শুক্রবার (১ এপ্রিল) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান জানিয়েছেন, ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ তাকে তিনটি উপায় দিয়েছে, যার মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে। এগুলো হচ্ছে: পদত্যাগ করা, অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি বা আগাম নির্বাচন (১ এপিল, ২০২২, ডন)। প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীই দেশটির ‘এস্টাবলিশমেন্ট’।
এর দুই দিন পর ৩ এপ্রিল দেশটির পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্থাব নিয়ে অধিবেশন শুরু হয়। কিন্তু পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি বিরোধীদের আনা প্রস্তাবটি সংবিধান সম্মত নয় বলে খারিজ করে দেন। এর কিছুক্ষণ পর ইমরান খান জানান, তিনি প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভিকে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
এরপরই খবর আসে, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছেন। পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে।
তাই আপাতদৃষ্টিতে ধরেই নেওয়া যায়, ইমরান খান সেনাবাহিনীর দেওয়া তিনটি উপায়ের মধ্যে আগাম নির্বাচন বেছে নিয়েছেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ইমরান খান এই উপায় স্বেচ্ছায় মেনে নিয়েছেন না মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
একটু পেছনে ফেরা যাক, ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ইমরান খান। শুরু থেকে বিরোধীদের অভিযোগ, সেনাবাহিনীর সহায়তায় নির্বাচনে জালিয়াতি করে ক্ষমতায় এসেছেন তিনি।
স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০১৮ সালের নির্বাচন পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কময় নির্বাচন ছিল, (বিবিসি, ২২ নভেম্বর ২০২০)। এছাড়া দেশটির বিরোধী জোট দাবি করে আসছে, ‘ইমরান খান সেনাদের পুতুল সরকার’।
এছাড়া, বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে ইমরান খান ও দেশটির সেনাবাহিনীর সম্পর্কের টানাপড়েনকে দায়ী করা হচ্ছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, বর্তমান সংকটের শুরু গত বছরের অক্টোবরে। ওই সময় ইমরান খান পাকিস্তানের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর নতুন প্রধানের নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান।
দেশটির সেনাপ্রাধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া আইএসআই-এর প্রধান হিসেবে চেয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাদিম আঞ্জুমকে কিন্তু ইমরানের পছন্দ ছিল জেনারেল ফয়েজ হামিদ। কিন্তু শেষমেষ সেনাপ্রধানের পছন্দকে মেনে নিতে বাধ্য হন।
এদিকে ২৪ ফেব্রুয়ারি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের যে ঘোষণা দেন, সে সময় রাশিয়া সফরে ছিলেন ইমরান খান। তিনি সেই সফরকে চমকপ্রদ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এছাড়া এখন অবধি ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা নিয়ে পুতিন বিরোধী কোনো মন্তব্য করেননি। একই সঙ্গে জাতিসঙ্গে রাশিয়ার বিপক্ষে ভোট দানে বিরত ছিলেন।
তবে গত শনিবার (২ এপ্রিল) সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া বলেছেন, ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন অবশ্যই অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।’ তিনি এই সংঘাতকে ‘বিশাল ট্র্যাজেডি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পাকিস্তান সেনাপ্রধানের এমন বিবৃতি ইমরান খানের পুরো বিপরীত। তাই ইমরান খানের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বন্দ্ব যে প্রতীয়মান, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
এছাড়া পাকিস্তানের প্রায় ৭৫ বছরের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদ শেষ করতে পারে নি। এসবের পেছনে যে সেনাবাহিনী কলকাঠি নাড়েনি তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেইসঙ্গে দেশটি সেনাবাহিনী তিন দশকের বেশি সময় সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন।
এই মুহূর্তে ইমরান খানের ভাগ্য ঝুলে আছে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে। তবে এতেও যে দেশটির সেনাবাহিনীর কোনো দাদাগিরি থাকবে না, তা কিন্তু অস্বীকার করা যায় না। তাই অনাস্থা ভোটের হাত থেকে নিশ্চিত বেঁচে যাওয়া ইমরান খান যতই উড়ুক না কেন নাটাই সেনাবাহিনীর হাতে। ডন, বিবিসি, আল জাজিরা, জিও নিউজ, টাইমস।

সর্বোচ্চ আদালতে যাচ্ছে পাকিস্তান সরকার
'পুতুল' ইমরান সরকারের পতন কি অনিবার্য?