আবেদ খান, বহুমাত্রিক পরিচয়ের অধিকারী। পেশায় আপাদমস্তক সাংবাদিক। মননে সাংবাদিকতার চাষ। স্বপ্নে সাংবাদিকতা-সংশ্লিষ্ট সৃজনের বুনন। তারপর আবার অঙ্গীকারে লেখকও। সাংস্কৃতিক, সামাজিক ক্ষেত্রেও ছড়িয়েছেন আলো। ১৭ বছর বয়সে ১৯৬২ সালে আবেদ খানের সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি তত্কালীন বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিক ‘জেহাদ’-এ।
১৬ এপ্রিল ১৯৪৫ সালে খুলনা জেলার রসুলপুরে (বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলা) জন্ম আবেদ খানের। তার মাতামহ অবিভক্ত ভারতের দৈনিক আজাদের সম্পাদক মওলানা আকরম খাঁকে বলা হয় এই ভূখণ্ডের সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃত্। ১৯৬২ সালে ছাত্রাবস্হায় সাংবাদিকতায় যে আবেদ খানের সংযুক্তি ঘটেছিল, তিনি আজ সাংবাদিকতা জগতে একজন মহিরুহ। তার কর্মময় জীবন বর্ণাঢ্য করে তুলেছেন তিনি তার দূরদর্শী কর্মযজ্ঞে।
১৯৬২ সালে যে সংবাদমাধ্যমে তার প্রকাশ, সেই ক্ষেত্রে তারপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অনেক প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা-আর্থিক অনটনের সীমানা তাকে অতিক্রম করতে হয়েছে বটে, কিন্তু নিজেকে দৃষ্টান্তযোগ্য করে তোলার যুদ্ধে তিনি বিজয়ী। তিনি দেশের সাংবাদিকতায় মুকুটহীন সম্রাট। দৈনিক জেহাদ পত্রিকায় খুব বেশি দিন স্থিত হননি। তারপর অখণ্ড এই ভূখণ্ডে দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক-এ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন ক্রমেই তাকে বিকশিত করে। অনুসন্ধানী অর্থাৎ তদন্তমূলক সাংবাদিকতায় অন্যতম শীর্ষজন। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার একুশে টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠালগ্নে সংবাদ ও চলতি তথ্য বিষয়ে প্রধান হিসেবে কাজ করেন। এর আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনে আবেদ খান ও তার সহধর্মিণী ড. সানজিদা আখতারের যুগল উপস্থাপনায় বিশেষ অনুষ্ঠানগুলো আজও অনেককেই করে স্মৃতিকাতর। ঘটনার আড়ালে নামক টিভি চ্যানেলেই প্রচারিত তার তদন্তমূলক সাংবাদিকতার অনুষ্ঠানটিও দর্শক মনে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এত কিছুর পরও তার অধিকতর আলোকোজ্জ্বল দু্যতি যেন বেশি ছড়ায় প্রিন্ট মিডিয়ায়ই। তার ওপেন সিক্রেট, অভাজনের নিবেদন, লেট দেয়ার বি লাইট, তৃতীয় নয়ন, টক অব দ্য টাউন, প্রাঙ্গণে-বহিরাঙ্গনে, কালের কণ্ঠ, গৌড়ানন্দ কবি ভনে শুনে পুণ্যবান ইত্যাদি নামে বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত প্রথম পাতায় তাত্ক্ষণিক অনুসন্ধানী প্রতিক্রিয়া ও কলামগুলো তুমুল জনপ্রিয়তায় পাঠকের কাছে যেন একসময় হয়ে ওঠে টক অব দ্য কান্ট্রি।
বলা ভালো, নতুন ধারার জনক আবেদ খান পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব পালন করেন সম্পাদকের। ভোরের কাগজ, যুগান্তর, সমকালে সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর ২০০৯ সালে তার নিজের লেখা কলামের নামে ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত। এরপর কিছু সময়ের জন্য এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করলেও তার স্বপ্নের কাগজ দৈনিক জাগরণ প্রকাশের উদ্যোগ নেন। সেই উদ্যোগে বারবার প্রতিবন্ধকতা এসেছে, কিন্তু তিনি নিশ্চেষ্ট হননি। বর্তমানে দৈনিক জাগরণের প্রকাশক-সম্পাদক হিসেবে পঁচাত্তর ঊর্ধ্ব বয়সেও তিনি অক্লান্ত এক স্বপ্নবান যোদ্ধার মতো লড়ে যাচ্ছেন।
আবেদ খান ভিন্ন মাত্রার একজন সফল সংগঠকও বটে। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে ইউনিয়নে তো বটেই, একাত্তর-পর্বে তার সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকতর উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটে। একাত্তরের ১ মার্চ তিনি পুরান ঢাকার নারিন্দা-ওয়ারী অঞ্চলে স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ কমিটির কনভেনর হিসেবে এর স্বাক্ষর রাখেন। ২৫ মার্চ কালরাতে ও দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, ডেইলি পিপল ভবন এবং অপারেশন সার্চলাইটের নামে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার ভয়াবহ অনেক কিছুর প্রত্যক্ষদর্শী আবেদ খানই প্রথম কলকাতার আকাশবাণী বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন।
সাংবাদিক আবেদ খানের প্রকাশিত গ্রম্হ প্রায় ১৬টি এবং প্রতিটি পাঠকনন্দিত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে আকাশবাণীতে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখা আবেদ খান ৮ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধকালে।
সদালাপী, নির্ভীক এই মানুষটি যে শুধু উচ্চারণেই দৃঢ় তা-ই নয়; তার সারল্য-উদারতার কারণে সুযোগসন্ধানীরা নানাভাবে সুযোগ নেওয়ার পরও মানুষের প্রতি ভালোবাসায় তিনি বড়ই অকৃপণ। দেশের গণমাধ্যম সংস্কৃতিতে সুদীর্ঘকাল তিনি যে অনবদ্য অবদান রেখে আসছেন, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক কর্মকাণ্ডসহ নানাক্ষেত্রে তার রয়েছে অনবদ্য অবদান। তিনি এর স্বীকৃতিস্বরূপ বেসরকারি অনেক সম্মাননা পুরস্কার অর্জন করলেও রাষ্ট্র তার প্রতি এ ব্যাপারে সুবিচার করেনি। রাষ্ট্রীয় পদক পুরস্কার নিয়ে যখন দফায় দফায় বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তখনো আবেদ খানের মতো ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্র মূল্যায়ন করেনি, যা অত্যন্ত পরিতাপের।
সাংবাদিকতায় অনেকের মতো তিনি আমারও দীক্ষাগুরু-শিক্ষাগুরু। তাকে আমি একটানা ১৪ বছরের বেশি সময় খুব কাছে থেকে, তার সঙ্গে কাজ করে বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠার মতো পড়ার চেষ্টা করেছি। তাতে সমৃদ্ধও হয়েছি। বরেণ্য সাংবাদিক আবেদ খানকে প্রণতি। শুভ জন্মদিন। শুভ কামনা আবেদ ভাই। আপনি প্রজন্মের বাতিঘর। রবীন্দ্রনাথের অক্ষয় শব্দাক্ষরে বলতে চাই : ‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,/ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।’
লেখক: সাংবাদিক ও কবি
