্থ্যও রাখে না। তাদের তো শোনার সুযোগ থেকেও দূরে রাখা হয়েছে।’ (সুরা শুয়ারা, আয়াত ১১০-১১২)
অতএব, আমরা বুঝতে পারছি, লওহে মাহফুজে যে কোরআন সংরক্ষিত আছে, তা দুনিয়ায় অবতীর্ণ হওয়ার পর অপবিত্র অবস্থায় তা স্পর্শ করা যাবে না। সুরা ওয়াকিয়ার ৭৯ নম্বর আয়াতে ‘মুতাহ্হারুন’ শব্দটি নিষ্পাপ এবং অজু-গোসল করে পবিত্র—এ দুটি অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
এজন্য অজু ছাড়া মুখস্থ কোরআন তেলাওয়াতের অনুমতি থাকলেও কোরআনের কপি বা এর আয়াত অংশ স্পর্শ করা যাবে না। আর যদি কোরআনের তাফসির পড়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে অজু ছাড়া সেটা স্পর্শ করা যাবে, তবে অজু করে নেওয়া উত্তম। কেননা, কোরআনের আয়াত স্পর্শ করতে হলে তখন অজুর প্রয়োজন হবে। কারো শরীর অপবিত্র থাকলে ফরজ গোসলের প্রয়োজন হলে তিনি ফরজ গোসল ছাড়া কোরআন বা কোরআনের আয়াত অংশ স্পর্শ করতে পারবেন না। প্রিয়ড অবস্থায় কোরআন তেলাওয়াতের প্রয়োজন হলে নারীরা কোরআন স্পর্শ না করে মুখস্থ পড়তে পারবেন। আল্লাহ আমাদের তার বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন!
লেখক: মুহাদ্দিস, গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা, গোপালগঞ্জ এবং খতিব, উত্তর শাহজাহানপুর, আমতলা জামে মসজিদ, ঢাকা।

