পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ভবিষ্যৎ এখন সুপ্রিম কোর্টের হাতে। তার বিরুদ্ধে আনা বিরোধীদের অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোট আটকাতে রবিবার প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দেন এবং ইমরান খান আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ক্ষিপ্ত বিরোধী জোট সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়।
প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব খারিজ এবং পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দায়ের হওয়া মামলায় রায় আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত স্থগিত রাখে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল সোমবার শুনানির পর প্রধান বিচারপতি উমর আটা বান্দিয়ালের বেঞ্চ এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। ইমরানের উপর চাপ বাড়িয়ে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, অনাস্থা ভোট এবং পার্লামেন্ট ভাঙার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ নিয়ে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর শুনানি হবে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে চার বিচারপতির বেঞ্চে রায় হবে। এর আগে রবিবার বিকালে সুপ্রিম কোর্ট একটি নির্দেশ দেয়। সেখানে অবশ্য পার্লামেন্টের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। সেখানে অ্যাটর্নি জেনারেলকে নোটিশ দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, সংবিধানের পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা বলে যে অনাস্থা প্রস্তাব খারিজ করে দেওয়া হয়েছে, সেই সিদ্ধান্ত কতটা সাংবিধানিক? পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিককে সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকতে হবে, প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা। নির্দেশে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, কোনোরকম অভিযোগ নথিবদ্ধ করা হয়নি, অন্যদের কথাও শোনা হয়নি। বিচারপতিরা বলেছেন, আমরা এটাও খতিয়ে দেখতে চাই, এভাবে অনাস্থা প্রস্তাব খারিজ করা কি সংবিধানের ৬৯ অনুচ্ছেদের মধ্যে পড়ে? ৬৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে পার্লামেন্টের ভিতরের সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালত কিছু করতে বা বলতে পারে না।
ইমরান বিরোধীদের যুক্তি, পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, একবার প্রক্রিয়া শুরুর পরে আস্থা বা অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি কেউ ঠেকাতে পারেন না। স্পিকার বা প্রেসিডেন্টও নন। আর যে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে, তিনি প্রেসিডেন্টকে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার সুপারিশও করতে পারেন না। কাজেই শুধু স্পিকার নন, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্টও সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন বলে সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ আবেদনকীরেদের।
তত্ত্বাবধায়ক প্রধানের নাম চান প্রেসিডেন্ট: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও বিরোধী জোটের নেতা শাহবাজ শরিফকে এরই মধ্যে চিঠি পাঠিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি। প্রেসিডেন্ট সচিবালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, ২২৪-এ (১) অনুচ্ছেদ মেনেই এই পদক্ষেপ। তবে গতকালই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি গুলজার আহমেদের নাম ঘোষণা করেছেন। ইমরান খানের দল পিটিআইর নেতা ফাওয়াদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দলের সর্বোচ্চ কমিটির অনুমোদনের পর প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গুলজার আহমেদের নাম ঘোষণা করেন। ইমরান খান প্রেসিডেন্টকে লেখা এক চিঠিতে গুলজার আহমেদকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। রবিবার মন্ত্রিসভা রদ হওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় যে ইমরান খান আর প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না। তবে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত ইমরান খানই প্রধানমন্ত্রী থাকবেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী কীভাবে নির্বাচিত হবেন: প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের তেমন নেই, বরং প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার ঐক্যমতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট। অনুচ্ছেদ ২২৪ অনুযায়ী, অনুচ্ছেদ ৫৮ এর অধীনে বাতিল হয়ে যাওয়া পার্লামেন্টের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার মধ্যে এক জনকে নিয়োগের বিষয়ে ঐক্যমত্য হতে হবে। মন্ত্রিসভা রদ হওয়ার তিন দিনের মধ্যে এই নিয়োগ দিতে হবে। নতুন নাম নির্ধারিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট সেই নাম অনুমোদন করবেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে থাকবেন। যদি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা— বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইমরান খান ও শাহবাজ শরিফ একজন প্রার্থীর নামের বিষয়ে সম্মত হতে না পারেন, তাহলে এই দায়িত্ব একটি কমিটির ওপর বর্তাবে যেখানে ক্ষমতাসীন দলের চার জন ও বিরোধী দলের চার জন সদস্য থাকতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কমিটি যদি তিন দিনের মধ্যে যে কোনো একজন প্রার্থীর নামের বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের ওপর নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের দায়িত্ব অর্পিত হবে। এরপর নির্বাচন কমিশনকে দুই দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করতে হবে।
গতকালই বিরোধী দলগুলোর জোট ও পিএমএল-এন নেতা শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের আলোচনায় অংশ নেবেন না। তিনি বলেছেন, সংবিধানের লঙ্ঘনকারীদের যতক্ষণ পর্যন্ত শাস্তির আওতায় না আনা হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি আলোচনায় বসবেন না। জেইউআই-এফ এর নেতা আসাদ মাহমুদও বলেছেন যে বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নেবে না। এরই মধ্যে ফাওয়াদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, আগামী ১১ এপ্রিলের মধ্যে নতুন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে হবে।
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশি গতকাল সুপ্রিম কোর্টের বাইরে সাংবাদিকদের জানান যে এই পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক ডাকা হতে পারে। তিনি জানান, প্রধান বিচারপতির বিশেষ ক্ষমতা অনুযায়ী তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন যে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক ডাকা হবে কিনা। পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটিতে সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধান কর্মকর্তারা রয়েছেন। রবিবার পাকিস্তানের সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর মহাপরিচালক জেনারেল বাবর ইফতিখার বলেছেন যে, পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যা ঘটেছে তার সঙ্গে সেনাবাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই।
দেশদ্রোহিতার পালটাপালটি অভিযোগ: বিরোধী দলের নেতা শাহবাজ শরিফ পার্লামেন্টের স্পিকার কাসিম সুরি ও প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে গুরুতর দেশদ্রোহিতার অভিযোগ তুলেছেন এবং বলেছেন যে দুই জনকেই পাকিস্তানের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬-এর অধীনে দেশদ্রোহিতার দায়ে অভিযুক্ত করা উচিত। অন্যদিকে ইমরান খানের দল পিটিআইর নেতারাও দলের বিদ্রোহী সদস্যদের বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিযোগ করছেন।
পাকিস্তানের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী, যদি কেউ জোর প্রয়োগ করে, কোনো অসাংবিধানিক পন্থা অবলম্বন করে সংবিধানের বিলোপ, বাতিল, স্থগিত বা সাময়িকভাবে স্থগিত করে বা তেমন কিছু করার চেষ্টা করে, তাহলে ঐ ব্যক্তি ও তার সহযোগীরা দেশদ্রোহী হিসেবে বিবেচিত হবেন। বিচারপতি এস এম জাফরের মতে, ‘দেশদ্রোহিতা’ শব্দটি পাকিস্তানের সংবিধানে প্রথমবার ব্যবহৃত হয় ১৯৭৩ সালে। তবে এই সংজ্ঞা সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর পর পরিবর্তিত হয়।
ক্ষমতা রক্ষায় ধর্মকে ব্যবহার?: পাকিস্তানে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত কিছুদিন ধরে রাস্তায় বিক্ষোভ হলেও ইমরান খান ও বিরোধী জোটের নেতা দুই জনই ধর্মকে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য ব্যবহার করছেন বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০১৮ সালে ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বিভিন্ন সময় তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে পাকিস্তানকে মদিনা সনদের মূলনীতি অনুযায়ী পরিচালনা করবেন তিনি।
লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক আলি কাসমির মতে, ক্ষমতায় আসার পর ইমরান খান ধর্মকে নতুন আঙ্গিকে এবং নতুন মোড়কে পাকিস্তানের রাজনীতিতে উপস্থাপন করেন। ইমরান খানের এই পন্থার সমালোচনা করলেও বিরোধী দলের জোটগুলো বাধ্য হচ্ছে তাদের রাজনীতিতে ‘মদিনা সনদের মূলনীতির উল্লেখ করতে। অনাস্থা ভোটের প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও বিরোধী নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান দুই জনেই তাদের বক্তব্যে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনের কথা চিন্তা করেই ধর্মকে তারা ব্যবহার করছেন। কারণ এর আগের নির্বাচনে পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল তেহরিক-ই-লাবাইক বিপুল ভোট পেয়েছিল। অধ্যাপক আলি কাসমি মন্তব্য করেন, ‘আমরা এমন একটা বাস্তবতার মধ্যে আছি যেখানে প্রতিযোগিতা নির্ভর করবে ধর্মকে কারা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতে পারবে, তার ওপর।’
ইমরান খান অভিযোগ করছেন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এই অনাস্থা ভোট আমেরিকানদের একটি চক্রান্ত। তিনি চক্রান্তে জড়িত আমেরিকান এক কূটনীতিকের নামও ঘোষণা করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এর আগে রবিবার ইমরান খানের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে একটি অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোট হওয়ার কথা থাকলেও যেই ভোটে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। পার্লামেন্টের স্পিকার কাসিম সুরি বিরোধী দলগুলোর জোটের অনাস্থা ভোট করার দাবি নাকচ করে দেন। পরে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি পার্লামেন্ট ভেঙে দেন।
পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন বছরের মাথায় মন্ত্রিসভা বাতিল করে দিয়েছেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের উত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটির কোনো প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদের পুরোটা সময় দায়িত্বে থাকতে পারেননি। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর জোট স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রমকে অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিরোধী দলগুলোর জোট বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের রাস্তা খুঁজতে যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে। —বিবিসি ও ডন

ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে ইমরান খান
ইমরান খান ‘ইঁদুর’, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন: বিলাওয়াল ভুট্টো
'পুতুল' ইমরান সরকারের পতন কি অনিবার্য?