রুশ আগ্রাসন মোকাবিলায় ইউক্রেনকে আরো সামরিক ও মানবিক সহায়তা দিয়ে পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলো। রাশিয়ার ওপর আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা করলেও কিয়েভের আহ্বান অনুযায়ী ইউক্রেনের আকাশ নো-ফ্লাই জোন করা ও রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ব্যাপারে কোনো অঙ্গীকার করেনি তারা। বৃহস্পতিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ন্যাটো, জি-সেভেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের তিনটি শীর্ষ বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত এসেছে। এসব বৈঠকে যোগ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ন্যাটোর বৈঠকের পর দাবি করেন, আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় ন্যাটো অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। রাশিয়াকে সহযোগিতা না দেওয়ার জন্য চীনের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বৈঠক শেষে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোর ওপর হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। ইইউ নেতারা বলেছেন, এ ধরনের যুদ্ধাপরাধ দ্রুত বন্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় দায়ীদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা হবে। ইইউ ইউক্রেনের পাশে আছে এবং সমন্বিতভাবে রাজনৈতিক, আর্থিক, বস্তুগত ও মানবিক সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখবে।
ইইউর সম্মেলনে দেওয়া এক ভার্চুয়াল ভাষণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন থামাকে ইইউ দেরি করে ফেলেছে। আগেই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে হয়তো এই আগ্রাসন হতো না। তিনি ভাষণে ইউক্রেনে রুশ সেনাবাহিনীর তাণ্ডব ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেন। এ সময় তিনি সহায়তার জন্য ইউরোপের দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ইউক্রেনকে দ্রুত ইইউর সদস্যপদ দেওয়ার আহ্বান জানান।
জি৭-এর বৈঠকেও নেতারা দাবি করেন ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধ করছে রাশিয়া। ন্যাটো ও ইইউর মতো শিল্পোন্নত দেশগুলোও ইউক্রেনকে সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ঐ সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার ওপর পূর্ণ বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, আমরা শান্তির কাছাকাছি, জয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। ইউক্রেনকে অবশ্যই শান্তির দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
মারিওপোলের থিয়েটারে রুশ হামলায় নিহত ৩০০!
ইউক্রেনের বন্দর শহর মারিওপোলের একটি থিয়েটারে গত সপ্তাহে চালানো রুশ হামলায় কমপক্ষে ৩০০ জন নিহত হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। ঐ হামলা চালানোর সময় থিয়েটারটিতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। মারিওপোল সিটি কাউন্সিল টেলিগ্রামে লিখেছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী ৯ দিন আগে চালানো রুশ বিমান হামলায় আনুমানিক ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ঐ হামলাকে যুদ্ধাপরাধ বলে আগেই মন্তব্য করেছেন।
বেসামরিক ইউক্রেনীয়দের তুলে নিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া: জাতিসংঘ
বেসামরিক মানুষ হত্যার পাশাপাশি অনেক ইউক্রেনীয় নাগরিককে রুশ সেনারা তুলে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনওএইচআর) কার্যালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, কমপক্ষে ৩৬ বেসামরিক নাগরিককে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে পরিবারকে কোনো ধরনের তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। ইউক্রেনীয়রা বলছেন, দখলে নেওয়া শহরগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় রাশিয়ার বেগ পেতে হচ্ছে। এ কারণেই অপহরণ ও ভীতি প্রদর্শনের পথ বেছে নিয়েছে।
গতকাল ছিল যুদ্ধের ৩০তম দিন
ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন এক মাস পেরিয়েছে। স্থল পথে রুশ বাহিনীর হামলার গতি কমলেও বিমান থেকে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে তারা। গতকাল রুশ সেনারা ডিনিপ্রো শহরের বাইরে ইউক্রেনীয় সামরিক ইউনিটে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজধানী কিয়েভের বাইরের একটি বড় জ্বালানি ডিপোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ দাবি করেছেন একদিনে প্রায় ২০০ রুশ সেনা নিহত হয়েছে। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটার ধারণা, ইউক্রেনে অভিযান শুরুর পর ১৫ হাজারের মতো সেনা হারিয়েছে মস্কো। একই সঙ্গে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে রুশ বাহিনী। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কিয়েভের পূর্বের একটি শহর রুশ সেনাদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করেছে ইউক্রেনীয় সেনারা। ফলে কিয়েভ থেকে আরো দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে রুশ সেনারা।
এদিকে রুশ হামলার মুখে ইউক্রেনে ১ কোটির বেশি মানুষ বাস্ত্তচ্যুত হয়েছে। ইতিমধ্যে ইউক্রেন ছেড়ে গেছেন ৩৬ লাখের মতো মানুষ। বেশির ভাগই আশ্রয় নিয়েছে পোল্যান্ডে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শরণার্থীদের পরিদর্শন ও ইউক্রেনের সঙ্গে সংহতি জানাতে শুক্রবার পোল্যান্ড সফর করেন।
