রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

চৈত্রসংক্রান্তি যেন ঝরাপাতাদের দলে

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২২, ০৯:৪০

মহানগরে এখন গ্রীষ্মের উষ্ণতা। কখন যে বসন্ত চলে যাচ্ছে, চৈত্রের আমদানি হচ্ছে টের পাওয়া যায় না। ক্লান্ত ঘুম ঘুম নিঝুম দুপুরগুলো কি এখন আর শহরে দেখা মেলে? চৈতি হাওয়ায় যে ধুলোটা ওড়ে, সেই ‘এলোমেলো’ ধুলোটাও যেন মধুর লাগে গ্রামে। আর শহরে দেখা যায় উন্নয়নের ধুলো। সেখানে কখন চৈত্রসংক্রান্তি আসে, সেটা যেন সড়কে যানজটের জটে লটকে থাকে।

সংক্রান্তি মানে এক ক্রান্তি থেকে আরেক ক্রান্তি। এক কিনারা থেকে আরেক কিনারায় যাওয়া। ক্রান্তির সাঁতার। মহাকালের অনাদি ও অশেষের মাঝে ঋতুর বদল করতে করতে সূর্যের ও আরো অনেক গ্রহ-উপগ্রহ-গ্রহাণু-উল্কার সঙ্গে সঙ্গে সাঁতরে চলা। এ এক চক্রের মতো, চরকার মতো, ঋতুরা ফিরে ফিরে আসে। ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে সময়। নতুন নাই, পুরাতনও নাই। এখানে পুরাতনকে জরা-জীর্ণ বলে বিদায় দেওয়ার কিছু নাই। বরং এক ধরনের প্রবহমানতা।

এ চিন্তার রেশ চৈত্রসংক্রান্তির মধ্যে প্রবল। তাই সময়ের মধ্যে প্রাণ ও প্রকৃতির অবিচ্ছিন্ন যাত্রায় যারা মগ্ন, সেই বাংলাদেশের গ্রামে চৈত্রসংক্রান্তি এখনো বছরের প্রধান উপলক্ষ্য। বিশেষত, উপমহাদেশের সনাতন প্রথা অনুসারী মানুষেরা এই দিনটিকে খুবই পুণ্যের দিন বলে মনে করেন। সনাতন পঞ্জিকা মতে, দিনটিকে গণ্য করা হয় মহাবিষুবসংক্রান্তি। সাধারণত চৈত্রসংক্রান্তির আলোচনাতে মেলা, গাজন, পূজার কথা ঘুরেফিরে আসে। এগুলো নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচারের সম্পর্কিত হয়ে গেছে এখন। আবহমান বাংলা, বাংলার রূপ, বাংলার মানুষ আজো বিরাজমান উৎসবমুখর এই দিনটিকে ঘিরে। হোক তা ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, উৎসবের নানা রূপ, আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাই তো বহমান চৈত্রসংক্রান্তি।

চৈত্রসংক্রান্তিতে বছরের খাজনার হিসাব তোলা হতো। বৈশাখের প্রথম দিন নতুন খাতায় হিসাব লেখা হতো। চৈত্রসংক্রান্তির দিনে গমের ছাতু, দই ও পাকা বেল দিয়ে তৈরি বিশেষ শরবত খাওয়া হয় আবহমান বাংলায়।

চৈত্রসংক্রান্তি অনেকাংশে উদযাপিত হয় ধর্মীয় উৎসব হিসেবেও। যেমন বাংলার মুসলমানদের মধ্যেও চৈত্রসংক্রান্তি ধর্মীয়ভাবে উদযাপন হতো। এ দিনে খোলা প্রান্তরে জামাতের সঙ্গে বিশেষ নামাজ আদায়ের চল ছিল। কোথাও কোথাও আজো এই নামাজ প্রচলিত আছে। এর উদ্দেশ্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে এই গরম থেকে নিষ্কৃতির জন্য দোয়া প্রার্থনা করা। এদিন প্রত্যেক বাড়ি থেকে নগদ টাকা অথবা চাল-গুড় নিয়ে বড় তাল কিংবা বটগাছের নিচে দুধ, সেদ্ধ চাল ও তালের গুড় দিয়ে তৈরি হতো শিরনি। এরপর তা বিলিয়ে দেওয়া হতো গ্রামের সব মানুষের মধ্যে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বেশ কয়েকটি পূজার আয়োজন করেন চৈত্রসংক্রান্তিকে ঘিরে। এদিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শাস্ত্র মেনে স্নান করেন, কেউ ব্রত পালন করেন, কেউ বা উপবাস থাকেন। চৈত্রসংক্রান্তির দিনে আরেকটি উৎসব হলো ‘নীল উৎসব’। নীল উৎসবের সাজ লাল কাপড় অথবা পাগড়ি মাথায় বাঁধা। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ও হাতে ত্রিশূল। সঙ্গে ঢাক-ঢোল, করতাল ও কাঁসার বাদ্য। কেবল যে বাঙালিরাই চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপন করে তা নয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অনেকে নিজেদের উৎসবের মাধ্যমে বিদায় দেয় পুরনো বছরকে, বরণ করে নেয় নতুন বছরের প্রথম দিনটিকে। চাকমা ও তঞ্চইঙ্গা নৃগোষ্ঠীর প্রধান উৎসব বিজু বা ‘বৈসাবি’ হয় চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষকে ঘিরে। ‘বৈসাবি’ শব্দটি একক নয়। এটি এসেছে ত্রিপুরাদের ‘বৈস’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ ও চাকমাদের ‘বিজু’ উৎসবের নামের আদ্যাক্ষর মিলিয়ে।

মাত্র কয়েক দশক আগেও গ্রামে চৈত্রসংক্রান্তিতে দুপুর গড়াতেই মেলায় নামত মানুষের ঢল। প্রথমত চড়ক দেখতে, দ্বিতীয়ত মেলায় হরেক গ্রামীণ পণ্যের আকর্ষণে মানুষের ঢল নামত। চৈত্র শেষের বিকেলে চড়কতলায় বেজে উঠত ঢাক, ঢোল, কাঁসর। ভিড় করত ছেলে-বুড়ো সকলেই। কাঠের প্রকাণ্ড খুঁটির উপরে, অনেকটা উঁচুতে, আংটায় ঝুলে থাকা জনা দুয়েক সাধু ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছেন। সেই দৃশ্য দেখতে নিচে অগুনতি মানুষের ভিড়। সে কালের চড়ক উৎসব প্রসঙ্গে কালীপ্রসন্ন সিংহ ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’য় লিখেছেন, ‘রাস্তায় লোকারণ্য, চারদিকে ঢাকের বাদ্যি, ধুনোর ধোঁ, আর মদের দুর্গন্ধ। সন্ন্যাসীরা বাণ, দশলকি, সূতোশোন, সাপ, ছিপ, ও বাঁশ ফুঁড়ে একবারে মরিয়া হয়ে নাচতে নাচতে কালীঘাট থেকে আসচে।... চড়কগাছ পুকুর থেকে তুলে মোচ বেন্ধে মাথায় ঘি কলা দিয়ে খাড়া করা হয়েচে। ক্রমে রোদ্দুরের তেজ পড়ে এলে চড়কতলা লোকারণ্য হয়ে উঠল। এদিকে চড়কতলায় টিনের ঘুরঘুরি, টিনের মুহুরি দেওয়া তল্তা বাঁশের বাঁশি, হলদে রং করা বাঁখারির চড়কগাছ, ছেঁড়া নেকড়ার তৈরি গুরিয়া পুতুল, শোলার নানা প্রকার খেলনা, পেল্লাদে পুতুল, চিত্তির করা হাঁড়ি বিক্রি করতে বসেচে...। একজন চড়কী পিঠে কাঁটা ফুঁড়ে নাচ্তে নাচ্তে এসে চড়কগাছের সঙ্গে কোলাকুলি কল্লে— মইয়ে করে তাকে উপরে তুলে পাক দেওয়া হতে লাগলো। সকলেই আকাশ পানে চড়কীর পিঠের দিকে চেয়ে রইলেন। চড়কী প্রাণপণে দড়ি ধরে কখনও ছেড়ে, পা নড়ে ঘুরতে লাগ্লো। কেবল ‘দে পাক দে পাক’ শব্দ। কারু সর্ব্বনাশ, কারু পৌষ মাস! একজনের পিঠ ফুঁড়ে ঘোরান হচ্চে, হাজার লোক মজা দেখচেন।’

এখনো বসন্ত শেষের চৈত্র এসে পেতে রাখে গ্রামবাংলার নতুন রূপ। এর কিছু আগে শুরু হয় ঝরাপাতাদের গল্প। চৈত্রসংক্রান্তি নিজেই এখন ঝরাপাতার মতো হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথের গানের মতো বলতে হয়— ‘ঝরাপাতা গো, আমি তোমারই দলে।’

ইত্তেফাক/এসজেড