রুশ সেনারা পিছুহটার পর কিয়েভ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৯০০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৩৫০ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে বুচা শহরে। ইউক্রেনের পুলিশ বলেছে, বেশির ভাগ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
এদিকে কৃষ্ণসাগরে রুশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার পর ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে রাশিয়া। মস্কো বলেছে, অত্যন্ত স্পর্শকাতর অস্ত্র-সরঞ্জাম ইউক্রেনকে দিয়ে সংঘাতে তেল ঢালা হচ্ছে, যা অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনসহ বেশ কয়েক জন ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও নেতার ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ক্রেমলিন। আর অব্যাহত সামরিক হামলার মুখে রাশিয়াকে সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। খবর বিবিসি, সিএনএন ও গার্ডিয়ানের।
কিয়েভ থেকে ৯০০ মরদেহ উদ্ধার: কিয়েভের আঞ্চলিক পুলিশপ্রধান আন্দ্রি নিবেতভ বলেছেন, কিয়েভ অঞ্চলের রাস্তায় বেশির ভাগ মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছিল এবং সাময়িকভাবে সমাহিত করা হয়েছিল। মরদেহগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে এবং বিস্তারিত তথ্যের জন্য ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে ফ্রান্সের ফরেনসিক টিম বুচা শহরে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক তথ্যে দেখা যায়, বেশির ভাগ মানুষের মৃত্যু হয়েছে গুলিতে। প্রতিদিনই ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। রুশ সেনারা ইউক্রেনের পক্ষে সোচ্চার মানুষদের বেছে বেছে মেরেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, যুদ্ধে এ পর্যন্ত তাদের আড়াই থেকে তিন হাজার সেনা মারা গেছেন এবং ১০ হাজারের মতো আহত হয়েছেন। অন্যদিকে প্রায় ২০ হাজার রুশ সেনা যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে কিয়েভের মেয়র জানিয়েছেন, রাজধানীর ডারনিতস্কি শহরতলিতে শনিবার ভোররাতে তিনটি বিস্ফোরণে কমপক্ষে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। জানা গেছে, এই রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে কিয়েভের প্রান্তে ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান তৈরির একটি কারখানায়। এর আগের রাতেও কিয়েভের খুব কাছে একটি অস্ত্র তৈরির কারখানায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। ঐ কারখানায় নেপচুন নামে জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হয়।
ইউক্রেনের দাবি, দুটি নেপচুন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতেই বৃহস্পতিবার কৃষ্ণসাগরে রুশ যুদ্ধজাহাজ মস্কভা ডুবে যায়। মস্কভা ডুবে যাওয়ার পর রাশিয়া প্রায় দুই সপ্তাহ বিরতির পর নতুন করে ইউক্রেনের রাজধানীতে পর পর দুই দিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাল।
ইতোমধ্যে রাশিয়া জানিয়েছে, কিয়েভে তাদের হামলা আরও বাড়বে। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লাভিভেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। অন্যদিকে আজভ সাগরতীরের ব্যস্ত বন্দর শহর মারিউপোল গত সাত সপ্তাহ ধরে রুশ ও ইউক্রেনীয় বাহিনীর মধ্যকার এক লড়াইয়ের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। শহরটি দখলে নেওয়ার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে রাশিয়া। এটি দখল করতে পারলে তা রুশ জনগণকে বড় অর্জন হিসেবে দেখাতে পারবে মস্কো। আর পূর্ব ইউক্রেনের খারকিভ, লুহানস্ক ও দোনেত্স্ক অঞ্চলে হামলা তীব্র করেছে রাশিয়া। এই অঞ্চলকে ইউক্রেনের হাত থেকে মুক্ত করতেই জোর দিচ্ছে রাশিয়া।
ইউক্রেনকে অস্ত্রসহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করল রাশিয়া
ইউক্রেনে ধারণার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়েছে রাশিয়া। বাধ্য হয়েছে রাজধানী কিয়েভের এলাকা ছাড়তে। এর মধ্যেই রাশিয়া লিখিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে যে, ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ না করলে অপ্রত্যাশিত পরিণতি ভোগ করতে হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে পাঠানো দুই পাতার রুশ কূটনৈতিক নোটটি মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট দেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সম্প্রতি ইউক্রেনের জন্য অতিরিক্ত ৮০ কোটি ডলার মূল্যের সামরিক সাহায্য দেওয়ার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করার পর রাশিয়া এই হুঁশিয়ারি দিল। প্রস্তাবিত নতুন সাহায্যের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে দূরপাল্লার কামান, উপকূল প্রতিরক্ষার ড্রোন, ভারী সাঁজোয়া যান এবং ট্যাংক ও বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই রুশ চিঠি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে না চাইলেও মস্কোতে শুক্রবার রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা নিশ্চিত করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আরও কিছু দেশকেও একই রকম চিঠি দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, রাশিয়া সেই সব দেশকেই লিখিত এই সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে, যারা ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠাচ্ছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের রাশিয়ায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের রাশিয়ায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। জনসন ছাড়াও তার প্রশাসনের আরও ১২ জনের ওপরও একই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মস্কো। তালিকায় সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেলের নামও রয়েছে।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের ‘শত্রুভাবাপন্ন’ অবস্থানের কারণে বরিস জনসন এবং দেশটির অন্যান্য জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের রাশিয়ায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মস্কোকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন করতে লন্ডন সবচেয়ে বেশি তথ্যগত ও রাজনৈতিক প্রচারণা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রাশিয়ার। গত মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেয় মস্কো।
রাশিয়াকে সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জেলেনস্কির
রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বকে বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এবার তিনি রাশিয়াকে সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক দেশের তালিকাভুক্ত করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বাইডেনের সঙ্গে ফোনালাপে তিনি এ আহ্বান জানান। যদিও জেলেনস্কি তার দেশকে আরও অস্ত্র ও মস্কোর ওপর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন।
