রমজান মাসে মহৎ উদ্যোগ

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২২, ১০:২৬

একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার, মুনাফালোভী চক্রের কারসাজিতে রমজান মাসে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় নিত্য পণ্যের দাম বাড়ে। এ মাসে প্রাণিজ আমিষের বাজারেও যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ঠিক তখনই সুলভ মূল্যে মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটাতে সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এক মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

এ উপলক্ষে গত ৩ এপ্রিল (রবিবার) রাজধানীতে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম, পোলট্রি ও মাংসের ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। পহেলা রমজান থেকে ১০টি স্থানে শুরু হলেও বর্তমানে রাজধানীর ১৩টি বিভিন্ন স্থানে ২৮ রমজান পর্যন্ত এই বিক্রয় কার্যক্রম চালু থাকবে। এ কার্যক্রমের আওতায় প্রতিটি ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে পাস্তুরিত তরল দুধ প্রতি লিটার ৬০ টাকা, গরুর মাংস প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা, খাসির মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা, ড্রেসড ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ২০০ টাকা, ডিম প্রতি হালি ৩০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

রাজধানীর সচিবালয়সংলগ্ন আবদুল গণি রোড, খামারবাড়ি গোল চত্বর, মিরপুর ৬০ ফুট রাস্তা, আজিমপুর মাতৃসদন, পুরান ঢাকার নয়াবাজার, আরামবাগ, নতুন বাজার, মিরপুরের কালশী, সেগুনবাগিচা, খিলগাঁও, এলেনবাড়ী, যাত্রাবাড়ী ও জাপান গার্ডেন সিটিসহ মোট ১৩টি স্থানে ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে করে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে। মূলত সাপ্লাই চেইন সচল রেখে মূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রমজান মাসে জনসাধারণ যেন সহজে প্রাণিজ আমিষ ও পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারে, সে লক্ষ্যে ব্যবসায়ী-উত্পাদনকারী-সাপ্লাই চেইনসংশ্লিষ্ট সবাইকে সঙ্গে নিয়ে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এই ভ্রাম্যমাণ বিপণনব্যবস্থা বাস্তবায়ন করছে। প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প ভ্রাম্যমাণ এ বিক্রয় কার্যক্রমে সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে।

রমজান মাসে মহৎ উদ্যোগ

সুলভমূল্যে বিক্রির পাশাপাশি যে পরিবহনগুলোয় এই পণ্য বিতরণ করা হচ্ছে, সেগুলো যাতে স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত হয়, পণ্যে যাতে ভেজাল না থাকে, পণ্য যাতে মেয়াদোত্তীর্ণ না হয়, পণ্য যাতে অস্বাস্থ্যকর ও জীবাণুযুক্ত না হয়, সেজন্য মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং এলডিডিপি প্রকল্প নিয়মিত মনিটরিং করছে। বিক্রির প্রথম দিন ১০টি গাড়িতে ১ হাজার কেজি গরুর মাংস, ৪২ কেজি খাসির মাংস, ব্রয়লার ২৫০ পিস (প্রতিটি এক কেজি করে), ১ হাজারটি ডিম ও ২ হাজার লিটার দুধ বিক্রি করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগে ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় ১০টি গাড়িতে ১ হাজার কেজি মাংসের পরিবর্তে দেড় হাজার কেজি দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঐকান্তিক ইচ্ছায় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তর সংস্থার নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে আজ বাংলাদেশ মাংস ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত মাংস ও ডিম এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুষ্টি ও আমিষের চাহিদা মেটানো, বেকারত্ব দূর করা, কর্মোদ্যোক্তা তৈরি করা এবং নতুন আঙ্গিকে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ খাত ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। দেশের মোট জিডিপির ৫ দশমিক ০১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির ৩৭ দশমিক ১৯ শতাংশ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান। এর মধ্যে মোট কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান শতকরা ১৩ দশমিক ১০ ভাগ। স্থিরমূল্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান শতকরা ১ দশমিক ৪৪ ভাগ। প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৩ দশমিক ৮০ ভাগ এবং জিডিপির আকার প্রায় ৫০ হাজার ৩০১ দশমিক ৩ কোটি টাকা (বিবিএস-২০২১)। জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষ এবং শতকরা ৫০ ভাগ পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল।

প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি খাতকে আরো সমৃদ্ধ করতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় প্রাণিসম্পদ খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন’ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্পের আওতায় করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫ লাখ ৯৭ হাজার ২৪৯ জন খামারির প্রায় ৭০০ কোটি টাকা নগদ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় ৪ হাজার ২০০ প্রাণিসম্পদ সেবা প্রদানকারী (এলএসপি) নির্বাচন করা হয়েছে। ১ হাজার ৫০০ খামারিকে মিল্ক ক্রিম সেপারেটর মেশিন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১ লাখ ৪৯ হাজারের অধিক খামারিকে যুক্ত করে ৪ হাজার ৫৯৭টি প্রডিউসার গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে। এর আওতায় প্রাণিচিকিত্সা খামারির দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য ৩৬০টি মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক ক্রয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬১টি বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ২৪১টি জুন ২০২২-এর মধ্যে বিতরণ করা হবে। এতে করে প্রাণিসম্পদ খাতে উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে।

এ প্রকল্পের অধীনে সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় স্লটার হাউজ তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ নীতিমালা, প্রাণিসম্পদ বিমা নীতি প্রণয়ন, প্রাণীদের নিবন্ধন ও পরিচিতি দেওয়ার সিস্টেম ও ডাটাবেজ উন্নয়নের কাজ চলছে। আর এসব উদ্যোগের জন্যই প্রাণিসম্পদ খাতে বিপ্লব এসেছে। এখন কোনো প্রাণী আর আমদানির প্রয়োজন হচ্ছে না। অবৈধভাবে যেন কোনো প্রাণী আমদানি না করা হয়, সে বিষয়েও মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।

২০২১ সালসহ গত পাঁচ বছর ধরে পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশি গবাদি পশু দিয়ে শতভাগ কোরবানির চাহিদা পূরণ করা হয়েছে। এমনকি গত বছর কোরবানিযোগ্য ২৮ লাখ ২৩ হাজার ৫২৩টি উদ্ধৃত পশু অবিক্রীত ছিল।

করোনাকালেও দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের পুষ্টি নিশ্চিতে করতে এবং খামারি ও চাষিদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে ভিন্ন এক উদ্যোগ নেয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। করোনার সময় উৎপাদিত মাছ ও মত্স্যজাত পণ্য এবং প্রাণী ও প্রাণিজাত পণ্য বাজারজাতকরণে স্থানীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ ও অনলাইন বাজারব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। করোনাকালীন ভ্রাম্যমাণ ও অনলাইন বিক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা মূল্যের মাছ, মাংস, দুধ, ডিম এবং অন্যান্য মত্স্য ও প্রাণিজাত দ্রব্য বিক্রি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের মহৎ উদ্যোগের কারণে দেশের জনসাধারণ উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি দেশের চাষি, খামারি বাঁচবে ফলে দেশও বাঁচবে।

লেখক: গণযোগাযোগ কর্মকর্তা, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন