আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে ম্যাডেলিন অলব্রাইট তার সময়ের জন্য কেবল একজন প্রতাপশালী কূটনীতিক ছিলেন না—তিনি এই সময়ের জন্যও একজন পথপ্রদর্শক ছিলেন। এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দিহান যে, ইতিহাস তাকে নতুন আইডিয়া ও পদ্ধতির উদ্ভাবক হিসেবেও মনে রাখে।
বস্তুত ম্যাডেলিন অলব্রাইট হোয়াইট হাউজের হল থেকে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট পর্যন্ত কতগুলো বাধার প্রাচীর ভেঙেছিলেন—তার জীবনের কৃতিত্বগুলো পড়ার সময় আমার মনে হয়েছে—এমন অর্জনের ট্রাক ধরে রাখা সহজ নয়। অলব্রাইট শুধু ঐতিহাসিকভাবে নারীদের জন্য বন্ধ দরজা ভেঙে দেননি, তিনি এমন স্তরে উন্নীত হওয়ার পথ তৈরি করেছিলেন, যে নারীরা তার আগে এবং পরে এসেছেন—তারা তা কল্পনাও করতে পারেননি।
অলব্রাইট ওয়াশিংটনের একজন স্থানীয় অধিবাসী ছিলেন এবং দেশের রাজধানীকে তিনি তার বাড়ি বানিয়েছিলেন। তিনি ওয়াশিংটন ডিসির জর্জটাউন পাড়ায় থাকতেন এবং ৪০ বছর ধরে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটিতে উইমেন ইন ফরেন সার্ভিস প্রোগ্রামের পরিচালক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ফরেন রিলেশনস কাউন্সিলের পরিচালকও ছিলেন।
কিন্তু আমেরিকান বৈদেশিক নীতির উচ্চতা তৈরির এই কারিগরের পথটি শুরু হয়েছিল প্রাগে, যেখানে অলব্রাইট এবং তার পরিবার প্রথমে হিটলারের নাৎসি এবং পরে জোসেফ স্ট্যালিনের কমিউনিস্টদের থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। তিনি শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের স্কুলে ভর্তি হন যেখানে তিনি তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন ম্যাডেলিন।
হোয়াইট হাউজে বিল ক্লিনটনের সময়ই বিশ্ব অলব্রাইটের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। তিনি ক্লিনটনের প্রশাসনে ১৯৯৩-১৯৯৭ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ক্লিনটন তাকে প্রথম নারী সেক্রেটারি অফ স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) হওয়ার জন্য মনোনীত করেন। ম্যাডেলিন অলব্রাইটকে সেই সময়ে আমেরিকান সরকারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীতে পরিণত করেন।
সেক্রেটারি অফ স্টেট হিসেবে অলব্রাইট তার প্রথম সফরের সময় বলেছিলেন, ‘প্রত্যেকেরই নিজস্ব ধরন আছে এবং আমার ধরনটা মানুষ থেকে মানুষের কাছে যাওয়া। আমি আমার চেষ্টা করছি এবং আমি এটি উপভোগ করছি।’
ক্লিনটন প্রশাসনে আমেরিকান কূটনীতিক হিসেবে অলব্রাইট অত্যন্ত কঠিন ও উচিত বক্তা হিসেবে নিজস্ব একটি শক্তিশালী ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন। তিনি ১৯৯০-এর দশকের আমেরিকার দুটি বৃহত্তম পররাষ্ট্রনীতিগত সংকট—রুয়ান্ডা এবং বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় গণহত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। অলব্রাইটের প্রথম মেয়াদে, বসনিয়ান সার্ব সৈন্যরা তিনটি মুসলিম ছিটমহল দখল করে এবং ৮ হাজার জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছিল। তিন বছর ধরে সংঘাত বাড়তে দেখার পর, ন্যাটোর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলায় যুক্ত হয়—যা যুদ্ধের যবনিকা টানতে বাধ্য করে।
রুয়ান্ডা এবং বসনিয়া থেকে শিক্ষা নেওয়া বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো কসোভোর সমস্যা সামলাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশেষভাবে সতর্ক করেছিল। ওয়াশিংটন দেখেছিল, শক্তিশালী সার্বরা আলবেনিয়ানদের জাতিগতভাবে নিমূর্লের একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ১৯৯৯ সালে ১১ সপ্তাহের বিমান হামলার অভিযান চালায় ন্যাটো—যা বেলগ্রেড পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এভাবেই অলব্রাইট মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থরক্ষার জন্য একটি শক্ত এবং দৃঢ় ব্যবস্থার সূচনা করেন।
ক্লিনটনের জামানা এবং ১৯৯০-এর দশক শেষ হয়ে গেলে, বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখক অলব্রাইট আমেরিকান নারীদের মধ্যে একজন ‘নারীবাদী আইকন’-এর মর্যাদা পান। তিনি এই বলে বিখ্যাত ছিলেন যে, ‘যারা একে অপরকে সাহাঘ্য করে না, তাদের জন্য নরকে একটি বিশেষ স্থান রয়েছে।’
অলব্রাইটের মৃত্যু (২৩ মার্চ ২০২২) এমন এক সময়ে হলো—যখন আমেরিকাকে ইউক্রেনের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে, এ অবস্থায় আমার মনে হয়েছে—আমেরিকানরা একজন মাতৃত্বময় ব্যক্তিত্ব এবং পথপ্রদর্শককে হারাল—যার প্রজ্ঞা ও জ্ঞান সম্ভবত আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।
তার মৃত্যু আমার মনে এই অনুভূতি জাগায় যে, আমেরিকায় নারীদের রাজনীতিতে এখনো কতদূর যেতে হবে। যদিও এটি বাংলাদেশিদের জন্য এবং সাধারণভাবে দক্ষিণ এশীয়দের জন্য স্বাভাবিক হতে পারে। এই অঞ্চলের রাজনীতিতে এবং দেশ পরিচালনায় নারীদের নেতৃত্ব খুব স্বাভাবিক বিষয়—আমেরিকানদের জন্য এটি এখনো পুরো স্বাভাবিক দৃশ্য নয়। আমেরিকার রাজনীতির পুরুষতান্ত্রিক জগতে একজন নারী হিসেবে অলব্রাইটের কৃতিত্বগুলো অনেক বড় দৃষ্টান্ত এবং নারীদের জন্য এগুলো দারুণ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। কারণ মার্কিন সরকারে নারীদের অংশগ্রহণ নিদারুণভাবে কম রয়েছে।
প্রতি বছর আমেরিকায় আরো বেশি নারী বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অফিসে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন বটে, এই ইতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও মার্কিন রাজনীতিতে নারীদের সামগ্রিক প্রতিনিধিত্ব তাৎপর্যপূর্ণভাবে কম রয়েছে। আমেরিকান জনসংখ্যার ৫১ শতাংশই নারী, কিন্তু কংগ্রেসের আসনের (হাউজ এবং সিনেট) মাত্র ২৬.৪ শতাংশ, রাজ্য-স্তরের নির্বাহী অফিসের ৩০.৩ শতাংশ এবং রাজ্য-স্তরের আইনসভার আসনগুলোর ৩০.৯ শতাংশে নারীরা অধিষ্ঠিত।
আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে ম্যাডেলিন অলব্রাইট তার সময়ের জন্য কেবল একজন প্রতাপশালী কূটনীতিক ছিলেন না—তিনি এই সময়ের জন্যও একজন পথপ্রদর্শক ছিলেন। এবং এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দিহান যে, ইতিহাস তাকে নতুন আইডিয়া ও পদ্ধতির উদ্ভাবক হিসেবেও মনে রাখবে।
আমরা হৃদয় থেকে এটা বলতেই পারি যে, ম্যাডেলিন অলব্রাইটের জীবনের গল্প আমাদের এটাই উপলব্ধি করাতে সাহাঘ্য করে যে, আমেরিকা অনেককে আশ্রয় দিয়েছে এবং একজন ব্যক্তি চাইলে অকল্পনীয় দূর পর্যন্ত যেতে পারেন। এ জন্য অলব্রাইট বলেছিলেন যে, ‘শুধু আমেরিকাতেই মধ্য ইউরোপ থেকে আসা একজন উদ্বাস্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারে!’
(ইংরেজি থেকে অনূদিত)
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ
