দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প গঙ্গা কপোতাক্ষ প্রকল্পের (জি কে প্রকল্প) অবস্থা এখন বেহাল। কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ এখন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। লুটপাট হচ্ছে। প্রকল্পের ভাটি এলাকার বিরাট অংশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। চাষিরা সেচ সুবিধা পাচ্ছেন না। এককালের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা এই প্রকল্প এখন দৃশ্যত প্রাণহীন, মৃত।
প্রকল্পের ইতিহাস থেকে জানা যায়, বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও যশোর জেলার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মান ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য ১৯৫৪ সালে এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সেচ, পানি নিষ্কাশন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এই ত্রিমুখী উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়। ১৯৫৫-৫৬ সালে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের এলাকাভুক্ত আছে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ১৩টি উপজেলা। ১৯৭০ সালে সাড়ে ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম পর্যায়ের ও ১৯৮৩ সালে ৫৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শেষ হয়। ১৯৮৩-৯৪ সালে প্রকল্পের পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়। ২১২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৯৯৪ সালে পুনর্বাসনের কাজ শেষ হয়।
১৯৬২ সালে সেচদান শুরু হয়, চাষিরা উচ্চফলনশীন ধান চাষের সঙ্গে পরিচিত হয়। বছরে দুইবার ধান উৎপাদন হতে থাকে। দেশি জাতের পরিবর্তে উচ্চফলনশীল জাতের ধান আবাদের ফলে উৎপাদনের পরিমাণ তিন থেকে চার গুণ বেড়ে যায়। চাষির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়। ভেড়ামারাতে প্রকল্পের প্রধান পাম্প হাউজ নির্মাণ করা হয়। সেচের পানি সরবরাহের জন্য খনন করা হয় ১৯৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের প্রধান সেচ খাল, ৪৬৭ কিলোমিটার দৈর্ঘে্যর শাখা সেচ খাল, ৯৯৫ কিলোমিটার উপশাখা সেচ খাল। এছাড়া ২ হাজার ১৮৪টি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো ও একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়।
সুষ্ঠুভাবে প্রকল্প চালানোর জন্য বিভিন্ন স্থানে ডিভিশন, সাব ডিভিশন ও সেকশন অফিস নির্মাণ করা হয়। আধুনিক চাষাবাদে প্রশিক্ষিত করে তোলার জন্য প্রকল্প এলাকায় ৪৯টি পাকা চাষি ক্লাব ভবনও নির্মাণ করা হয়। গঠন করা হয় সাতটি কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি। ১৯৯৪ সালের পর থেকে প্রকল্প গুটানোর পর্ব শুরু হয়। লোকবল সংকটে পড়ে গোটা প্রকল্প। একের পর এক ডিভিশন, সাব ডিভিশন, সেকশন অফিস পরিত্যক্ত হতে থাকে। এলাকার দুবৃর্ত্ত ও প্রভাবশালীরা লুটপাট শুরু করে। অফিস বাসাবাড়ির জানালা-দরজা চুরি করতে থাকে। গাছগুলো কেটে নিয়ে যায়। নলকূপগুলো উঠিয়ে নিয়ে যায়। রাস্তার ইট, ব্রিজগুলোর রেলিং ভেঙে রড, পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর লোহা লক্কড় চুরি করে নিয়ে যায়। এমনকি এখন অনেক সেচ খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তার ওপর বাড়িঘর নির্মিত হয়েছে। এতে সেচ এলাকা সংকুচিত হয়ে পড়ে। ভাটিতে শৈলকুপা, ঝিনাইদহ, হরিণাকুণ্ডু ও শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চাষিরা সেচের পানি পায় না।
অনেক স্থানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টিং থাকলেও তারা অফিস করেন না। বলতে গেলে সেচ ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। এস-৯ কে সেচ খালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের রাশেদুল হাসান জানান, সেচ খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। আগাছায় পরিপূর্ণ, সেচের পানি আসে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুষ্টিয়ার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ বলেন, বিশাল এলাকা জুড়ে এ প্রকল্প। লোকবলের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, ভেড়ামারার পাম্প হাউজে দুটি প্রধান পাম্প চলছে। পানির অভাব নেই। তিনি বলেন, কতৃর্পক্ষ অপ্রয়োজনীয় স্থাপনাগুলো ও জমি বিক্রি করে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে। তিনি আরো বলেন, প্রকল্পকে কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে ২ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন হলে আবার পুনর্বাসনের কাজ শুরু হবে।
