ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন

উন্নয়নশীল বিশ্বের খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকট

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২২, ০৭:১৭

ইউক্রেনে পুতিনের আগ্রাসন ও সামগ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতি আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল থেকে অনেক দূরে মনে হলেও যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকট এখান থেকেও খুব ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছে। এই অঞ্চলের অনেক দেশই রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে খাদ্যশস্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং সেখানে এখন দ্রব্যমূল্যের বিস্ফোরণ ঘটছে।
অন্যান্য সাধারণ একটি দিনের মতো নাইরোবিতে যখন সন্ধ্যা নেমে আসছে, তখন ব্রেট্রিস অ্যাটিনো তার অবিক্রীত ফল ও শাকসবজিগুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন। এই ব্যবসায়ীকে দ্রুত তার হাতের কাজ শেষ করে শহর ছাড়তে ভাগাভাগি করা ট্যাক্সি ধরতে হবে এবং বাড়িতে ফিরে রান্নাবান্না করতে হবে। রেডিওতে উপস্থাপক ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা বলছিলেন, যদিও তা খবরের একেবারেই শেষ দিকে। কারণ কেনিয়ায় এর চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ খবর রয়েছে, বিশেষ করে আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তা সত্ত্বেও অ্যাটিনোর এই রাতের খাবারের আয়োজন বিশ্বের অন্য প্রান্তে সংঘটিত যুদ্ধের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত, যেটি অনেকেই বুঝতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আসন্ন সপ্তাহগুলোতে বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হবে, সেটি হলো গম। কেনিয়ায় যে পরিমাণ গম আমদানি করা হয়, তার বেশির ভাগই আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। খাদ্যশস্য কারখানা মালিক সমিতির সদস্য পালোমা ফার্নান্দেজ জানান, এখানে ইতিমধ্যে গমের মূল্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং মিলমালিকেরা একদমই লাভ করতে পারছেন না। তিনি আরো জানান, তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেটিও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ী বেট্রিস অ্যাটিনোর সঞ্চয় খুব কমই রয়েছে এবং ইতিমধ্যে সেই সঞ্চয়ের বেশির ভাগই খাদ্যের পেছনে খরচ হয়ে গেছে। তিনি জানান, মাঝেমধ্যে আমরা ক্ষুধাপেটে ঘুমাতে যাই। কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় অত্যধিক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে রুটি জিনিসটা এখন আর আমার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই। রুটির পরিবর্তে এখন আমরা সকালের খাবারে আলু খাই।

এমনকি রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই আফ্রিকার অনেক দেশেই খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল। গত বছরের তুলনায় এ বছর আটার দাম বেড়ে ১৫ শতাংশ, ভোজ্য তেলের দাম তৃতীয় বারের মতো সর্বোচ্চ হলো। কিন্তু ইউক্রেনের যুদ্ধ এই পরিস্থিতিকে আরো খারাপ দিকে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ৮১টি দেশের ২৭৬ মিলিয়ন মানুষ চরম ক্ষুধার সম্মুখীন হয়েছে। জার্মানিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির পরিচালক মার্টিন ফ্রিক জানিয়েছেন, বিশ্ব আরেকটি সংঘাতকে কোনোভাবেই বহন করতে পারবে না। তিনি জানান, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সারা বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যে পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য সরবারাহ করে থাকে, তার অর্ধেকই আসে ইউক্রেন থেকে। পুতিনের এই যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনেই অবর্ণনীয় দুর্দশা ডেকে আনেনি, যুদ্ধের এই প্রভাব এই এলাকার থেকে বহু দূরেও অনুভূত হবে।

আরব বিশ্বের সবচাইতে জনবহুল দেশ মিশর, যাদের জনসংখ্যা ১০ কোটিরও বেশি, তারা অধিকাংশ গমই আমদানি করে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। শুধু মিশরই নয়, তিউনিশিয়াও। দুটি দেশেই বিশেষ করে গরিব মানুষেরা শুধু রুটির ওপর নির্ভরশীল। তিউনিশিয়ার বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা জানিয়ে আসছেন, যুদ্ধের ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশও একই সমস্যা মোকাবিলা করছে।

কেনিয়ায় ফিরে যাই, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে সেখানকার সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে, যেহেতু দেশের অনেক মানুষকেই দিনের খাবারটুকুর জোগান দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে এবং পরিস্থিতি দ্রুতই খারাপ হচ্ছে। কেনিয়ায় কদিন ধরেই টুইটারে হ্যাশট্যাগ খাদ্যের দাম কমাও ট্রেন্ডিং বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শত শত টুইটার ব্যবহারকারী সেখানে নিজেদের ক্ষোভ-রাগ উগড়ে দিচ্ছেন এবং সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার। কিন্তু দেশের নেতারা যে খুব বেশি কিছু করতে পারবেন তা-ও নয়। দেশটির কাঁধে বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা এবং আন্তর্জান্তিতক মুদ্রা তহবিল তাদের রাজস্ব বাড়ানোর তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, বিভিন্ন পণ্য যেমন—খাদ্যপণ্যের ওপর ট্যাক্স বাড়াও। এর সঙ্গে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনা প্যান্ডেমিকের কারণ বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার বিষয়টি। এবং বর্তমানে রাশিয়ার এই আগ্রাসন পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে ফেলছে।

কেনিয়ার কৃষি অর্থনীতিবিদ টিমোথি এঞ্জাগি জানিয়েছেন, পণ্যের দাম এর চাইতেও বেশি বাড়বে যুদ্ধের কারণে এবং যুদ্ধের কারণে গরিবেরাই সবচাইতে বেশি ভুক্তভোগী হবে। গমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেনিয়ার নিম্ন আয়ের মানুষ এর প্রতি বেশি নির্ভরশীল। ভাজা রুটি তাড়াতাড়ি পেট ভরায় এবং জরুরি সময়ে রুটি যে কোনো ভারী খাবারের বিকল্প হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের সব পণ্যই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী বেট্রিস অ্যাটিনো জানান, তিনি এখন আর দিনের খাবারটুকু কিনতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘আমি দোকানে ঢুকি এবং তার পরই ঘুরে চলে আসি, সেখান থেকে বের হয়ে যাই। কারণ হঠাৎ করেই খেয়াল করি আমার কাছে জিনিসপত্র কেনার মতো প্রয়োজনীয় টাকাপয়সা নেই।’

মূল্যস্ফীতি যদিও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকেও আঘাত করছে। নাইরোবির অন্যতম পরিচিত বেকারি কেকপ্লাজা বৃহস্পতিবার বিকেলে লোকারণ্য হয়ে থাকত, মানুষ এখানে এসে কেক অর্ডার করত জন্মদিনের পার্টির জন্য। কিন্তু ইদানীং সেখানেও জনসমাগম কমে গেছে বলে জানান বেকারির ম্যানেজার ড্রানিয়েল কিসুম্বা। তিনি বলেন, ‘মানুষ ক্রমেই মূল্য দেখে অভিযোগ জানাচ্ছে। আমাদের বিক্রিবাট্টা প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। অনেক বেকারি তো বন্ধই হয়ে গেছে।’

কিসুম্বা খুব নিবিড়ভাবে ইউক্রেনের পরিস্থিতির খোঁজ-খবর রাখছেন এবং তিনি জানেন সামনের দিনগুলোতে কোন পরিস্থিতি আসতে যাচ্ছে। তার বেকারিতে দৈনিক ৩০০ কেজিরও বেশি আটার প্রয়োজন, সুতরাং কেকের মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। এবারও হয়তো সোয়া শতাংশ করে বাড়াতে হবে। সাদা রুটির বড় প্যাকেটের দাম তখন হয়তো দুই ইউরো পড়বে, অথচ আগে এর দাম ছিল অর্ধেক।

খাদ্যশস্য মিল মালিক সমিতি আশা করছে, হয়তো নতুন সাপ্লাইয়ার খুঁজে পাওয়া যাবে, যেমন—আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা আমেরিকা। কিন্তু কেনিয়ার সরকার জিন মোডিফাইড খাদ্যশস্য আমদানি করে না, সেক্ষেত্রে যেসব বিকল্প রয়েছে, সেগুলো অনিশ্চিত হয়ে যায়। অনেক গুদাম ও মিলে আগামী দুই-তিন সপ্তাহের পণ্য মজুত রয়েছে। এরপর সেখানে কী হবে সেটি বলা যাচ্ছে না।

অন্যান্য সমস্যাও রয়েছে, ইউক্রেন ও রাশিয়া সারেরও বড় জোগানদাতা। এবং এসব দেশে গত কয়েক মাস ধরে সারের দামেও বিস্ফোরণ ঘটছে। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে এই কৃষি মৌসুমেও ছোট ছোট কৃষকেরা স্বাভাবিকের চাইতে কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন, যেটা নিঃসন্দেহে ফসল উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলবে এবং সেটি আবারও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আগুনে ঘি ঢালবে। এই দুষ্টচক্র পরবর্তী সময়ে আরো বাড়বেই দূরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে। অধিকন্তু কেনিয়ার রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে; যেহেতু রাশিয়া পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সবচাইতে বেশি চা কিনে থাকে কেনিয়ার কাছ থেকে।

কেনিয়ার কৃষি অর্থনীতিবিদ টিমোথি এঞ্জাগি আশা করছেন, কেনিয়া এবং আফ্রিকার অন্য দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি নতুন করে আবার ভাবতে সাহায্য করবে। ‘আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি আমদানি নির্ভরই থাকব, নাকি আমরা আমাদের কৃষিকে আরো উন্নত করতে চেষ্টা করব।’ গত কয়েক দশকে অনেক চিরাচরিত খাদ্যপণ্য হারিয়ে গেছে এবং সেই জায়গা দখল করেছে পশ্চিমা পণ্য। বর্তমানে এই মূল্যবৃদ্ধির যুগে তারা নতুন এক রেনেসাঁর মুখোমুখি। পুতিনের এই যুদ্ধ আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষুধা আর দুর্দশা বাড়াবে, কিন্তু এই পরিস্থিতি নতুন কোনো সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিতে পারে।

লেখকদ্বয়: জার্মানি ও কেনিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: এইচ এম নাজমুল আলম

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন