‘ইফতার’ শব্দটি আরবি ‘ফাতর’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ভঙ্গ করা, সমাপ্ত করা বা ছিঁড়ে ফেলা। এখানে ‘ফিতর’ যে অর্থ প্রদান করে তা হচ্ছে এমন খাদ্য, যা দ্বারা রোজা ভঙ্গ করা হয়। ইফতার রোজাদারদের জন্য একটি আনন্দময় ক্ষণ। একজন রোজাদারের যথাসময়ে ইফতার করা একান্ত প্রয়োজন। রসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, দিন তত দিন পর্যন্ত ঠিক থাকবে, যত দিন পর্যন্ত মানুষ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে। কেননা, ইয়াহুদি-খ্রিষ্টানরা বিলম্বে ইফতার করে। (সুনানে আবু দাউদ: ১৯৫৭)
সুনির্দিষ্ট ওজর ছাড়া বিলম্বে ইফতার করা মাকরুহ। এ সম্পর্কে হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) হতে বর্ণিত, হাদিসে রসুল (স.) বলেছেন, ‘যত দিন লোকেরা ওয়াক্ত হওয়ামাত্র ইফতার করবে, তত দিন তারা কল্যাণের ওপর থাকবে। (সহিহ বুখারি, কিতাবুস সাওম:১৮৩৩)
তাছাড়া ইফতারের কিছুক্ষণ আগে থেকে খাদ্যসামগ্রী সামনে নিয়ে অপেক্ষা করা সুন্নাত। কারণ, এ সময় মানুষ খুবই ক্ষুধার্ত থাকে এবং একমাত্র আল্লাহর ভয়ে খাবার সামনে হাজির থাকা সত্ত্বেও মুখে তোলে না। এতে আল্লাহ খুব খুশি হন। কারণ, ইফতারের সময়টা হলো বিনয় ও আল্লাহর জন্য ধৈর্য ধারণের চরম মুহূর্ত। এ সময় জাহান্নাম থেকে মুক্তিদানের মুহূর্ত। মহানবি (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটি খুশি, একটি ইফতারের সময়, অপরটি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। (বুখারি :৭৪৯২)
পবিত্র রমজানুল মোবারকের পাঁচটি সুন্নাতের দ্বিতীয়টি হলো ইফতার। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমার বান্দাদের মধ্যে তারা আমার বেশি প্রিয়, যারা দ্রুত ইফতার করে।’ (জামে তিরমিযি:৫৬০)
ইফতারির জন্য নির্দিষ্ট কোনো খাদ্য বা পানীয়কে ইসলাম অবধারিত বা জরুরি পালনীয় বলে ঘোষণা করেনি। নিজের খাদ্যাভ্যাস, রুচি ও সামর্থ্য অনুপাতে যে কোনো খাদ্য ও পানীয় দিয়েই ইফতার করার সুযোগ আছে। তবে নবি করিম (স.) ইফতারের জন্য খেজুর ও পানিকে সর্বাধিক পছন্দ করেছেন, অর্থাৎ খেজুর দিয়ে ইফতার করা সুন্নাত। তবে যে কোনো প্রকার ফল দিয়ে ইফতার করলেও সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। রসুল (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ রোজা রাখলে খেজুর দিয়ে যেন ইফতার করে, খেজুর না হলে অন্তত পানি দ্বারা ইফতার করা উচিত। নিশ্চয়ই পানি পবিত্র।’ (জামে তিরমিযি:৫৬২, সুনানে আবু দাউদ:২৩৫৭))
নিজে ইফতার করা যেমন ফজিলতপূর্ণ তেমনি অন্যকে ইফতার করানোও অত্যন্ত সওয়াবের কাজ ও বরকতময়। হজরত সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত। মহানবি (স.) বলেছেন, ‘এটা ওই মাস, যাতে মুমিন বান্দার রিজিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়, এই মাসে যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার পূর্বাপর গুনাহসমূহ মাফ হয়ে যাবে, সে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ লাভ করবে এবং রোজাদারের সওয়াবের সমপরিমাণ সওয়াব সে লাভ করবে। তবে ঐ রোজাদারের সওয়াব কম করা হবে না।’ সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন, হে আল্লাহর রসুল (স.)! আমাদের অনেকেরই রোজাদারকে ইফতার করানোর মতো সামর্থ্য নেই। রসুলুল্লাহ (স.) বললেন, পানিমিশ্রিত এক পেয়ালা দুধ বা একটি খেজুর অথবা এক ঢোঁক পানি দ্বারাও যদি কেউ কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, তাতেও সেই পরিমাণ সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে তৃপ্তিসহকারে আহার করাবে, আল্লাহতাআলা তাকে আমার হাউজে কাউসার থেকে এমন পানীয় পান করাবেন, যার ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত তৃষ্ণার্ত হবে না। (মুসনাদে আহমদ, মিশকাতুল মাসাবিহ)
রোজাদারের জন্য ইফতার-পূর্ব সময়টা অত্যন্ত মূল্যবান ও তাত্পর্যবহ। এই সময়টা দোয়া কবুলের মোক্ষম সময়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ব্যর্থ হয়ে যায় না—১. ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া, ২. ন্যায়বিচারক বাদশাহর দোয়া এবং ৩. মজলুমের দোয়া। (আহমদ, ইবনে মাজাহ:১৭৫২) নবি করিম (স.) আরো বলেছেন, ইফতারের সময় রোজাদারের ন্যূনতম একটি দোয়া অবশ্যই কবুল হয়। (সুনানে ইবনে মাযাহ:১৭৫৩)
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।
